রাগ দেবগিরি বিলাবল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিলাবল অঙ্গের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং শ্রুতিমধুর রাগ। এটি শুদ্ধ স্বরের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও এর বিশেষ চলন এবং বক্র গতির কারণে সাধারণ বিলাবল থেকে স্বতন্ত্র।
দেবগিরি বিলাবল বিলাবল ঠাট-এর একটি অন্যতম প্রধান প্রকারভেদ। ‘দেবগিরি’ নাম থেকে ধারণা করা হয় যে, এই রাগের উৎপত্তি দাক্ষিণাত্যের দেবগিরি (বর্তমান দৌলতাবাদ) অঞ্চল থেকে হতে পারে। এটি একটি প্রাচীন রাগ যা মধ্যযুগীয় সংগীত গ্রন্থগুলোতেও উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি মূলত বিলাবল এবং কল্যাণ অঙ্গের একটি সূক্ষ্ম মিশ্রণ, তবে এর মূল ভিত্তি বিলাবলই।
এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর আরোহের চলন। এতে আরোহে ‘মধ্যম’ (মা) স্বরটি বক্রভাবে বা অতি অল্প ব্যবহৃত হয়। দেবগিরি বিলাবলের চলনে ‘সা রে গা রে গা পা’—এই স্বরসঙ্গতিটি অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যদিও এটি বিলাবল ঠাটের রাগ, তবুও এর চলনে মাঝে মাঝে রাগের গভীরতা বাড়াতে কোমল নিষাদের (নি) অতি সামান্য স্পর্শ (বিবাদীর মতো) কোনো কোনো ঘরানায় দেখা যায়, তবে মূলত এটি শুদ্ধ স্বরের রাগ।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: বিলাবল।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
- আরোহ: সা, রে গা, রে গা পা, মা ধা, নি সা।
- অবরোহ: সা নি ধা পা, মা গা, রে সা।
- বাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
- সমবাদী স্বর: পঞ্চম (পা)। (কোনো কোনো মতে বাদী ‘ধা’ এবং সমবাদী ‘গা’)।
- বর্জিত স্বর: নেই।
- ব্যবহৃত স্বর: সব শুদ্ধ স্বর ব্যবহৃত হয়।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টা)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তিপ্রধান।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- শুদ্ধ বিলাবল: দেবগিরি বিলাবলের সাথে এর প্রচুর মিল থাকলেও, শুদ্ধ বিলাবলের চলন সরল, কিন্তু দেবগিরির চলন বক্র।
- আলহিয়া বিলাবল: আলহিয়া বিলাবলের অবরোহে কোমল নিষাদ (নি) স্পষ্ট থাকে, কিন্তু দেবগিরিতে শুদ্ধ স্বরের প্রাধান্য বেশি।
- যমন (ইমন): আরোহের ‘নি রে গা’ স্বরবিন্যাসের কারণে যমন রাগের সাথে এর কিছুটা সাদৃশ্য অনুভূত হতে পারে।
- রাগ গৌড় সারং: কিছু স্বরসঙ্গতি ও বক্র চলনের কারণে গৌড় সারংয়ের সাথে এর দূরবর্তী সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়।
রাগ দেবগিরি বিলাবল তার গাম্ভীর্য এবং শৈল্পিক বক্রতার জন্য সংগীত সমাজে অত্যন্ত সমাদৃত। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে এই রাগের আলাপ এবং বিস্তার শ্রোতার মনে এক প্রশান্ত ও আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। বিলাবল পরিবারের অন্যান্য রাগের তুলনায় দেবগিরি বিলাবল অনেক বেশি কারুকার্যময় এবং এটি শিল্পীর সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। শুদ্ধ স্বরের এই অপূর্ব সমন্বয় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অমূল্য সম্পদ।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় ও চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।
৩. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন।
৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।