রাগ বাসন্তী কেদার হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত সুমধুর এবং জনপ্রিয় মিশ্র বা জোড় রাগ। এটি মূলত দুটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাগ—’বাসন্ত’ (বা বসন্ত) এবং ‘কেদার’-এর অপূর্ব সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। বসন্ত রাগটি মূলত বসন্ত ঋতুর সাথে জড়িত এবং এটি তার আনন্দময় ও উৎসবমুখর প্রকৃতির জন্য পরিচিত। অন্যদিকে, কেদার একটি অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত এবং অন্তর্মুখী প্রকৃতির রাগ। এই বিপরীতধর্মী দুটি রাগের মিলন এই রাগে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে, যা একই সাথে শ্রোতার মনকে চাঙ্গা করে তোলে এবং ভেতরে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভাব জাগিয়ে দেয়।
রাগ বাসন্তী কেদার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
ঐতিহ্যগতভাবে এই রাগটি বসন্ত ঋতুর সৌন্দর্য ও আনন্দকে যেমন ফুটিয়ে তোলে, ঠিক তেমনি জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপ নিয়ে এক গভীর ভাবনার উদ্রেক ঘটায়। এই রাগটি বিশেষ করে ‘জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা’-র শিল্পীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তাদের গায়নশৈলীতে এই রাগের বিশেষ চলন দেখা যায়।
এই রাগকে আর যে যে নামে ডাকা হয়:
১. রাগ বসন্ত কেদার
২. রাগ বাসন্ত কেদার
রাগের শাস্ত্র
ঠাটের সম্পর্ক: কল্যাণ ঠাট (যেহেতু এই রাগে তীব্র ও শুদ্ধ উভয় স্বরের চমৎকার খেলা রয়েছে, জয়পুর ঘরানার চলনে এর কাঠামোতে কল্যাণ ঠাটের প্রভাব স্পষ্ট)।
জাতি: সম্পূর্ণ (গান্ধার ও ঋষভ স্বরের বিশেষ প্রয়োগসহ এটি সপ্তকের সাতটি স্বরই ব্যবহার করে)।
আরোহ: সা ম, ম প, ধ প, ন ধ সাঁ
অবরোহ: সাঁ ন ধ প, মঁ প ধ প ম, গ রে সা
বাদী স্বর: শুদ্ধ মধ্যম (ম)
সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)
বর্জিত স্বর: নেই (গায়নশৈলী ভেদে আরোহে কখনো কখনো ঋষভ ও গান্ধার বক্র বা লুলিত করা হয়, তবে সামগ্রিকভাবে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়)।
ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ, ঋষভ, গান্ধার, মধ্যম (শুদ্ধ ও তীব্র উভয় রূপই ব্যবহৃত হয়) এবং ধৈবত স্বরগুলোর ওপর এই রাগে বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
সময়: বিকেল শেষের সময় বা সন্ধ্যার প্রথম প্রহর (লেট আফটারনুন বা আর্লি ইভিনিং)। তবে বসন্ত ঋতুতে এটি দিনের যেকোনো সময় পরিবেশন করা যায়।
প্রকৃতি: চঞ্চলতা ও গম্ভীরতার এক অনন্য মিশ্রণ। এটি ধীর লয়ে, মীন-এর (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে মসৃণভাবে গ্লাইড করা বা ভেসে যাওয়া) সূক্ষ্ম ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়।
সুর চিকিৎসায় এই রাগের ব্যবহারকি
সুর চিকিৎসা বা মিউজিক থেরাপির ক্ষেত্রে রাগ বাসন্তী কেদারের ব্যবহার নিয়ে কোনো বইতে সুনির্দিষ্ট কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে অনেকের মতে, যেহেতু এতে বসন্তের আনন্দ এবং কেদার রাগের গম্ভীর আত্মতুষ্টির সুর রয়েছে, তাই এটি মানুষের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে, মনকে অবসাদমুক্ত করতে এবং বিষণ্ণতা কাটিয়ে এক ধরনের পজিটিভ এনার্জি বা মানসিক উদ্দীপনা এনে দিতে সাহায্য করে।
রিলেটেড রাগের তালিকা
- রাগ কেদার: মূল ভিত্তি রাগ, যা এই রাগের গম্ভীরতা এবং মীন-এর কাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- রাগ বসন্ত: মিশ্রণের দ্বিতীয় রাগ, যা রাগে বসন্তের আনন্দময় মেজাজ এবং তীব্র মধ্যমের চমৎকার প্রয়োগ নিয়ে আসে।
- রাগ শুদ্ধ কল্যাণ: কল্যাণ ঠাটের অঙ্গের রাগ হিসেবে এর স্বর বিন্যাসের সাথে পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
- রাগ হংসধ্বনি: জয়পুর ঘরানার কিছু কিছু বন্দিশে এই রাগের চলনের সাথে বাসন্তী কেদারের বসন্ত অংশের স্বরক্ষেপণের হালকা মেলবন্ধন দেখা যায়।
রাগ বাসন্তী কেদার হলো রাগ বৈচিত্র্যের এক চমৎকার নিদর্শন। জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার উস্তাদদের হাত ধরে এই রাগটি যে রূপ পেয়েছে, তা এক কথায় অসাধারণ। একদিকে বসন্তের উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে কেদারের আধ্যাত্মিক গভীরতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া ধীর লয়ের এই রাগটি রাগসংগীতের জগতে এক অমূল্য সম্পদ।
সোর্স বা সূত্রাবলী
১. জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার ঐতিহ্যবাহী রাগ বন্দিশ ও গীতিসংকলন।
২. আকর রাগ দর্শন – পণ্ডিত ফণিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
৩. রাগ বিজ্ঞান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
আরও দেখুন:
