রাগ ভৈরব বাহার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অপূর্ব এবং চিত্তাকর্ষক মিশ্র রাগ হলো রাগ ভৈরব বাহার। নাম থেকেই স্পষ্ট যে এটি দুটি প্রধান রাগের সংমিশ্রণে তৈরি—’ভৈরব’ এবং ‘বাহার’। এটি একটি ‘জোড় রাগ’ বা সংকর রাগ, যা তার বৈচিত্র্যময় চলন এবং ঋতুভিত্তিক মাধুর্যের জন্য সংগীতজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।

রাগ ভৈরব বাহার

রাগ ভৈরব বাহারের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস

রাগ ভৈরব বাহার মূলত একটি সন্ধিপ্রকাশ রাগ (ভোরের রাগ) এবং ঋতুপ্রধান (বসন্তকাল) রাগের এক অনন্য মিলন। ভৈরব রাগটি গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক ভাবের প্রতীক, অন্যদিকে বাহার রাগটি চঞ্চলতা, আনন্দ এবং বসন্তের সজীবতার প্রতীক। এই দুই বিপরীতধর্মী মেজাজের মিলন ভৈরব বাহারকে এক বিশেষ গভীরতা দান করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে, এই রাগটি খুব প্রাচীন নয়। এটি মূলত ১৮শ বা ১৯শ শতকের দিকে উত্তর ভারতীয় সংগীতের পণ্ডিতদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর আরোহ ও অবরোহের কৌশলগত গঠন। সাধারণত আরোহের সময় ‘ভৈরব’-এর অঙ্গ (যেমন: স র গ ম) এবং অবরোহের সময় বা উত্তরাঙ্গে ‘বাহার’-এর অঙ্গ (যেমন: ম প ধ ন স বা বাহারের বিশেষ তানের কাজ) প্রয়োগ করা হয়। এতে ভৈরবের কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত এবং বাহারের দুই প্রকার নিষাদ (শুদ্ধ ও কোমল) ও শুদ্ধ মধ্যমের চমৎকার খেলা লক্ষ্য করা যায়। এটি গাওয়ার সময় শিল্পীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয় যাতে দুটি রাগের মিশ্রণ সুষম হয় এবং কোনো একটি রাগ অপরটিকে ছাপিয়ে না যায়।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: এটি একটি মিশ্র রাগ, তবে এর মূল আধার হিসেবে ভৈরব ঠাটকে গণ্য করা হয়।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহে ৭টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: স র গ ম প ধ ন স।
  • অবরোহ: স ন ধ প ম গ র স।
  • বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
  • সমবাদী স্বর: স (ষড়জ)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) ও ধৈবত (ধা) কোমল; নিষাদ (নি) আরোহে শুদ্ধ এবং অবরোহে কোমল; বাকি সব স্বর (সা, গা, মা, পা) শুদ্ধ
  • সময়: প্রাতঃকাল (ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর অথচ আনন্দদায়ক (ভক্তি ও শৃঙ্গার রসের মিশ্রণ)।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: ভৈরব বাহারের পূর্বাঙ্গ বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
  • রাগ বাহার: এই রাগের উত্তরাঙ্গ এবং চঞ্চলতা ভৈরব বাহারের প্রধান অলঙ্কার।
  • রাগ আনন্দ ভৈরব: স্বর বিন্যাসের ক্ষেত্রে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও আনন্দের ছোঁয়া এতে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়।
  • রাগ অহির্ ভৈরব: উভয় রাগে ভৈরবের অঙ্গ থাকলেও অহির্ ভৈরবে বাহারের পরিবর্তে কাফি ঠাটের প্রভাব থাকে।
  • রাগ নট ভৈরব: ভৈরব বাহারের মতো এটিও ভৈরবের একটি মিশ্র রূপ, তবে এতে নট রাগের প্রভাব থাকে।
  • রাগ বসন্ত বাহার: ভৈরব বাহারের মতো এটিও একটি ঋতুপ্রধান মিশ্র রাগ, তবে এর ভিত্তি ভিন্ন।

রাগ ভৈরব বাহার হলো শাস্ত্রীয় সংগীতের সেই বিশেষ সুর যা ভোরের নিস্তব্ধতাকে বসন্তের কলকাকলিতে পূর্ণ করে তোলে। এর গাম্ভীর্য এবং চঞ্চলতার ভারসাম্য একজন শিল্পীর সৃজনশীলতার চরম পরীক্ষা নেয়। এটি যেমন ভক্তি রস জাগিয়ে তোলে, তেমনই মনে এক ধরনের ফাল্গুনি আনন্দ সঞ্চার করে। এই রাগের সার্থকতা নিহিত আছে এর নিখুঁত স্বরক্ষেপণ এবং ভৈরব ও বাহারের সুনিপুণ সন্ধিস্থলে। আধুনিক শাস্ত্রীয় সংগীতে এই রাগের চর্চা আমাদের সংগীতের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিকে নতুন মাত্রা দান করেছে।

তথ্যসূত্র:

১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’ (খণ্ড ২ ও ৪): মিশ্র রাগের ব্যাকরণ ও ভৈরব বাহারের স্বর সংগতির প্রামাণ্য উৎস।

২. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’ (Sangeet Karyalaya): রাগের বাদী-সমবাদী এবং জাতি নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য আকর।

৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: মিশ্র রাগসমূহের পরিচয় ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক রেফারেন্স।

৪. Joep Bor — ‘The Raga Guide’: ভৈরব এবং বাহার অঙ্গের সঠিক মিশ্রণ ও তুলনামূলক আলোচনার আন্তর্জাতিক দলিল।

আরও দেখুন: