রাগ বাহার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ বাহার হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের বসন্ত ঋতুর অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত আনন্দময় একটি রাগ। এর সুরের মধ্যে বসন্তের সতেজতা, ফুলের প্রস্ফুটন এবং প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠার এক অপূর্ব প্রতিফলন পাওয়া যায়।

রাগ বাহার

রাগ বাহার: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ বাহার (Bahar) হলো মূলত বসন্ত ঋতুর আগমনী রাগ। নামের সার্থকতা অনুযায়ী ‘বাহার’ শব্দের অর্থ হলো সৌন্দর্য বা বসন্তের জোয়ার। এই রাগটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং কানাড়া অঙ্গের একটি রাগ হিসেবে পরিচিত। এর বিশেষত্ব হলো এর চঞ্চল এবং চপল প্রকৃতি। এটি গাওয়ার সময় শিল্পী দ্রুত তান এবং অলংকারের মাধ্যমে বসন্তের চাঞ্চল্য ফুটিয়ে তোলেন।

এই রাগের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে দুটি নিষাদ (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এতে ‘মধ্যম’ (ম) স্বরটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি বারবার ব্যবহৃত হয়ে রাগের শ্রী বৃদ্ধি করে। এটি মূলত একটি আনন্দ ও উল্লাসের রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতের রীতি অনুযায়ী, বসন্ত ঋতুতে এই রাগটি দিনের যেকোনো সময় গাওয়া যায়।

রাগের শাস্ত্র

রাগ বাহার-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • ঠাট: কাফি।
  • জাতি: ষাড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা ম, ম প গ ম, ন ধ নি সঁ (এখানে ‘গ’ কোমল এবং ‘নি’ শুদ্ধ ও কোমল উভয়ই ব্যবহৃত হয়)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ প, ম প গ ম, রে সা (এখানে ‘নি’ এবং ‘গ’ উভয়ই কোমল)।
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ‘ধৈবত’ (ধ) স্বরটি সরাসরি ব্যবহারের চেয়ে বক্রভাবে বেশি ব্যবহৃত হয় এবং ঋষভ (রে) আরোহে বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: গান্ধার (গ) সবসময় কোমল; নিষাদ (নি) আরোহে শুদ্ধ এবং অবরোহে কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি স্বরগুলো শুদ্ধ।
  • সময়: বসন্ত ঋতুতে যেকোনো সময়। অন্য ঋতুতে এটি মধ্যরাত্রি (রাত ১২টা থেকে ৩টা) পর্যন্ত গাওয়া হয়।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত চঞ্চল, আনন্দময় এবং উৎসবমুখর।

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

বাহার রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ বসন্ত: বসন্ত ঋতুর রাগ হলেও এর ঠাট ও স্বর প্রয়োগ বাহার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

  • রাগ মিয়াঁ কি মল্লার: বাহারের অবরোহের ‘নি ধ প’ চলনের সাথে মিয়াঁ কি মল্লারের কিছুটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

  • রাগ আড়ানা: কানাড়া অঙ্গের রাগ হওয়ার কারণে আড়ানার সাথে বাহারের চলনে কিছুটা মিল অনুভূত হয়।

  • রাগ শাহানা: এটিও কানাড়া অঙ্গের রাগ, তবে বাহারের মতো এতে বসন্তের চাঞ্চল্য নেই।

  • রাগ বসন্ত-বাহার: এটি একটি মিশ্র রাগ যেখানে বাহার ও বসন্ত রাগের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে।

রাগ বাহার তার জাদুকরী স্বরবিন্যাসের মাধ্যমে শ্রোতাকে এক আনন্দময় ভুবনে নিয়ে যায়। কানাড়া অঙ্গের গম্ভীরতা এবং বসন্তের চপলতা—এই দুইয়ের এক অদ্ভুত মিলন ঘটেছে এই রাগে। মধ্যম স্বরের প্রাবল্য এবং দুটি নিষাদের নিপুণ কারুকার্য একে অন্য সব রাগ থেকে আলাদা করে তুলেছে। শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে বাহারের উপস্থিতি মানেই এক প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত (লক্ষ্ণৌ সংস্করণ)।

৪. ভারতকোষ (সংগীত বিভাগ) — বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।

আরও দেখুন: