রাগ নন্দ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ নন্দ (Nand) বা অনন্দ হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত জটিল, বিদগ্ধ এবং অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত রাগ। এটি তার অসাধারণ স্বর-সংগতি এবং ‘বক্র’ চলনের জন্য উচ্চস্তরের শিল্পী ও সংগীতবোদ্ধাদের কাছে এক অতি প্রিয় রাগ হিসেবে স্বীকৃত।

রাগ নন্দ

রাগ নন্দ মূলত কল্যাণ ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি ‘সংকীর্ণ’ বা মিশ্র প্রকৃতির রাগ। এই রাগের উৎস সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে সামান্য মতভেদ থাকলেও, এটি মূলত বিহাগ, কল্যাণ এবং হামীর—এই তিনটি রাগের উপাদানে তৈরি এক অনন্য শিল্পকর্ম। অনেকের মতে, এই রাগের নাম ‘নন্দ’ এসেছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পালক পিতা নন্দের নাম থেকে, যা এর আধ্যাত্মিক ও শান্ত মেজাজকে নির্দেশ করে। এটি একটি আধুনিক রাগ হিসেবে বিবেচিত এবং জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা ও আগ্রা ঘরানার শিল্পীদের মাধ্যমে এটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।

নন্দ রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অত্যন্ত বক্র চলন। এতে শুদ্ধ ও তীব্র—উভয় মধ্যমই ব্যবহৃত হয়। এই রাগের পকড় বা মূল চলন হলো ‘সা গা পা মা(শুদ্ধ) ধা পা’। এর গায়কি শৈলীতে ‘মীড়’ এবং ‘গমক’-এর সূক্ষ্ম কাজ লক্ষ্য করা যায়। এটি গাওয়ার সময় শিল্পী অত্যন্ত সর্তক থাকেন যেন এটি কোনোভাবেই বিহাগ বা কামোদ রাগের মতো না হয়ে যায়। এর চলনে এক ধরণের দোলাচল বা অনিশ্চয়তা থাকে যা শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। এটি মূলত গম্ভীর ও শান্ত রসের একটি রাগ।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়, তবে বর্জিত স্বরের মতো কৌশলে কিছু স্বর বাদ দিয়ে বক্রভাবে গাওয়া হয়)।
  • আরোহ: সা, গা, মা(শুদ্ধ) পা, ধা নি সা। (অনেক সময় ‘সা গা মা পা’ বা ‘সা রে গা মা পা’ ভাবেও গাওয়া হয়)।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা, মা(তীব্র) পা মা(শুদ্ধ) গা, রে সা।
  • বাদী স্বর: শুদ্ধ পঞ্চম (পা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) বক্রভাবে ব্যবহৃত হয় অথবা সরাসরি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত, আধ্যাত্মিক এবং অত্যন্ত শৈল্পিক।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • বিহাগ: আরোহে ‘সা গা মা পা’ সংগতিতে বিহাগের ছায়া পাওয়া যায়, তবে নন্দের বক্রতা বিহাগের চেয়ে অনেক বেশি।
  • কামোদ: কামোদে ‘রে পা’ সংগতি থাকে, নন্দেও ‘পা’ স্বরের আধিক্য আছে, কিন্তু নন্দের শুদ্ধ মধ্যমের প্রয়োগ কামোদ থেকে ভিন্ন।
  • হামীর: অবরোহে তীব্র মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়ার ভঙ্গিতে হামীরের আভাস পাওয়া যায়।
  • মারু বিহাগ: মারু বিহাগের মতো নন্দেও দুটি মধ্যম থাকে, তবে নন্দে শুদ্ধ মধ্যমটি অনেক বেশি জোরালো ও প্রভাবশালী।

রাগ নন্দের আসল সৌন্দর্য এর শুদ্ধ মধ্যমের (মা) ব্যবহারে। এটি এমন একটি রাগ যেখানে স্বরগুলো সোজা রেখায় চলে না। যখন শিল্পী “সা গা পা মা(শুদ্ধ)” অংশটি করেন, তখন শুদ্ধ মধ্যমটি এমনভাবে হৃদয়ে আঘাত করে যা অন্য রাগে সচরাচর দেখা যায় না। নন্দের অবরোহে যখন “পা মা(তীব্র) পা মা(শুদ্ধ) গা” অংশটি গাওয়া হয়, তখন দুটি মধ্যমের সহাবস্থান রাগটিকে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যায়।

এই রাগে পঞ্চম (পা) স্বরটি বাদী হওয়ায় এটি একটি অটল এবং গম্ভীর ভিত্তি দান করে। নন্দের চলন এমন যে এটি বারবার শ্রোতাকে চমকে দেয়। এর বক্রতা এতই সূক্ষ্ম যে একজন দক্ষ শিল্পী ছাড়া এই রাগের রূপ ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। জয়পুর ঘরানার কিংবদন্তি শিল্পী পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুর বা বিদুষী কিশোরী আমোনকর-এর কণ্ঠে নন্দ রাগের বিস্তার শুনলে এর আধ্যাত্মিক গভীরতা অনুভব করা যায়।

আধুনিক যুগে এই রাগের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। অনেক চলচ্চিত্রের গানেও নন্দের প্রভাব দেখা যায় (যেমন: সিনেমা ‘অমর প্রেম’-এর বিখ্যাত গান ‘ইয়ে কেয়া হুয়া’)। নন্দ রাগটি মূলত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক রাগ, যা একই সাথে বুদ্ধি এবং হৃদয়ের আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করে।

রাগ নন্দ হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের এক মায়াবী গোলকধাঁধাঁ। এটি এমন একটি রাগ যা কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা পথে না চলে নিজের বক্রতা ও স্বাতন্ত্র্য দিয়ে এক আলাদা জগৎ তৈরি করে। কল্যাণের আভিজাত্য এবং বিহাগের মাধুর্য মিলে নন্দে যে প্রশান্তি তৈরি হয়, তা অতুলনীয়। এটি কেবল একটি রাগ নয়, এটি একজন শিল্পীর কল্পনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বিশুদ্ধ সুরের সাধনা এবং ঘরানাগত ঐতিহ্যের সঠিক প্রয়োগই নন্দ রাগকে সংগীতের ভাণ্ডারে চিরকাল এক অমূল্য ও আভিজাত্যপূর্ণ রত্ন হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. রাগ পরিচয় (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (৩য় ও ৪থ ভাগ) – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।

৪. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।

৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann (Nand Section).

৬. অভিনব গীতাঞ্জলি (পঞ্চম খণ্ড) – পণ্ডিত রামাশ্রয় ঝা।

৭. Raga-Nidhi (Vol. 3) – B. Subba Rao.

আরও দেখুন: