রাগ টোড়ি পরিবার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ‘টোড়ি’ (Todi) কেবল একটি রাগ নয়, এটি একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং প্রাচীন ‘রাগাঙ্গ’। টোড়ি অঙ্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বর-সংগতি ‘র জ্ঞ র স’ (r G r S)। টোড়ি রাগের গভীরতা এবং এর গাম্ভীর্যের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই গুণী সঙ্গীতজ্ঞরা এই রাগ নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যার ফলে টোড়ি রাগাঙ্গকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল রাগের পরিবার।

টোড়ি রাগের চলন বেশ বক্র এবং এর কোমল স্বরগুলোর (কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, কোমল ধৈবত) প্রয়োগে এক ধরণের আকুলতা ও আধ্যাত্মিক ভাব ফুটে ওঠে।

রাগ টোড়ি পরিবার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগ টোড়ি পরিবার

 

টোড়ি পরিবারের শ্রেণিবিন্যাস

টোড়ি পরিবারের রাগগুলোকে মূলত তাদের গঠন এবং জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে আপনার দেওয়া তালিকাটি পরিমার্জিত রূপে তুলে ধরা হলো:

(ক) প্রধান টোড়ি গোষ্ঠী (শ্রেণি):

১. মিঞাকী টোড়ি: এটিই এই পরিবারের ‘আশ্রয়’ বা মূল রাগ। তানসেনের অমর সৃষ্টি।

২. গুর্জরী টোড়ি: এতে পঞ্চমের (P) ব্যবহার নেই।

৩. বিলাসখানী টোড়ি: তানসেনের পুত্র বিলাস খাঁর সৃষ্টি, এটি ভৈরবীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও চলনে টোড়ি অঙ্গের।

৪. ভূপাল টোড়ি: ওড়ব জাতির রাগ (সা রে জ্ঞ প ধ)।

৫. আহীর টোড়ি: আহীর ভৈরব ও টোড়ির সংমিশ্রণ।

৬. আসা টোড়ি: আসাভরী ও টোড়ির মিশ্রণ।

৭. গান্ধারী টোড়ি: টোড়ির সাথে আসাভরীর অঙ্গ যুক্ত।

৮. দেশী টোড়ি: টোড়ির একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় প্রকার।

৯. বাহাদুরী টোড়ি: বিভিন্ন রাগের মিশ্রণে তৈরি জটিল ও অপ্রচলিত রাগ।

১০. খট টোড়ি: ছয়টি রাগের মিশ্রণে গঠিত একটি দুর্লভ রাগ।

তালিকায় থাকা অন্যান্য নামসমূহ (পরিমার্জিত):

অঞ্জনী টোড়ি, কল্লাদ টোড়ি, ছায়া টোড়ি, দরবারী টোড়ি, নবাৎখানি টোড়ি, প্রথম টোড়ি, প্রভাত টোড়ি, পুন্নাগ টোড়ি, ফিরোজখানি টোড়ি, বরাটী টোড়ি, মার্গ টোড়ি, মোটকী টোড়ি, মোহন টোড়ি, রাম টোড়ি, শুদ্ধ টোড়ি, সাভেরী টোড়ি।

(খ) গোত্র ও উপ-তালিকা:

১. কাফি টোড়ি ২. আটকী টোড়ি ৩. পঞ্চমাস টোড়ি ৪. বরণ টোড়ি ৫. লছমী টোড়ি ৬. লাচারী টোড়ি ৭. সকারী টোড়ি ৮. হোসেনী টোড়ি।

নতুন ও অপ্রচলিত প্রকারভেদ:

কমল টোড়ি, তুরস্ক টোড়ি, নট টোড়ি, মালিনী টোড়ি, মঙ্গল টোড়ি, মুন্দরী টোড়ি, রঞ্জনী টোড়ি, ললিত টোড়ি।

টোড়ি বনাম ভৈরবী: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেকে ভুলবশত ভৈরবী (Bhairavi) এবং টোড়ি (Todi) গুলিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে বিলাসখানী টোড়ি বা লাচারী টোড়ির ক্ষেত্রে ভৈরবী অঙ্গের ছোঁয়া থাকায় এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

মূল পার্থক্য:

  • ভৈরবী অঙ্গ: এর মূল চলন হলো ‘জ্ঞ ম ধ প’ (G M d P) বা ‘স র ন ধ প’ (SrndP)।

  • টোড়ি অঙ্গ: এর মূল চলন হলো ‘জ্ঞ র স’ (grS) এবং এতে কড়ি মধ্যমের (M) প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জৌনপুরী বা আসাভরীকে টোড়ি বলা যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ তাদের চলন এবং মেজাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। টোড়ির আভিজাত্য বজায় থাকে তার নির্দিষ্ট অঙ্গ সঞ্চালনে, ঠিক যেমন গৌরী অঙ্গ বা শ্রী অঙ্গের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 রাগ টোড়ি পরিবার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

টোড়ি পরিবারের প্রতিটি রাগের নিজস্ব স্বতন্ত্র আবেদন রয়েছে। যদিও অনেক রাগ আজ লুপ্তপ্রায় বা অপ্রচলিত, তবুও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ ও ঐতিহ্যে এদের স্থান অনস্বীকার্য।

নোট:

১. আমার আগের লেকার ‘গুক্রী’-কে ‘গুর্জরী’ এবং ‘তৃপাল’-কে ‘ভূপাল’ করা হয়েছে, কারণ এগুলোই সঠিক নাম (আমার আগের লেখায় ভূল ছিল)।

 

আরও দেখুন: