রাগ প্রভাত ভৈরব । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুবিশাল ভৈরব পরিবারে রাগ প্রভাত ভৈরব (Prabhat Bhairav) একটি অত্যন্ত গম্ভীর, পবিত্র এবং আধ্যাত্মিক ভাবোদ্দীপক রাগ। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি ভোরের বা ‘প্রভাতের’ রাগ। এটি মূলত দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাগের সংমিশ্রণ—ভৈরব এবং ললিত। এই দুই রাগের মিলনে এমন এক সুরমূর্তির সৃষ্টি হয় যা অন্ধকার কেটে আলোর আগমনের মুহূর্তে আত্মার ব্যাকুলতা ও পরমাত্মার প্রতি সমর্পণকে প্রকাশ করে।

রাগ প্রভাত ভৈরব

রাগ প্রভাত ভৈরবের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ প্রভাত ভৈরব মূলত ভৈরব ঠাটের একটি অতি উচ্চাঙ্গের মিশ্র রাগ। শাস্ত্রীয় সংগীতে একে ‘জোড় রাগ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই রাগের উদ্ভাবন ও গায়নশৈলীর প্রসারে বিভিন্ন ঘরানার ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের অবদান থাকলেও, মূলত গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানায় এর বিশেষ চলন লক্ষ্য করা যায়।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এতে উভয় মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) প্রয়োগ। ললিত রাগের ন্যায় এখানে শুদ্ধ মধ্যম থেকে তীব্র মধ্যমে যাওয়ার যে বিশেষ চলন, তা ভৈরব রাগের কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবতের সাথে মিলে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ও করুণ রসের সৃষ্টি করে। এই রাগের ইতিহাস মূলত ভৈরব রাগের বিবর্তনের সাথে যুক্ত, যেখানে শিল্পীরা ভোরের নিস্তব্ধতাকে আরও নিবিড়ভাবে প্রকাশের জন্য ললিতের কোমল ও তীব্র মধ্যমের ছোঁয়া যুক্ত করেছেন। এটি একটি ‘সন্ধিপ্রকাশ’ রাগ, যা দিনের প্রথম প্রহরে গীত হয়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: ভৈরব।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম মঁ প ধ ন স।
  • অবরোহ: স ন ধ প মঁ ম গ র স [এখানে উভয় মধ্যমের ব্যবহার বক্রভাবে হয়]।
  • বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
  • সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ এবং ধৈবত কোমল; মধ্যম শুদ্ধ ও তীব্র উভয়ই ব্যবহৃত হয়; বাকি স্বর শুদ্ধ।
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, ভক্তি ও বৈরাগ্য রসপ্রধান।

 

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: প্রভাত ভৈরবের মূল আধার এবং প্রধান অঙ্গ রাগ।
  • রাগ ললিত: এই রাগের উভয় মধ্যমের বিশেষ চলন প্রভাত ভৈরবের প্রাণ।
  • রাগ ললিত ভৈরব: উভয় রাগে ললিত ও ভৈরবের মিশ্রণ থাকলেও ললিত ভৈরবে ললিতের অঙ্গ বেশি প্রাধান্য পায়।
  • রাগ রামকালী: রামকালীতেও তীব্র মধ্যম ও কোমল নিষাদ থাকে, তবে প্রভাত ভৈরবের মতো ললিতের চলন থাকে না।
  • রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরব অঙ্গ থাকলেও অহির্ ভৈরবে কোমল নিষাদ ব্যবহৃত হয়, যা প্রভাত ভৈরবে নেই।

রাগ প্রভাত ভৈরব হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই পরম পবিত্র সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করে তোলে। ভৈরবের আভিজাত্য আর ললিতের মরমী আকুলতা—এই দুয়ের সার্থক মিলনই হলো এই রাগ। এর উভয় মধ্যমের আন্দোলন শিল্পীর গায়নশৈলীর গভীরতা এবং স্বরের ওপর সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ করে। যদিও আধুনিক সময়ের সাধারণ আসরগুলোতে এই রাগের চর্চা কিছুটা সীমিত, তবুও এর তাত্ত্বিক ও শৈল্পিক গুরুত্ব সংগীতের গবেষক ও প্রকৃত সাধকদের কাছে অপরিসীম। শুদ্ধ চিত্তে এই রাগের আলাপ শুনলে তা শ্রোতা ও শিল্পী উভয়কেই এক অপার্থিব প্রশান্তির জগতের সন্ধান দেয়।

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (Kramik Pustak Malika, খণ্ড ৩ ও ৪): ভৈরব ও ললিত অঙ্গের মিশ্র রাগসমূহের ব্যাকরণগত বিশ্লেষণের জন্য।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও নামকরণের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাগের তথ্যকোষ ও স্বর বিন্যাস যাচাইয়ের জন্য।

৫. অপ্রচলিত রাগ সংকলন (বিভিন্ন ঘরানা): প্রভাত ভৈরব-এর মতো জটিল মিশ্র রাগগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।

আরও দেখুন: