রাগ টোড়ি বা “তোড়ি” বা “মিঞা কি তোড়ি” বা “মিঞা-কি-টোড়ি” । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ টোড়ি বা “তোড়ি” বা “মিঞা কি তোড়ি” বা “মিঞা-কি-টোড়ি”।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 রাগ টোড়ি বা "তোড়ি" বা "মিঞা কি তোড়ি" বা "মিঞা-কি-টোড়ি" । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ টোড়ি

যারা মান্না দে’র “রাত জাগা দুটি চোখ” গানটি শুনেছেন, তারা তোড়ির যাদুর বুঝবেন। এই রাগকে রাগ “টোড়ি” বা “তোড়ি” বা “মিঞা-কি-তোড়ি” বা “মিঞা-কি-টোড়ি” বলা হয়। টোড়ি কে শুদ্ধ টোড়ি ও বলা হয়। টোড়ি রাগটি জনক রাগ। টোড়ি ঠাটটি এই রাগের নামেই। তোড়ি পরিবারের এই রাগটি সকালের। দুপুর ১২ টার আগে পর্যন্ত এই রাগটি গাওয়া বাজানো যায়। এই রাগে স্বভাবতই বিষাদের সুর। তবে গায়ক/বাদকের মুনশিয়ানা থাকলে উচ্ছলতারও প্রকাশও করতে পারে।

মিঞা তানসেন তৈরি করেছেন বলে যেসব রাগ প্রচলিত, এই রাগটি সেগুলোর মধ্যে একটি। “মিঞা” তানসেন এর নামের অংশ দিয়ে এই রাগের নামটি শুরু। এই রাগে রে (ঋ) গা(জ্ঞ) ধা(দ) এই তিনটি স্বর কোমল এবং মা (হ্ম) স্বরটি তীব্র। তার মানে এই রাগে চারটি বিকৃত স্বর ব্যবহৃত হয়। আবার অনেকে বলেন আরোহণ এর পঞ্চম এর ব্যবহার না থাকলে সেটা তোড়ি আর ব্যবহার থাকলে মিয়া কি তোড়ি।
টোড়ি ঠাটটি এই রাগের নামেই।

রাগমালা পেইন্টিংগুলোতে টেড়িকে দেখায় যায় বনের মাঝে পদ্ম পুকুরের পানিতে সাদা হাস। তার তিরে বীণা হতে সুন্দরী রমণীকে ঘিরে দাড়িয়ে আছে মুগ্ধ হরিণের দল। সঙ্গীত দর্পণে জাফরান ও কর্পূরের গন্ধের সাথে টোড়ির সম্পর্কের কথা বলা আছে।

 

তোড়ী রাগিণী - নৈনসুখের পরবর্তী দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন মাস্টারের (চিত্রশিল্পী) প্রতি আরোপিত, সময়কাল আনুমানিক ১৮২৫-৩০ খ্রিস্টাব্দ। গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি, চণ্ডীগড়।
তোড়ী রাগিণী – নৈনসুখের পরবর্তী দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন মাস্টারের (চিত্রশিল্পী) প্রতি আরোপিত, সময়কাল আনুমানিক ১৮২৫-৩০ খ্রিস্টাব্দ। গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি, চণ্ডীগড়।

 

রাগ টোড়ির শাস্ত্র:

আরোহী: সা ঋ জ্ঞা ক্ষা দা না র্সা
অবরোহী: র্সা না দা পা ক্ষা জ্ঞা ঋা সা ক্ষা জ্ঞা ঋা সা
চলন: স ঋ জ্ঞ ঋ জ্ঞ ক্ষ প, ক্ষ দ ন র্স ন দ প ক্ষ দ ক্ষ জ্ঞ ঋ জ্ঞ ঋ স
পকড়: দ্ ন্ স ঋ জ্ঞ ঋ স, ক্ষ জ্ঞ ঋ জ্ঞ ঋ স

তোড়ি সম্পর্কে আরও জানতে পারেন এই লিংকে ।

এনসিইআরটির টোড়ি রাগের টিউটোরিয়াল:

 

কন্ঠে তোড়ি:

কাজী নজরুল ইসলামের গানে তোড়ি:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. নয়ন মুদিল কুমুদিনী হায়
২. সেদিন অভাব ঘুচবে কি মোর (খট্‌ টোড়ি)
৩. সে ধীরে ধীরে আসি (দেশি টোড়ি)
৪. উদার অম্বরে দরবারে টোড়ি প্রশান্ত প্রভাত (দরবারী টোড়ি)

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে তোড়ি:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।

১. আর কি আমি ছাড়ব তোরে
২. ভবকোলাহল ছাড়িয়ে
৩. সখীরে পীরিত বুঝাবে কে

 

আধুনিক গানে তোড়ি:

১. মান্না দে – রাত জাগা দুটি চোখ (১৯৭৫- কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুর : রতু মুখাধ্যায়)

 

রাগিণী তোড়ী (বা রাগ তোড়ী) - রাগমালা পেইন্টিং
রাগিণী তোড়ী (বা রাগ তোড়ী) – রাগমালা পেইন্টিং

 

যন্ত্রে তোড়ি:

সেতারে তোড়ি:

সেতারে রাগ তোড়ি (মিঞা কি তোড়ি) বাজানো অত্যন্ত কঠিন এবং এটি শিল্পীর ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। এই রাগের গম্ভীর প্রকৃতি এবং কোমল স্বরের অতি সূক্ষ্ম কাজগুলো সেতারে ফুটিয়ে তোলার জন্য উচ্চতর দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

১. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে “রাগ মিঞা কি তোড়ি – আলাপ, জোড় ও ঝালা”। (এটি এই রাগের শান্ত ও আধ্যাত্মিক রূপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল)।

২. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে “রাগ মিঞা কি তোড়ি – আলাপ ও গৎ”। (মাইহার ঘরানার বিশেষ তানের কাজ এখানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়)।

৩. ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে “রাগ মিঞা কি তোড়ি – বিলম্বিত ও দ্রুত গৎ”। (গায়ন-অঙ্গের মাধ্যমে তোড়ির আকুলতা প্রকাশের জন্য এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী)।

৪. ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে “রাগ তোড়ি” (বিশেষ করে তাঁর বাম হাতের মীড় ও তানের কাজ এই রাগের গাম্ভীর্যকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে)।

সরদে তোড়ি:

সরদে রাগ তোড়ি (মিঞা কি তোড়ি) বাজানো অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ। সরদের গম্ভীর প্রতিধ্বনি তোড়ি রাগের অতি-কোমল স্বরগুলোর কারুণ্য ও আধ্যাত্মিকতাকে এক অনন্য উচ্চতা দান করে।

১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে “রাগ মিঞা কি তোড়ি – আলাপ, জোড় ও ঝালা” (এটি এই রাগের গাম্ভীর্য ও আধ্যাত্মিকতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন)।

২. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর সরদে “রাগ মিঞা কি তোড়ি – বিলম্বিত ও দ্রুত গৎ” (এতে তোড়ি রাগের চপলতা ও গতির চমৎকার মেলবন্ধন পাওয়া যায়)।

৩. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (গোয়ালিয়র/বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর ঐতিহাসিক রেকর্ড – “রাগ তোড়ি” (প্রাচীন ধ্রুপদী অঙ্গের বাজনা বোঝার জন্য এটি অপরিহার্য)।

৪. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরদে “রাগ তোড়ি – আলাপ ও তানাখ্রি” (এতে শাহজাহানপুর ঘরানার বিশেষ ছকবদ্ধ কাজ স্পষ্ট)।

 

তোড়ী রাগিণী - মুঘল, সময়কাল আনুমানিক ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ। সালার জং মিউজিয়াম।
তোড়ী রাগিণী – মুঘল, সময়কাল আনুমানিক ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ। সালার জং মিউজিয়াম।

 

সম্পর্কিত রাগ:

  • বিলাসখানি টোড়ি
  • আসাবরী টোড়ি
  • বাহাদুরী টোড়ি
  • আহিরী টোড়ি
  • ভূপাল টোড়ি
  • লাচারি টোড়ি
  • সহেলি টোড়ি
  • গুর্জরী টোড়ি
  • খট্‌ টোড়ি
  • জৌনপুরী টোড়ি
  • লক্ষী টোড়ি
  • মঙ্গল টোড়ি
  • হুসেইনি টোড়ি
  • সুহা টোড়ি
  • বৈরাগী টোড়ি
  • নিরঞ্জনী টোড়ি
  • আভেরী টোড়ি (স্বল্প প্রচলিত -আসাবরি আর খমাজ অঙ্গ মিশিয়ে)

নাম ছাড়া টোড়ির সাথে মিল নেই বিশেষ তেমন টোড়িও আছে, যেমন:

  • দেশি টোড়ি
  • অঞ্জনী টোড়ি
  • গোবর্ধনী টোড়ি

পন্ডিত ভাতখান্ডে উল্লেখ করেছেন আরও কিছু অপ্রচলিত টোড়ির নাম:

  • মার্গ টোড়ি
  • মুদ্রিকী টোড়ি
  • জিল্‌ফ টোড়ি
  • কাফী টোড়ি

 

 

tরাগ টোড়ি বা “তোড়ি” বা “মিঞা কি তোড়ি” বা “মিঞা-কি-টোড়ি”

 

 

আরও দেখুন: