রাগ ধানেশ্রী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ ধানেশ্রী (Dhanashree) ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ রাগ। রাগ ধানেশ্রী কাফি ঠাট থেকে উদ্ভূত একটি রাগ। এটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি রাগ, যার উল্লেখ মধ্যযুগীয় বিভিন্ন সংগীত গ্রন্থে পাওয়া যায়। শিখ ধর্মগ্রন্থ ‘শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহেব’-এ এই রাগের বিশেষ স্থান রয়েছে, যেখানে এটি বৈরাগ্য ও ভক্তির সুরে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে শাস্ত্রীয় সংগীতে এককভাবে ধানেশ্রী গাওয়ার প্রচলন কিছুটা কম হলেও, এর বিভিন্ন প্রকার (যেমন—ভীমপলশ্রী বা পটদীপ) অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এই রাগটি একটি ঔড়ব-সম্পূর্ণ জাতির রাগ। অর্থাৎ, এর আরোহে পাঁচটি স্বর এবং অবরোহে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়। এটি ‘ভীমপলশ্রী‘ রাগের খুব কাছাকাছি, তবে এর বাদী-সমবাদী স্বর এবং চলনের ধরনে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। এতে কোমল গান্ধার (গা) এবং কোমল নিষাদ (নি)-এর প্রয়োগ এই রাগের মধ্যে এক ধরণের আকুলতা ও আধ্যাত্মিক ভাব তৈরি করে।

রাগ ধানেশ্রী এবং পুরিয়া ধানেশ্রী নামের মধ্যে মিল থাকলেও, শাস্ত্রীয় সংগীতে এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। এদের ঠাট, স্বরপ্রয়োগ এবং প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কাফি।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
  • আরোহ: নি(কোমল) সা গা(কোমল) মা পা নি(কোমল) সা।
  • অবরোহ: সা নি(কোমল) ধা পা মা গা(কোমল) রে সা।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (পা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (মা), ধৈবত (ধা) শুদ্ধ; গান্ধার (গা) এবং নিষাদ (নি) কোমল
  • সময়: দিনের তৃতীয় প্রহর (দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা)।
  • প্রকৃতি: ভক্তিপ্রধান, শান্ত এবং কিছুটা বিরহবিধুর।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • ভীমপলশ্রী: ধানেশ্রীর সাথে এর স্বর হুবহু মিলে যায়, কিন্তু ভীম্পলাসীর বাদী স্বর ‘মা’ এবং সমবাদী ‘সা’, যেখানে ধানেশ্রীর বাদী ‘পা’।
  • পটদীপ: এই রাগে শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহৃত হয়, কিন্তু ধানেশ্রীতে কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়।
  • কাফি: ধানেশ্রী কাফি ঠাটের রাগ হলেও কাফির চলন সম্পূর্ণ আলাদা এবং এতে আরোহে ‘রে’ ও ‘ধা’ ব্যবহৃত হয়।
  • শুদ্ধ ধন্যাসি: এটি ধানেশ্রীর দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সমগোত্রীয় রাগ।

 

রাগ ধানেশ্রী ভারতীয় সংগীতের সেই আধ্যাত্মিক ধারাকে বহন করে যা মানুষের মনকে শান্ত ও অন্তর্মুখী করে তোলে। যদিও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একে ভীম্পলাসীর সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, তবুও এর বাদী স্বর হিসেবে ‘পঞ্চম’ (পা)-এর প্রাধান্য একে একটি স্বতন্ত্র মাধুর্য দান করে। বিশেষ করে ভজন এবং কীর্তনে এই রাগের প্রয়োগ এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবেশ তৈরি করে। শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধতা ও লোকজ ভক্তির এক চমৎকার সমন্বয় এই রাগটি।

তথ্যসূত্র (Sources)

১. রাগ পরিচয় (দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।

৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।