শ্রাবণের গম্ভীর বরষা আর মেঘ-মালহারের সজল আবহের পর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন অঙ্গনে পা রাখলে যে রাগটি তার মহিমান্বিত রাজকীয়তা, তীব্র ব্যাকুলতা এবং এক অপার্থিব ধ্যানমগ্ন গম্ভীর রূপ নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তা হলো ‘রাগ শ্রী’। রাগ শাস্ত্রে এই রাগটিকে অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন পুরুষ রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীন ‘রাগ-রাগিণী’ বর্গীকরণে যে ছয়টি মূল পুরুষ রাগের উল্লেখ পাওয়া যায় (ভৈরব, মালকোষ, হিন্দোল, শ্রী, দীপক ও মেঘ-মালহার), শ্রী রাগ তার অন্যতম। ঐতিহ্যগতভাবে এই রাগটি দেবাধিদেব শিবের সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
এর পাশাপাশি উত্তর ভারতের শিখ ঐতিহ্যেও এই রাগের অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ স্থান রয়েছে। শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’-এ ব্যবহৃত ৩১টি প্রধান রাগের মধ্যে শ্রী রাগটি তালিকার শুরুর দিকেই স্থান পেয়েছে। গুরু গ্রন্থ সাহিবের ১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় এই ঐতিহ্যবাহী রাগের প্রথম প্রামাণ্য রচনা ও বাণী পরিলক্ষিত হয়।
কথিত আছে, দিন ও রাত্রির সান্ধ্য সন্ধিক্ষণে প্রকৃতিতে যে এক গভীর উদাসীনতা ও তীব্র আকুলতা তৈরি হয়, রাগ শ্রী মূলত সেই অতীন্দ্রিয় মুহূর্তেরই সাঙ্গীতিক রূপ। প্রাচীন কিছু শাস্ত্রে একে শীতকালের সকালের রাগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আধুনিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ও প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী পণ্ডিত জাসরাজের মতে, “রাগ শ্রী হলো সন্ধ্যার রাগ, যা মূলত সূর্যাস্তের সময় গাওয়া উচিৎ। এটি করুণা এবং মহিমায় পূর্ণ, যা মূলত গভীর ভক্তি ও আত্মনিবেদনের মেজাজ তৈরি করে।” এর জটিল স্বরবিন্যাস এবং কোমল ঋষভ ও তীব্র মধ্যমের সূক্ষ্ম মীড় শ্রোতার মনে একই সাথে রাজকীয় আভিজাত্য, ভক্তি এবং বৈরাগ্যের সঞ্চার করে।

রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন
রাগ শ্রী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে প্রাচীন ও কঠিন রাগগুলির একটি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে এর স্বর প্রয়োগে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
- আদি রূপ (কাফি ঠাট): প্রাচীনকালে এই রাগে কোমল গান্ধার ও কোমল নিখাদ ব্যবহার করা হতো, যার ফলে এটি তৎকালীন কাফি ঠাটের অন্তর্গত ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীত পদ্ধতিতে আজও এই রাগটিকে কাফি ঠাটের সমতুল্য বলেই মনে করা হয়।
- মধ্যযুগীয় রূপ (খামাজ ঠাট): পরবর্তীকালে এই রাগে কোমল গান্ধারের বদলে শুদ্ধ গান্ধার ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং রাগটিকে খামাজ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- আধুনিক রূপ (পূরবী ঠাট): বর্তমান সময়ে এই রাগে কড়ি বা তীব্র মধ্যম এবং কোমল ঋষভের ব্যবহার সর্বজনস্বীকৃত। এই বিশেষ স্বরসংগতির কারণে আধুনিক সঙ্গীতশাস্ত্রে একে পূরবী ঠাটের অন্তর্গত করা হয়েছে।

রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: পূরবী ঠাট।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে পাঁচটি স্বর এবং অবরোহে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গপ্রধান রাগ।
- বাদী স্বর: ঋ (কোমল ঋষভ)।
- সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও ধৈবত (ধ) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ), শুদ্ধ গান্ধার (গ), কড়ি/তীব্র মধ্যম (হ্ম), পঞ্চম (প), কোমল ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন) এবং ষড়্জ (স)।
- বিস্তার: এটি মূলত মধ্য ও তারা সপ্তকভিত্তিক রাগ।
- সময়: সায়ংকালীন সন্ধিপ্রকাশ রাগ (সূর্যাস্ত ও সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণ)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, চিন্তাপ্রবণ, ভক্তিমূলক এবং রাজকীয় ব্যাকুলতায় ভরা।
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
র্স ন দ প ; হ্ম গ ঋ ; স চলনে কোমল ঋষভের ওপর যে নিখুঁত মীড় ও আন্দোলন সৃষ্টি করা হয়, সেটাই রাগ শ্রীর আসল প্রাণ।সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী: পূরবী ঠাটের এই রাগটিতেও কোমল ঋষভ এবং তীব্র মধ্যম ব্যবহৃত হলেও, এর বাদী-সমবাদী (গ-ধ) এবং স্বর চলাচলের ঢং শ্রী রাগ থেকে একে আলাদা করে।
- রাগ জেতশ্রী: শ্রী রাগের সাথে স্বরসামঞ্জস্য থাকলেও এটি মূলত কল্যাণ বা পূরবী অঙ্গের মিশ্রণে তৈরি একটি চঞ্চল প্রকৃতির রাগ।
- রাগ মারবা: কোমল ঋষভ ও তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ থাকলেও পঞ্চমের অনুপস্থিতি এবং মারবার আলাদা গায়কি শ্রী রাগের গম্ভীর রূপ থেকে একে স্পষ্ট পৃথক করে।
- রাগ গৌরী (পূরবী অঙ্গ): সায়াহ্নকালের এই রাগে শ্রী রাগের সুরচ্ছায়া ও কোমল স্বরের ব্যবহার বেশ কাছাকাছি অনুভূত হয়।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
আরও দেখুন:
