রাগ যোগ (Jog) হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত গম্ভীর এবং প্রভাবশালী রাগ। এর স্বরবিন্যাস এবং গায়কী শ্রোতার হৃদয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও ধ্যানমগ্ন আবেশ তৈরি করে।
রাগ যোগ
রাগ যোগ: পরিচয় ও বিশেষত্ব
রাগ যোগ মূলত একটি আধুনিক ও অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ। এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর চলনে দুটি ‘গান্ধার’-এর (শুদ্ধ ও কোমল) অত্যন্ত চতুর এবং শৈল্পিক প্রয়োগ। এই রাগের প্রকৃতি অত্যন্ত প্রশান্ত এবং গম্ভীর। অনেকে মনে করেন, এটি রাগ তিলং এবং রাগ কাফি-র একটি বিশেষ মিশ্রণের রূপ।
যোগ রাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘নিষাদ’ (নি) ও ‘গান্ধার’ (গ)-এর ব্যবহার। অবরোহের সময় যখন কোমল গান্ধার ব্যবহার করা হয়, তখন এক প্রকার বিষাদ বা বৈরাগ্য তৈরি হয়, যা এই রাগকে অনন্য করে তোলে। এটি মূলত মধ্যরাত্রির রাগ এবং ধ্রুপদ ও খেয়াল উভয় গায়কীতেই এর প্রয়োগ প্রচুর দেখা যায়।
রাগের শাস্ত্র
রাগ যোগ-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট: কাফি (যদিও অনেক পন্ডিত একে খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত বলে মনে করেন, তবে শুদ্ধ ও কোমল উভয় গান্ধার ব্যবহারের কারণে কাফি ঠাটই বেশি স্বীকৃত)।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা গ ম প নি সঁ (এখানে ‘গ’ শুদ্ধ এবং ‘নি’ কোমল)।
- অবরোহ: সঁ নি প ম গ ম গ্ সা (এখানে ‘নি’ কোমল, প্রথম ‘গ’ শুদ্ধ এবং দ্বিতীয় ‘গ্’ কোমল)।
- বাদী স্বর: মধ্যম (ম)।
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
- বর্জিত স্বর: আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধ) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: আরোহে শুদ্ধ গান্ধার (গ) এবং অবরোহে শুদ্ধ ও কোমল উভয় গান্ধার (গ ও গ্) ব্যবহৃত হয়। নিষাদ সবসময় কোমল (নি)। বাকি স্বর শুদ্ধ।
- সময়: মধ্যরাত্রি (রাত ১২টা থেকে ৩টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ধ্যানমগ্ন এবং বৈরাগ্যপূর্ণ।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
রাগ যোগ-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ তিলং: যোগ ও তিলং উভয় রাগের আরোহ একই রকম, কিন্তু যোগ রাগের অবরোহে কোমল গান্ধার (গ্) ব্যবহৃত হয় যা তিলং-এ নেই।
- রাগ রাগেশ্বরী: এই রাগেও ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত থাকে, তবে যোগ রাগের মতো কোমল গান্ধার ও পঞ্চমের ব্যবহার এতে ভিন্ন।
- রাগ চন্দ্রকৌনস: যোগ রাগের মতো এতেও ধৈবত ও ঋষভ বর্জিত, কিন্তু চন্দ্রকৌনসে পঞ্চম স্বরও বর্জিত থাকে এবং এতে কড়ি মধ্যমের প্রয়োগ দেখা যেতে পারে।
- রাগ নাটাই (কর্ণাটকী): দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতে এই রাগের চলনের সাথে রাগ যোগ-এর কিছুটা মিল পাওয়া যায়।
রাগ যোগ তার স্বরবিন্যাসের জটিলতা এবং মাধুর্যের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চেতনার এক উচ্চতর স্তরে নিয়ে যায়। এর গম্ভীর মেজাজ এবং শুদ্ধ-কোমল গান্ধারের দ্বন্দ্ব ও মিলন শ্রোতাকে এক নিবিড় ধ্যানের জগতে নিমজ্জিত করে। শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডি ছাড়িয়ে আধুনিক সেমি-ক্লাসিক্যাল গানেও এই রাগের প্রভাব অনস্বীকার্য। এটি এমন একটি রাগ যা শান্ত নিস্তব্ধ রাতে গীত হলে প্রকৃতির সাথে এক অপূর্ব একাত্মতা সৃষ্টি করে।
তথ্যসূত্র (Sources)
নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:
১. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
২. ক্রামিক পুস্তক মালিকা — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
৩. সংগীত তত্ত্ব — প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী।
৪. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সংগীত বিভাগের পাঠ্যক্রম।
আরও দেখুন: