রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ সূচি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় নাট্য, কাব্য ও অলঙ্কারশাস্ত্রে “রস” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজভাবে বললে, রস হলো সেই অনুভূতি বা সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা, যা কোনো শিল্প—যেমন গান, নাটক বা কবিতা—উপভোগ করার সময় আমাদের মনে সৃষ্টি হয়।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ সূচি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]

রস

আমাদের দৈনন্দিন জীবনটা কেমন? খুব সরল আর চড়া দাগের। রাস্তায় একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা দেখলে আমাদের বুকটা কেঁপে ওঠে, মনের ভেতর দলা পাকিয়ে আসে ভয় আর কষ্ট। আবার কোনো খুশির খবর পেলে আমরা হুট করে হেসে উঠি। এগুলো আমাদের একদম তাৎক্ষণিক ও বাস্তব অনুভূতি, যা আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় সরাসরি চারপাশ থেকে শুষে নেয়।

কিন্তু শিল্পের দুনিয়াটায় যখন আমরা পা রাখি, সমীকরণটা একদম বদলে যায়। থিয়েটারের মঞ্চে বা সিনেমার পর্দায় যখন আমরা দেখি কোনো খলনায়ক কাউকে নির্মমভাবে মারছে, আমাদের অবচেতন মন কিন্তু খুব ভালো করেই জানে—পুরো ব্যাপারটাই একটা নিখাদ অভিনয়, ওখানে কোনো রক্তই আসল নয়। অথচ, অভিনয়টা যদি জাদুকরী হয়, আমাদের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে, ভেতরের রাগটা চাড়া দিয়ে ওঠে। এই যে বাস্তবতা না জেনেও অবাস্তব একটা দৃশ্য দেখে মনের ভেতর অনুভূতির আলোড়ন তৈরি হওয়া—এটাই হলো ‘রস’।

সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানেন? এই রস তৈরি হওয়াটা কিন্তু একটা সূক্ষ্ম শিল্প। পর্দায় যদি একটু অতিরিক্ত নাটকীয়তা থাকে বা অভিনয়টা যদি কাঁচা হয়, আমাদের সেই আবেগ নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। করুণ রসের বদলে তখন মন মেজাজ খারাপ হয়ে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে যায়। দর্শক তখন ভাবেন, “ধুর! কী বানিয়েছে এসব!” অর্থাৎ, রস তখনই জমে ওঠে যখন সত্য আর কল্পনার মিশেলটা একদম পারফেক্ট হয়।

রস আসলে আমাদের মনের এক ধরণের পরিশীলিত মুক্তি। এটি বাস্তব জীবনের কষ্টের মতো আমাদের ভেঙে চুরমার করে না, বরং এক অদ্ভুত নান্দনিক আনন্দ দেয়। এই কারণেই যুগ যুগ ধরে বলা হয়ে আসছে—রস ছাড়া শিল্প আসলে প্রাণহীন একটা কঙ্কাল মাত্র।

প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে মানুষের মনের এই নানা ধরণের অনুভূতি আর রসকে চমৎকার কিছু ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন—

১. নাট্যশাস্ত্রের ৮ রস:

ভরত মুনির বিখ্যাত ‘নাট্যশাস্ত্র’ অনুযায়ী স্টেজে বা অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলার মতো রস মূলত ৮টি। খুব সহজ করে বললে, এগুলো হলো আমাদের মনের ৮টি আদিম অনুভূতি:

  • শৃঙ্গার: সেই চিরন্তন প্রেমের অনুভূতি।
  • হাস্য: মনের খোরাক জোগানো নির্মল হাসি।
  • করুণ: বুক ফেটে আসা কান্না বা বেদনা।
  • রৌদ্র: অন্যায়ের বিরুদ্ধে দগদগে রাগ বা ক্রোধ।
  • বীর: শিরদাঁড়া টান টান করা বীরত্ব ও উদ্দীপনা।
  • ভয়ানক: মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাওয়া হিমশীতল ভয়।
  • বীভৎস: কোনো নোংরা বা কুৎসিত কিছু দেখে জাগা তীব্র ঘৃণা।
  • অদ্ভুত: হাঁ করে তাকিয়ে থাকার মতো মহাজাগতিক বিস্ময়।

মজার ব্যাপার হলো, নাট্যশাস্ত্রে কিন্তু ‘শান্ত’ বলে আলাদা কোনো রস রাখা হয়নি। কারণ, স্টেজে যখন নাটক চলে, তখন সেখানে কোনো না কোনো দ্বন্দ্ব বা অ্যাকশন থাকতে হয়। একদম চুপচাপ শান্ত পরিবেশ তো আর থিয়েটারে জমে না! তাই অনেকে মনে করতেন, শান্ত ভাবটা আসলে করুণ রসেরই একটা অন্য পিঠ।

২. কাব্যশাস্ত্রের ‘নবরস’:

কিন্তু কবি-সাহিত্যিকরা যখন কবিতা বা গল্প লিখতে বসলেন, তারা বললেন—না, শুধু ৮টায় হবে না! মনের আরও একটা বড় জায়গা জুড়ে থাকে পরম শান্তি আর বৈরাগ্য। তাই কাব্যশাস্ত্রে যোগ হলো আরেকটি রস—‘শান্ত’। এই সব মিলিয়েই তৈরি হলো শিল্পের বিখ্যাত ‘নবরস’

এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীকালে কিছু পণ্ডিত সন্তানের প্রতি মা-বাবার যে ভালোবাসা, সেই ‘বাৎসল্য’ রসকেও এই তালিকায় জুড়ে দিয়েছেন। ফলে রসের সংখ্যা কোথাও কোথাও ১০টি পর্যন্তও গিয়ে ঠেকেছে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ সূচি । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ] :

১. রাগের রস – শৃঙ্গার (Shringara Rasa, love):

‘শৃঙ্গ’ শব্দটার একটা গভীর অর্থ আছে—এর সোজা সম্পর্ক খোদ কামদেব বা প্রেমের দেবতার সাথে। অর্থাৎ, যেখানে প্রেমের আগমন ঘটে, সেটাই হলো শৃঙ্গার রস। আমাদের শিল্পশাস্ত্রে একে ‘আদিরস’ বা সব রসের সেরা বলা হয়। নর-নারীর মনের ভেতরের যে প্রেম, নিবিড় ভালোবাসা, মিলন কিংবা বিরহের মিষ্টি আকুলতা—তার সবটাই এই রসের সম্পদ। সাহিত্য থেকে শুরু করে গানের ভুবন, সবখানেই এর রাজত্ব সবচেয়ে বেশি।

রাগের নাম: ইমন (যাঁর মিষ্টি সুরে সন্ধ্যার প্রেম জমে ওঠে), খাম্বাজ, তিলক কামোদ, দেশ, ঝিঁঝিট, পিলু এবং রাগেশ্বরী

 

২. রাগের রস – বীর (Vira Rasa, heroism):

দয়া, ধর্ম, দান এবং যুদ্ধের নিমিত্তে এই রসের উদ্ভব হয়। এর প্রত্যেকটির ভিতরে জয় লাভের ভাব থাকে। যার দ্বারা প্রতিকুল পরিবেশকে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার উদ্দীপনা প্রকাশ করা হয়। একই সাথে এতে থাকে বীরোচিত প্রতীজ্ঞা। ভায়নক, শান্ত রস বিরোধী। যেমন−

বারিদপ্রতিম স্বনে স্বনি উত্তরিলা
সুগ্রীব; “মরিব, নহে মারিব রাবণে,
এ প্রতিজ্ঞা শূরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে!
-মেঘনাদ বধ, সপ্তম সর্গ। মধুসূদন

রাগের নাম: আড়ানা, হামীর, শঙ্কর, ছায়ানট, হিন্দোল।

৩. রাগের রস – করুণ (Karuna Rasa, melancholia):

আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হলে, অকল্যাণ হলে, প্রিয়জন বিয়োগ ইত্যাদিতে এই রসের সৃষ্টি হয়। মূলত শোকের ভাব এতে প্রকাশ পায়। শৃঙ্গার এবং হাস্যরস এর বিরোধী। যেমন−
কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রুনীরে
শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া
সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,
কহিলা− সজল আঁখি সখীরে;−
“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!
-মেঘনাদ বধ, নবম সর্গ। মধুসূদন

৪. রাগের রস – রৌদ্র /রুদ্র (Raudra Rasa, fury) :

ক্রোধ রস থেকে এই রস উৎপন্ন হয়। ক্রোধের উগ্রতা এবং ভয়ঙ্কর রূপ হলো এই রস। এই কারণে ক্রোধকে এর স্থায়ীভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অলঙ্কার শাস্ত্রে একে রক্তবর্ণ ও রুদ্রদৈবত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন−

“কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি,
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
-মেঘনাদ বধ, তৃতীয় সর্গ। মধুসূদন

৫. রাগের রস – অদ্ভুত (Adbhuta Rasa, amazement) :

আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় থেকে উদ্ভুত বিস্ময়কর ভাবই হলো অদ্ভুত রস। সাধারণ অলৌকিক কোনো বিষয়কে এই রসকে উজ্জীবিত করা হয়। যেমন−

“সবিস্ময়ে রঘুনাথ নদীর উপরে
হেরিলা অদ্ভুত সেতু, অগ্নিময় কভু,
কভু ঘন ধূমাবৃত, সুন্দর কভু বা
সুবর্ণে নির্ম্মিত যেন! ধাইছে সতত
সে সেতুর পানে প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি
হাহাকার নাদে কেহ; কেহ বা উল্লাসে!
-মেঘনাদ বধ, অষ্টম সর্গ। মধুসূদন

৬. রাগের রস – ভয়ানক (Bhayanak Rasa, terror):

ভয় থেকে এই রসের উদ্ভব। বিপদজনক বা ভীতিপ্রত কোনো বিষয় থেকে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, প্রকাশই ভয়ানক।

৭. রাগের রস – বীভৎস (Bhibatsa Rasa, disgust):

কোনো কুৎসিৎ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা থেকে বিভৎস রসের সৃষ্টি হয়।

৮. রাগের রস – হাস্য (Hasya Rasa, comic):

কৌতুকজনক বাক্য বা আচরণ থেকে এই রসের উদ্ভব হয়।

৯. রাগের রস – শান্ত (Shanta Rasa, tranquility):

চিত্তকে প্রশান্ত দেয় এমন ভাব থেকে শান্ত রসের উদ্ভব হয়।

১০.রাগের রস – বাৎসল্য:

সন্তানের প্রতি স্নেহের যে ভাবের উদ্ভব ঘটে, তাই বাৎসল্য রস

 

নবরস ও সংশ্লিষ্ট রাগের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

ক্রমরসের নামমূল আবেগ (Emotion)সংশ্লিষ্ট রাগসমূহ (Examples)
শৃঙ্গারপ্রেম, রোমান্টিকতা, সৌন্দর্যইমন, খামাজ, তিলক কামোদ, দেশ, ঝিঁঝিট, পিলু, রাগেশ্বরী
করুণশোক, বিরহ, বিষাদআসাবরী, জৌনপুরী, শিবরঞ্জিনী, গুর্জরী তোড়ি, আহীর ভৈরব, ললিত
শান্তপ্রশান্তি, মুক্তি, আধ্যাত্মিকতাভৈরব, মালকোষ, ভূপালী, দরবারী কানাড়া, যোগ, শুদ্ধ কল্যাণ
বীরতেজ, সাহস, শৌর্যআড়ানা, হামীর, শঙ্কর, ছায়ানট, হিন্দোল, গৌড় মল্লার
হাস্যআনন্দ, কৌতুক, উল্লাসবাহার, বসন্ত, তিলং, কাফি (হোরি), দেশ (চপল চলনে)।
রৌদ্রক্রোধ, তীব্র তেজরৌদ্র ভৈরব, মেঘ, গৌড় মালহার (গম্ভীর রূপ), দুর্গা (তেজস্বী রূপ)।
অদ্ভুতবিস্ময়, অলৌকিকতাহংসধ্বনি, ললিত, কালাশ্রী, শিল্পীর নিজস্ব সৃজনশীল মিশ্র রাগ।
ভয়ানকআতঙ্ক, রহস্য, গা ছমছমে ভাবমারওয়া (গোধূলির থমথমে মেজাজে), বিভৎস ভৈরব, শ্রী (বিশেষ প্রয়োগে)।
বীভৎসঘৃণা, বিরক্তি, জুগুপ্সাশুদ্ধ রাগে বিরল; সাধারণত নাটকীয় সংগীতে বিবাদী স্বরের কর্কশ ব্যবহারে সৃষ্ট।

 

কখনো কখনো মনজগতের এই দ্বিতীয়তলে সৃষ্ট সৌন্দর্য শ্রোতা-দর্শকদের এতটাই গভীরে টেনে নেয়। সে তখন রসজগতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে কারণে অভিনয় দেখে মানুষ কাঁদে, হাসে, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। শোনা যায় ইতালি অভিযান শেষ নেপোলিয়ানের একদল সৈন্য, লিওনার্দো দ্যা ভিন্সি যে ঘরটিতে The Last Supper ছবিটি এঁকেছিলেন, সেই ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল।

যিশুখ্রিষ্টের পরম ভক্তদের কেউ কেউ তখন, যিশুর সাথে প্রতারণাকারী জুডাথের উদ্দেশ্য জুতো ছুঁড়ে মারে। ফলে সে সময়ও ছবিটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মূলত এই সৈনিকরা প্রথমে মনোজগতের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে একটি রৌদ্ররস দ্বারা দ্রবীভূত হয়েছিল। এরপর এরা ছবিটির বিষয়বস্তুটির সাথে এতটাই গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তাদের কাছে ছবির জুডাথ মনের গভীরতলে বাস্তব হয়ে উঠেছিল।

এখানে ছবির সৌন্দর্য নিয়ে সৈনিকরা মাথা ঘামায় নি। ছবিটি নষ্ট হয়ে যাবে এই মমতাও তাদের ছিল না। এই ছবিটি ঘটনাক্রমে একদল মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছিল। এই কারণে এই ছবিটিকে সৌন্দর্যহীন বলা যাবে। একটি কারণে ছবিটি সৌন্দর্যের দাবিদার হয়ে উঠে। তা হলো এর সততা এবং তার সমন্বয়। ছবিটির এই সততা এবং সমন্বয় সৈনিকদের বাস্তব জগত থেকে ভুলিয়ে ঠেলে দিয়েছিল কল্পজগতে।

 

আরও পড়ুন:

Leave a Comment