রাগ দেশ (Desh) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয়, মধুর এবং সর্বজনীন একটি রাগ। এটি তার সরলতা এবং গভীর আবেদনের জন্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসর থেকে শুরু করে দেশাত্মবোধক গান এবং লোকসংগীত—সবখানেই সমানভাবে সমাদৃত। ভারতের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’-এর সুর এই রাগের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।

রাগ দেশ
রাগ দেশ মূলত খামাজ ঠাট-এর অন্তর্গত একটি রাগ। এর প্রাচীন উৎস সম্পর্কে মনে করা হয় যে, এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের লোকসুর থেকে বিবর্তিত হয়ে শাস্ত্রীয় রূপ লাভ করেছে। এটি একটি ‘শৃঙ্গার’ রস প্রধান রাগ, তবে এতে এক ধরণের বীরত্ব ও দেশপ্রেমের ভাবও ফুটে ওঠে। বর্ষাকালের রাগ হিসেবেও দেশের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে, কারণ এর স্বরবিন্যাস বৃষ্টির স্নিগ্ধতা ও সজলতাকে চমৎকারভাবে ধারণ করে।
দেশ রাগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দুটি নিষাদের (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহার। এর আরোহে শুদ্ধ নিষাদ (নি) এবং অবরোহে কোমল নিষাদ (ণি) ব্যবহৃত হয়। এই রাগের চলনে ঋষভ (রে) স্বরটি অত্যন্ত প্রবল এবং এটি বারবার ঘুরে ফিরে আসে। এর স্বরবিন্যাস অত্যন্ত ললিত এবং নমনীয় হওয়ায় এটি ঠুমরি, দাদরা এবং ভজনের জন্য খুবই উপযোগী। খামাজ রাগের সাথে এর মিল থাকলেও, আরোহে ঋষভের ব্যবহার এবং অবরোহে পঞ্চমের ওপর বিশেষ জোর একে আলাদা করে তোলে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: খামাজ।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫টি স্বর ও অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে মা পা নি সা।
- অবরোহ: সা ণি ধা পা, মা গা রে, নি(মন্দ্র) সা। (এখানে ‘ণি’ হলো কোমল নিষাদ)।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (রে)।
- সমবাদী স্বর: শুদ্ধ পঞ্চম (পা)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা), শুদ্ধ নিষাদ (নি) এবং কোমল নিষাদ (ণি)।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)। তবে বর্ষাকালে এটি যেকোনো সময় গাওয়া যায়।
- প্রকৃতি: চঞ্চল, শান্ত অথচ গম্ভীর এবং অত্যন্ত ভক্তি ও শৃঙ্গার রস প্রধান।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- খামাজ: খামাজে আরোহে ‘রে’ বর্জিত থাকে, কিন্তু দেশে ‘রে’ স্বরটি অত্যন্ত প্রবল এবং বাদী স্বর।
- তিলক কামোদ: তিলক কামোদের চলন অনেক বেশি বক্র এবং এটি দেশের চেয়ে গাম্ভীর্যপূর্ণ।
- সোরঠ: সোরঠ রাগের আরোহ-অবরোহ দেশের মতো হলেও এর চলন ভিন্ন এবং এতে অবরোহে গান্ধার বক্রভাবে ব্যবহৃত হয়।
- ঝিনঝুটি: ঝিনঝুটি মূলত মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে খেলা করে, যেখানে দেশ মধ্য ও তার সপ্তকে বেশি প্রভাবশালী।
- জয়জয়ন্তী: এটি একটি জটিল মিশ্র রাগ যাতে দেশ ও কাফি উভয় রাগেরই ছায়া বর্তমান।
রাগ দেশের আসল সৌন্দর্য এর ‘রে মা পা’ এবং ‘মা গা রে’ স্বর সংগতির মধ্যে নিহিত। যখন শিল্পী আরোহে শুদ্ধ নিষাদ স্পর্শ করে তার সপ্তকের ষড়জে পৌঁছান এবং অবরোহে কোমল নিষাদের মধ্য দিয়ে ‘ণি ধা পা’ হয়ে ঋষভে ফিরে আসেন, তখন এক অপূর্ব প্রশান্তি তৈরি হয়। দেশের ‘ঋষভ’ (রে) স্বরটি দীর্ঘায়িত করলে বর্ষার মেঘলা আকাশের মতো এক বিষণ্ণ অথচ মধুর আবহ তৈরি হয়।
এই রাগের নমনীয়তা এতই বেশি যে এটি সাধারণ মানুষের কানে খুব সহজে প্রবেশ করে। শাস্ত্রীয় আসরে ‘ঠুমরি’ গায়কিতে দেশের প্রয়োগ শিল্পী ও শ্রোতা উভয়ের জন্যই এক অত্যন্ত সুখকর মুহূর্ত তৈরি করে।
খাম্বাজ এমন একটি রাগ যা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ না থেকে ভক্তি, প্রেম এবং দেশাত্মবোধকে একই সুরে গেঁথেছে। এর সহজ স্বরবিন্যাস এবং দুটি নিষাদের জাদুকরী খেলা একে যুগের পর যুগ ধরে জনপ্রিয় করে রেখেছে। শুদ্ধ ঋষভের অটল স্থায়িত্ব এবং কোমল নিষাদের করুণ আর্তি দেশ রাগকে ভারতীয় সংগীতের ভাণ্ডারে এক অমূল্য এবং চিরস্থায়ী রত্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
চলুন কিছু গান বাজনা শোনা যাক …
কন্ঠে খাম্বাজ
কাজী নজরুল ইসলামের রাগ দেশ:
কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত সৃষ্টিতে রাগ দেশ-এর প্রয়োগ অত্যন্ত গভীর এবং নিপুণ। নজরুলের গানগুলোতে রাগের চলন এবং কাঠামো এতটাই স্পষ্ট থাকে যে, তা সাধারণ শ্রোতা বা শিক্ষার্থীদের ‘কান তৈরির’ জন্য আদর্শ পাঠ হিসেবে কাজ করে।
১. “বলরে জবা বল” — এটি নজরুলগীতির মধ্যে রাগ দেশ-এর একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ধ্রুপদী উদাহরণ। গানটির স্থায়ী ও অন্তরার ভাঁজে দেশের ‘ঋষভ’ (রে) ও ‘কোমল নিষাদ’ (ণি)-এর আর্তি জবা ফুলের প্রতি ভক্তি ও অভিমানকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে।
২. “পিয়া পিয়া পিয়া পাপিয়া পুকারে” — এই গানটিতে রাগ দেশ-এর চঞ্চল এবং বর্ষাকালীন মেজাজটি অত্যন্ত স্পষ্ট। বৃষ্টির দিনে বিরহী মনের আকুলতা প্রকাশে নজরুলের এই সৃষ্টিতে রাগ দেশ-এর আরোহ-অবরোহ নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. “শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে” — নজরুলের অন্যতম জনপ্রিয় এই বিরহী গানে রাগ দেশ-এর করুণ রস অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও এটি কিছুটা মিশ্র প্রকৃতির (ঝিনঝুটির স্পর্শ থাকতে পারে), তবে এর মূল ভিত্তি এবং গায়নশৈলী রাগ দেশ-এর ওপর দাঁড়িয়ে।
৪. “একি গভীর বাণী ওগো সুন্দর” — এই গানটিতে রাগ দেশ-এর আধ্যাত্মিক এবং শান্ত রূপটি পাওয়া যায়। নজরুলের এই নিবেদনমূলক গানে দেশের শুদ্ধ নিষাদ ও কোমল নিষাদের খেলা এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি করে।
৫. “মেঘ-মেদুর বরষায় কোথায় তুমি” — বর্ষার রাগাভিমুখী এই গানে নজরুল দেশ রাগের স্নিগ্ধতা ব্যবহার করেছেন। গানটি শুনলে রাগ দেশ-এর ‘রে মা পা’ এবং ‘মা গা রে’—এই স্বর সংগতিগুলো খুব সহজেই চেনা যায়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ দেশ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য সুরসৃষ্টিতে প্রচলিত রাগরাগিণীর অবয়ব গ্রহণ করলেও, অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রাগের ব্যাকরণগত শৃঙ্খলে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর সুরের গতিপথ প্রায়শই রাগের প্রথাগত কাঠামো অতিক্রম করে গেছে। সাধারণ শ্রোতার দৃষ্টিতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী সংগীতের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তাঁর গানগুলো সবসময় উত্তীর্ণ না-ও হতে পারে; তবে লক্ষ্যণীয় যে, অন্যান্য রাগের তুলনায় ‘দেশ’ রাগের চলন ও বৈশিষ্ট্য তিনি অনেক বেশি বিশ্বস্ততার সাথে অনুসরণ করেছেন।
১. “কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো!” — এটি রাগ দেশের একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল উদাহরণ। ঝম্পক তালের এই গানটিতে দেশ রাগের চপলতা এবং আর্তি দুই-ই চমৎকারভাবে মিশে আছে। এর সুরবিন্যাসে দেশ রাগের চলন বেশ স্পষ্ট।
২. “অনেক কথা বলেছিলেম কবে তোমার কানে কানে” — দাদরা তালে নিবদ্ধ এই গানটিতে দেশ রাগের রোমান্টিক এবং কিছুটা হালকা (Light classical) মেজাজ ফুটে উঠেছে। কবি এখানে রাগের শুদ্ধতার চেয়ে বিরহী ভাবের গভীরতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
৩. “তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর” — এই গানটিতে দেশ রাগের ভক্তি রস এবং সমর্পণ ভাবটি ফুটে উঠেছে। জানিপুরে থাকাকালীন রচিত এই গানে দেশ রাগের স্বরগুলো ধীর লয়ে এবং প্রশান্তভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. “একি গভীর বাণী ওগো সুন্দর” — (রাগ: দেশ, তাল: একতাল, রচনাকাল: ১২৯২ বঙ্গাব্দ)। এটি রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীত পর্যায়ের একটি গান। এই গানে দেশ রাগের আভিজাত্য এবং শান্ত মেজাজটি অত্যন্ত প্রামাণ্যভাবে বিদ্যমান। অনেক শাস্ত্রীয় শিল্পীও একে দেশ রাগের একটি শুদ্ধ উদাহরণ হিসেবে গণ্য করেন।
৫. “বজ্রমাণিক দিয়ে গাঁথা” — (রাগ: দেশ, তাল: দাদরা, রচনাকাল: ১৩২৬ বঙ্গাব্দ)। বর্ষা পর্যায়ের এই গানটিতে দেশ রাগের ‘সজল’ রূপটি ফুটে উঠেছে। যদিও এতে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সুরের কিছু বাঁক রয়েছে, তবুও এর মূল কাঠামো এবং ভাব পুরোপুরি দেশ রাগের অনুসারী।
আধুনিক গানে দেশ:
আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগে সুরকাররা রাগ দেশ-এর সহজবোধ্য মাধুর্য এবং এর ‘মাটির টান’ বা ‘আকুলতা’কে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন। আধুনিক গানে এই রাগের প্রয়োগ অনেক সময় সরাসরি শাস্ত্রীয় ঘরানাকে অনুসরণ করেছে, আবার কখনও কিছুটা লোকজ সুরের মিশ্রণে লঘু-শাস্ত্রীয় রূপ পেয়েছে।
১. “ওগো বৃষ্টি আমার চোখের আলো” (শিল্পী: রুমা গুহঠাকুরতা/আরতি মুখোপাধ্যায়, সুরকার: সুধীন দাশগুপ্ত) — রাগ দেশ-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এটি একটি কালজয়ী আধুনিক গান। বৃষ্টির আমেজ এবং দেশ রাগের অবরোহী স্বরবিন্যাস (ণি ধা পা) এই গানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
২. “এই তো সেদিন তুমি আর আমি” (শিল্পী: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুরকার: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়) — মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের শাস্ত্রীয় সংগীতে গভীর দখল ছিল, যা এই গানে প্রতিফলিত হয়েছে। দেশ রাগের শুদ্ধ ও কোমল নিষাদের খেলা এবং ঋষভ (রে)-এর প্রাধান্য গানটিকে অনন্য করেছে।
৩. “যদি ভুলে যাও মোরে” (শিল্পী: তালাত মাহমুদ, সুরকার: ভি. বালসারা) — তালাত মাহমুদের মখমলি কণ্ঠে দেশ রাগের এই আধুনিক গানটি এক বিরহী আবহ তৈরি করে। এর সুরের কাঠামোতে রাগ দেশ-এর মৌলিক চলনগুলো সার্থকভাবে বজায় রাখা হয়েছে।
৪. “সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে পাই না” (শিল্পী: আরতি মুখোপাধ্যায়, সুরকার: সুধীন দাশগুপ্ত) — সুধীন দাশগুপ্ত এই গানে দেশ রাগের চঞ্চল ও রঙিন দিকটি ব্যবহার করেছেন। গানটির সুরবিন্যাসে দেশ রাগের আরোহ ও অবরোহের প্রয়োগ একজন সাধারণ শ্রোতার কান তৈরির জন্য খুবই উপযোগী।
৫. “আকাশে আজ মেঘের খেলা” (শিল্পী: সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়) — বর্ষার পটভূমিতে তৈরি এই আধুনিক গানটিতে দেশ রাগের ‘সজল’ রূপটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গায়কি এবং দেশ রাগের স্বর-সংগতি গানটিকে শাস্ত্রীয় আভিজাত্য দান করেছে।
ভজনে দেশ:
ভজনে রাগ দেশ-এর প্রয়োগ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এই রাগের শান্ত, ভক্তিপূর্ণ এবং কিছুটা সজল প্রকৃতি ঈশ্বর-আরাধনা বা সমর্পণের ভাবের সাথে চমৎকারভাবে মিশে যায়। বিশেষ করে উত্তর ভারতীয় ভজন ঐতিহ্যে ‘দেশ’ রাগকে অত্যন্ত শুদ্ধ এবং ভক্তিপ্রধান রূপে ব্যবহার করা হয়েছে।
১. “ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে” (শিল্পী: মোহাম্মদ রফি, ছবি: বৈজু বাওরা, সুরকার: নওশাদ) — যদিও এটি একটি চলচ্চিত্র সংগীত, তবে এটি ভক্তিগীতির (ভজন) এক অনন্য নিদর্শন। এই গানটিতে রাগ দেশ-এর করুণ আর্তি এবং উচ্চ সপ্তকে ঋষভ (রে)-এর প্রয়োগ ভক্তির এক চরম শিখর ছুঁয়ে যায়।
২. “মনরে তু কাহে না ধীর ধরে” (শিল্পী: মোহাম্মদ রফি, সুরকার: রোশন) — এটি রাগ দেশ-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর ভজন। এর সুরবিন্যাসে দেশ রাগের অবরোহী স্বরগুলোর (ণি ধা পা) ব্যবহার মনকে স্থির ও সমাহিত করতে সাহায্য করে।
৩. “রামচন্দ্র কহে গয়ে সিয়া সে” (শিল্পী: অনুপ জালোটা) — আধুনিক ভজন সম্রাট অনুপ জালোটার এই বিখ্যাত ভজনটি রাগ দেশ-এর একটি চপল অথচ ভক্তিপূর্ণ রূপ। এতে দেশ রাগের শুদ্ধ ও কোমল নিষাদের খেলা খুব সহজেই ধরা পড়ে।
৪. “শ্যামল শ্যামল বরণ” (মীরা ভজন / পণ্ডিত ভীমসেন যোশী) — সন্ত মীরাবাঈয়ের এই পদটি যখন পণ্ডিত ভীমসেন যোশী গাইতেন, তখন তিনি এতে রাগ দেশ-এর গাম্ভীর্য ও আর্তি ফুটিয়ে তুলতেন। এটি দেশ রাগের ভক্তি রসের একটি উচ্চাঙ্গ উদাহরণ।
৫. “গোপাল গোকুল বল্লভী” (স্বামী বিবেকানন্দ / বিভিন্ন শিল্পী) — স্বামী বিবেকানন্দের রচিত বা প্রিয় অনেক ভজন রাগ দেশ-এর আশ্রয়ে গাওয়া হয়। এই ভজনটিতে দেশ রাগের মিষ্টত্ব ও আধ্যাত্মিক আবেদন অত্যন্ত প্রামাণ্যভাবে বিদ্যমান।
খেয়ালে রাগ দেশ:
খেয়াল গায়কিতে রাগ দেশ মূলত একটি ‘চপল’ বা ‘রোমান্টিক’ প্রকৃতির রাগ হিসেবে গণ্য হলেও, কিংবদন্তি শিল্পীরা তাঁদের ঘরানাগত বৈশিষ্ট্যে এই রাগকে এক অনন্য গাম্ভীর্য দান করেছেন। খেয়ালে দেশ রাগের প্রয়োগ সাধারণত মধ্য বা দ্রুত লয়ে বেশি দেখা যায়।
খেয়াল শোনার সময় খেয়াল করবেন কীভাবে শিল্পীরা ‘রে মা পা’ (আরোহ) এবং ‘ণি ধা পা’ (অবরোহ) স্বরসংগতি ব্যবহার করে রাগের চরিত্রকে প্রতিষ্ঠিত করছেন।
১. উস্তাদ রশিদ খান: রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার এই শিল্পীর কণ্ঠে ‘দেশ’ রাগের দ্রুত খেয়াল ও তানালাপ অত্যন্ত দানাদার এবং তাঁর স্বভাবসুলভ দরদী কণ্ঠে রাগের করুণ ও শৃঙ্গার রস একীভূত হয়েছে।
২. উস্তাদ আমীর খান: ইন্দোর ঘরানার এই মহীরুহের কণ্ঠে ‘দেশ’ রাগের অতি বিলম্বিত খেয়াল এক অভূতপূর্ব ধীরতা ও গাম্ভীর্য লাভ করেছে, যেখানে মন্দ্র সপ্তকের কাজের মাধ্যমে রাগের এক আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে ওঠে।
৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব: তাঁর গাওয়া ‘কেদার-দেশ’ (একটি মিশ্র রাগ) শাস্ত্রীয় সংগীতে এক বৈপ্লবিক সৃষ্টি, যেখানে তিনি কেদারের আভিজাত্যের সাথে দেশের লোকজ মাধুর্যের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
৪. বিদুষী কিশোরী আমোনকর: জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার এই বিদুষীর কণ্ঠে ‘দেশ’ রাগের বন্দিশে অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বর-প্রয়োগ এবং শুদ্ধ ও কোমল নিষাদের এক ললিত ও পরিশীলিত রূপ লক্ষ্য করা যায়।
৫. পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্র: কুমার গান্ধর্বের সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তাঁর গায়কিতে ‘দেশ’ রাগের এক মুক্ত ও সাবলীল প্রকাশ পাওয়া যায়, যেখানে তিনি রাগের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও নিজস্ব এক চপল মেজাজ ফুটিয়ে তুলেছেন।
৬. বিদুষী শোভা মুডগাল: তাঁর শক্তিশালী ও উদাত্ত কণ্ঠে ‘দেশ’ রাগের বন্দিশ ও তানালাপ অত্যন্ত বলিষ্ঠ, যা এই রাগের শাস্ত্রীয় আভিজাত্যকে বীরত্ব ও ভক্তির এক অনন্য স্তরে পৌঁছে দেয়।
যন্দ্রে দেশ:
সেতারে দেশ:
সেতারে রাগ দেশ (Desh) বাজানোর ক্ষেত্রে শিল্পীরা সাধারণত এই রাগের ‘গায়কি অঙ্গ’ এবং এর লোকজ মাধুর্যকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ইমদাদখানী (বা ইটাওয়া) ঘরানার শিল্পীদের হাতে এই রাগের মিঁড় ও গিটকিরি কাজগুলো এক অনন্য উচ্চতা পেয়েছে।
দেশ রাগ সেতারে শোনার সময় খেয়াল করবেন কীভাবে শিল্পীরা ‘রে মা পা’ সংগতিটি বাজানোর সময় ঋষভ (রে) স্বরটিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। মৈহার ঘরানার শিল্পীদের (রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়) বাজনায় তান্ত্রকারি বা যন্ত্রের নিজস্ব ঝঙ্কার বেশি পাবেন, আর ইমদাদখানী ঘরানার (বিলায়েত খাঁ, শহীদ পারভেজ) বাজনায় সুরের টানা বা মিঁড়ের কাজ বেশি লক্ষ্য করবেন যা দেশ রাগের মূল প্রাণ।
১. উস্তাদ শহীদ পারভেজ খান (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর সেতারে রাগ দেশ-এর দ্রুত গত্ এবং ঝালা অত্যন্ত আকর্ষণীয়; যেখানে ইমদাদখানী ঘরানার বিশেষ গায়কি ঢঙের মাধ্যমে রাগের করুণ ও রোমান্টিক ভাবটি ফুটে ওঠে।
২. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): সেতারে রাগ দেশ-এর এক অবিস্মরণীয় রূপ তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়, যেখানে তিনি ‘ঠুমরি অঙ্গ’-এর কাজ এবং সেতারের তারের ওপর কণ্ঠের মতো কারুকার্য ফুটিয়ে তোলেন।
৩. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মৈহার ঘরানা): তাঁর বাজনায় রাগ দেশ-এর এক অত্যন্ত শান্ত ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য লক্ষ্য করা যায়; তাঁর বিলম্বিত আলাপ ও জোড় অংশে রাগের প্রতিটি স্বর (বিশেষ করে শুদ্ধ ও কোমল নিষাদ) এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি করে।
৪. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মৈহার ঘরানা): তাঁর সেতারে রাগ দেশ-এর এক অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং লোকজ-ঘেঁষা রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে তিনি তবলার সাথে জাদুকরী লয়কারী এবং ঝালার মাধ্যমে রাগের চঞ্চল প্রকৃতিকে উদযাপন করেন।
৫. উস্তাদ সুজাত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তিনি প্রায়শই দেশ রাগ বাজানোর সময় সেতারের সাথে নিজেই কণ্ঠ মেলাতেন, যা এই রাগের ‘গায়কি’ মেজাজ এবং লোকজ শেকড়কে (যেমন—ভাটিয়ালি সুরের প্রভাব) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে।
সরদে দেশ:
সরোদ বাদনে রাগ দেশ (Desh) এক অনন্য গাম্ভীর্য ও মাধুর্য লাভ করে। সরোদের গম্ভীর নাদ এবং এর ‘ঘষট’ ও ‘মীড়’-এর কাজ এই রাগের সজল ও বীরত্বপূর্ণ মেজাজকে ফুটিয়ে তুলতে অত্যন্ত সহায়ক।
সরোদে দেশ শোনার সময় খেয়াল করবেন কীভাবে শিল্পীরা ‘মা গা রে’ এবং ‘নি(মন্দ্র) সা’ সংগতিগুলো বাজানোর সময় সরোদের কাঠের ওপর আঙুল স্লাইড করে এক ধরণের সজল আবহ তৈরি করেন। সরোদে এই রাগের ‘রে’ (ঋষভ) স্বরটি সেতারের তুলনায় অনেক বেশি গম্ভীর ও প্রভাবশালী মনে হয়।
১. উস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মৈহার ঘরানা): মৈহার ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর সরোদে রাগ দেশ-এর এক অত্যন্ত গভীর, শান্ত এবং আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে তাঁর ধীর লয়ের ‘আলাপ’ রাগের প্রতিটি স্বরকে এক অলৌকিক ব্যাপ্তি দান করে।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): তাঁর সরোদ বাদনে রাগ দেশ-এর ব্যাকরণগত শুদ্ধতা এবং বিশেষ করে এই রাগের তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা ও চমৎকার ‘তান’-এর কাজগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
৩. উস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): তাঁর সরোদে রাগ দেশ-এর একটি অত্যন্ত চঞ্চল, রোমান্টিক এবং লঘু-শাস্ত্রীয় ঠুমরি অঙ্গের প্রকাশ পাওয়া যায়, যেখানে দ্রুত গতির গত্ এবং একহারি তানের কাজ শ্রোতাকে মুগ্ধ করে।
৪. উস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): এই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংটিতে রাগ দেশ-এর অত্যন্ত প্রাচীন ও বিশুদ্ধ রূপটি সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে সরোদের তারে দেশ রাগের আদি ও অকৃত্রিম আভিজাত্য ফুটে ওঠে।
৫. উস্তাদ আশীষ খাঁ (মৈহার ঘরানা): আলী আকবর খাঁর সুযোগ্য পুত্র হিসেবে তাঁর সরোদ বাদনে মৈহার ঘরানার ঐতিহ্যবাহী গায়নশৈলী এবং আধুনিক লয়কারীর এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়, যা দেশ রাগের আধুনিক রূপটি বুঝতে সাহায্য করে।
বাঁশিতে দেশ:
বাঁশিতে রাগ দেশ (Desh) শোনা এক অনন্য অভিজ্ঞতা, কারণ এই যন্ত্রের প্রাকৃতিক ধ্বনি এবং দেশের ‘সজল’ ও ‘মাটির টান’ একে অপরের পরিপূরক।
বাঁশিতে একই ভাবে দেশ রাগ শোনার সময় ‘মা গা রে’ স্বরসংগতিটি বাজানোর সময় আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় এক ধরণের ‘আঁশ’ বা গিটকিরি তৈরি করেন। বিশেষ করে পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া-র বাঁশিতে ‘রে’ (ঋষভ) স্বরের ওপর দীর্ঘ স্থায়িত্ব এই রাগের মূল প্রাণ।
১. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া: আধুনিক বাঁশি বাদনের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর ‘দেশ’ রাগের পরিবেশনায় বৃষ্টির স্নিগ্ধতা এবং তবলার সাথে জাদুকরী লয়কারী এই রাগের চঞ্চল ও রোমান্টিক রূপকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ: বাঁশিতে শাস্ত্রীয় সংগীতের জনক হিসেবে তাঁর পরিবেশিত রাগ দেশ অত্যন্ত গম্ভীর ও আধ্যাত্মিক, যেখানে বড় বাঁশির (Bass Flute) মন্দ্র সপ্তকের কাজ রাগের প্রাচীন আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলে।
৩. পণ্ডিত রঘুনাথ শেঠ: তাঁর নিজস্ব ঘরানায় রাগ দেশের আলাপ ও ধুন অত্যন্ত সুমধুর, যেখানে তিনি প্রচলিত শাস্ত্রীয় কাঠামোর সাথে লোকজ সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
৪. পণ্ডিত বিজয় রাঘব রাও: পণ্ডিত রবিশঙ্করের শিষ্য হিসেবে তাঁর বাঁশিতে রাগ দেশের এক বৈচিত্র্যময় এবং গায়নশৈলী সমৃদ্ধ রূপ পাওয়া যায়, যা মৈহার ঘরানার যন্ত্রসংগীতের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে।
৫. পণ্ডিত রনু মজুমদার: বর্তমান সময়ের এই অগ্রগণ্য শিল্পীর বাঁশিতে রাগ দেশের একটি আধুনিক ও গতিশীল রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে দ্রুত গতির তান এবং নিখুঁত স্বরবিন্যাস শ্রোতাকে মুগ্ধ করে।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরবিন্যাস এবং চলনপ্রকৃতি আত্মস্থ করার জন্য অন্তত কয়েকটি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত অনুশীলন ও শ্রবণ করা একান্ত প্রয়োজন। স্বর-মালিকার পাশাপাশি দু-একটি লক্ষণ গীত (যা রাগের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা ‘লক্ষণ’গুলো সুরের মাধ্যমে বর্ণনা করে) শুনলে রাগের কাঠামোটি বোঝা আরও সহজতর হয়। মূলত রাগের ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যগুলো সহজে ধরার জন্যই শিক্ষার্থীদের লক্ষণ গীত শেখানো হয়, যা কার্যকারিতার দিক থেকে অনেকখানি ‘ছোট খেয়াল’-এর অনুরূপ। অনলাইনে এ ধরনের প্রচুর শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য। অনুসন্ধানের সুবিধার্থে নিচে দুটি নমুনা লিংক প্রদান করা হলো।
১. রাগ দেশ স্বরমল্লিকা।
২. এনিসিআরটির টিউটোরিয়াল।
দেশ সম্পর্কে আরও জানার জন্য:
২. অটোমেটেড ট্রান্সক্রিপশন প্রজেক্ট এর কেদার
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ দেশ। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:
