রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগপুরী জগতে পুরিয়া ধানেশ্রী এমন এক রাগ, যার মধ্যে মিশে আছে চঞ্চলতা, কোমলতা ও গভীর রোমান্টিকতা। পূরবী ঠাটভুক্ত এই রাগটির স্বভাব কিছুটা খামখেয়ালি হলেও তা অত্যন্ত মায়াময়। শ্রোতার মনে রাগটি একদিকে যেমন অস্থিরতার সঞ্চার করে, তেমনি মুহূর্তেই এক অদ্ভুত প্রশান্তির আবেশ ছড়িয়ে দেয়। এই দুই বিপরীত ভাবের মেলবন্ধনই পুরিয়া ধানেশ্রীকে করে তুলেছে অনন্য।

 

রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী

 

উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

সঙ্গীতজ্ঞদের মতে, পুরিয়া ধানেশ্রী-এর নাম থেকেই বোঝা যায় এটি সম্ভবত দুইটি রাগের সংমিশ্রণ—“পুরিয়া” ও “ধানেশ্রী”। তবে, অনেক বিশারদ এই মতের সঙ্গে একমত নন। কারণ, রাগটির স্বরবিন্যাস ও মেজাজ উক্ত দুটি রাগের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অন্যদিকে, আরেকটি মত অনুসারে রাগটি মূলত পূরবী অঙ্গের রাগ, যা শ্রী, পূরবী, জৈতশ্রী এবং মালবী রাগের অঙ্গসমূহের সংমিশ্রণে গঠিত। এর ফলে রাগটি ধারণ করেছে এক গভীর সাংগীতিক ঐতিহ্য, যেখানে উত্তর ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতের পূরবী ঘরানার আবেগ, ভাব এবং বেদনার ছোঁয়া বিদ্যমান।

 

রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী

 

রাগের প্রকৃতি ও ভাবধারা

পুরিয়া ধানেশ্রী রাগটি মূলত চঞ্চল প্রকৃতির, কিন্তু তার এই চঞ্চলতা কখনোই অগভীর নয়। এতে একদিকে দেখা যায় সন্ধ্যার শান্ত স্নিগ্ধতা, অন্যদিকে থাকে এক ধরনের অন্তর্মুখী আকুলতা। এই রাগের আবেগকে কেউ বলেন বিরহমিশ্রিত প্রশান্তি, কেউ বলেন মৃদু রোমান্টিকতার প্রতিধ্বনি

যখন এই রাগ পরিবেশিত হয়, তখন শ্রোতার মনে যেন একটা সূক্ষ্ম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে — না দুঃখ, না আনন্দ, বরং মাঝামাঝি এক মনস্তাত্ত্বিক আবেগ, যা সঙ্গীতের গভীর রসকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

 

রাগ পুরিয়া ধানেশ্রীর ব্যাকরণ

ঠাট : পূরবী
জাতি : সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ ও অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়)
বাদী স্বর : পঞ্চম (প)
সম্বাদী স্বর : রিষভ (র)

আরোহণ : ন্ ঋ গ হ্ম প দ, প ন র্স
অবরোহণ : ন দ প হ্ম গ হ্ম ঋ গ ঋ স

এখানে কোমল রে ও কোমল ধা ব্যবহৃত হয়, যা পূরবী ঠাটের বৈশিষ্ট্য বহন করে। তীব্র মা রাগের আবেগীয় চরিত্রকে আরও রহস্যময় করে তোলে। ‘পঞ্চম’ এখানে রাগটির প্রাণ, যার চারপাশে পুরো মেলোডিক গঠনটি ঘুরে বেড়ায়।

 

পরিবেশনার সময় ও প্রভাব

পুরিয়া ধানেশ্রী সাধারণত সন্ধ্যাকালীন রাগ — সূর্যাস্তের পর, যখন আলো ও আঁধারের সীমারেখা মিলেমিশে যায়। এই সময়েই রাগটির আবেগ সবচেয়ে প্রখরভাবে ফুটে ওঠে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের মুহূর্তে রাগটির সুর যেন মানুষের অন্তরের গভীরতম ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে।

রাগটির মূল ভাব হলো ভক্তি (ভক্ত রস) এবং শৃঙ্গার রস-এর মিশ্রণ। ফলে এটি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি বা লঘু ধারা — সব জায়গাতেই অনায়াসে মানিয়ে যায়।

স্বরসংগীত ও ব্যবহার

পুরিয়া ধানেশ্রীর মূর্ছনা সাধারণত ধীর লয়ে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে উচ্ছ্বসিত হয়। এর আলাপ অংশে মৃদু ধীরগতি, বন্দিশে আসে সূক্ষ্ম লয়চঞ্চলতা, আর তান অংশে দেখা যায় শক্তিশালী মেলোডিক প্যাটার্ন। এর গায়কীতে অতিরিক্ত অলংকার বা দ্রুত গতি ব্যবহার করলে রাগের সৌন্দর্য হারিয়ে যায়, তাই এর পরিবেশনায় প্রয়োজন সূক্ষ্ম সংযম ও রসজ্ঞতা।

যেমন একটি ক্লাসিকাল আলাপ—

“প ন্ ঋ গ হ্ম প দ, প ন র্স…”
এই স্বরবিন্যাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার সমস্ত মাধুর্য ও রহস্য।

রাগ পুরিয়া ধানেশ্রী শ্রোতার মনে এনে দেয় এক প্রগাঢ় নীরবতা। এটি কোনো উচ্ছ্বসিত রাগ নয়, বরং ধীরে ধীরে আবেগের গভীরে নিয়ে যায়। মনকে করে তোলে ধ্যানমগ্ন, কখনও বা বিষণ্ণ। তবুও এর সুরে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি — যেন জীবনের সকল অস্থিরতার পর একটি গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস।

 

 

 

আরও দেখুন:

 

Declaimer:

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ হাম্বীর বা হামীর।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।