রাগ মারু বিহাগ (Maru Bihag) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, মধুর এবং গভীর আবেগপূর্ণ রাগ। এটি তার বিশেষ স্বর-সংগতি এবং আধ্যাত্মিক আকুলতার জন্য উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
রাগ মারু বিহাগ
রাগ মারু বিহাগ মূলত কল্যাণ ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত একটি আধুনিক রাগ। যদিও এর নামের সাথে ‘বিহাগ’ যুক্ত, তবে এটি বিলাবল ঠাটের ‘শুদ্ধ বিহাগ’ থেকে বেশ আলাদা। সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতে, রাগ বিহাগ, কল্যাণ এবং মারু (একটি রাজস্থানি লোকসুর)—এই তিনের সংমিশ্রণে মারু বিহাগের সৃষ্টি। তবে বর্তমানে এটি একটি স্বতন্ত্র রাগের মর্যাদা পায়। বিংশ শতাব্দীতে উস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেব এবং জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার শিল্পীদের মাধ্যমে এই রাগটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
মারু বিহাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র মধ্যমের (ক্ষা) শৈল্পিক প্রয়োগ। শুদ্ধ বিহাগে যেখানে শুদ্ধ মধ্যম প্রাধান্য পায়, মারু বিহাগে সেখানে তীব্র মধ্যম এবং পঞ্চমের সংগতি (পা ক্ষা পা) রাগটিকে এক গভীর গাম্ভীর্য দান করে। এই রাগের চলন কিছুটা বক্র এবং এর মেজাজ অত্যন্ত রোমান্টিক ও ভক্তিপ্রধান। এর আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত হলেও অবরোহে এদের সার্থক প্রয়োগ রাগটিকে পূর্ণতা দেয়।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: কল্যাণ।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
- আরোহ: সা গা মা(শুদ্ধ) পা, নি সা। (অনেক সময় ‘নি সা গা মা পা’ এভাবেও ব্যবহৃত হয়)।
- অবরোহ: সা নি ধা পা, মা(তীব্র) পা গা মা(শুদ্ধ) রে সা।
- বাদী স্বর: শুদ্ধ গান্ধার (গা)।
- সমবাদী স্বর: শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত শান্ত, গভীর, করুণ এবং শৃঙ্গার রস প্রধান।
সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ
- বিহাগ: মারু বিহাগের ভিত্তি বিহাগ হলেও, বিহাগে শুদ্ধ মধ্যম প্রধান এবং আরোহে তীব্র মধ্যম থাকে না।
- কল্যাণ (যমন): তীব্র মধ্যমের ব্যবহারের কারণে কল্যাণের ছায়া পাওয়া যায়, তবে মারু বিহাগের ‘মা(শুদ্ধ) গা’ সংগতি একে আলাদা রাখে।
- নন্দ: নন্দের সাথে মারু বিহাগের কিছুটা মিল আছে, তবে নন্দের চলন অনেক বেশি জটিল ও বক্র।
- হেম কল্যাণ: হেম কল্যাণের অবরোহের কিছু অংশের সাথে মারু বিহাগের স্বরবিন্যাসের মিল পাওয়া যায়।
মারু বিহাগের আসল মাধুর্য লুকিয়ে আছে এর তীব্র ও শুদ্ধ মধ্যমের লুকোচুরিতে। যখন শিল্পী “গা মা(শুদ্ধ) পা” করে পঞ্চমে যান এবং সেখান থেকে “পা মা(তীব্র) পা গা মা(শুদ্ধ) রে সা” করে ফিরে আসেন, তখন এক অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি হয়। এই রাগে গান্ধার (গা) স্বরটি অত্যন্ত প্রবল, যার ওপর শিল্পী দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করতে পারেন।
এই রাগের আরোহে ‘নি’ স্বরটি সরাসরি ‘সা’-তে যুক্ত হয় (নি সা), যা বিহাগ রাগের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। তবে মারু বিহাগে তীব্র মধ্যমটি পঞ্চমের সাথে যুক্ত হয়ে (পা ক্ষা পা) এমন একটি গাম্ভীর্য তৈরি করে যা সাধারণ বিহাগে পাওয়া যায় না। এটি গাওয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হয় যেন ‘রে’ এবং ‘ধা’ স্বর দুটি অত্যন্ত কোমলভাবে (দুর্বল স্বর হিসেবে) প্রযুক্ত হয়, নতুবা রাগের স্বরূপ নষ্ট হতে পারে।
অনেকে মনে করেন, মারু বিহাগের মেজাজ হলো কোনো এক গভীর রাতের নির্জনতায় প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার আকুলতা। এটি যেমন ধ্রুপদী খেয়ালে চমৎকার, তেমনি সেতার বা সরোদের মতো যন্ত্রসংগীতেও এর আবেদন অপরিসীম। জয়পুর ঘরানার বন্দিশ “তড়পত হুঁ জ্যায়সে জল বিন মীন” (জলের বাইরে মাছের মতো ছটফট করছি)—এই রাগের করুণ রসের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
রাগ মারু বিহাগ হলো সুরের এক মায়াবী অরণ্য। এটি আধুনিক হিন্দুস্থানি সংগীতের অন্যতম সফল মিশ্র রাগ যা তার স্বকীয় সৌন্দর্যে শুদ্ধ রাগকেও ছাপিয়ে গেছে। এর শান্ত প্রকৃতি এবং দুটি মধ্যমের শৈল্পিক মেলবন্ধন শ্রোতাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি দান করে।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. রাগ পরিচয় (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (৩য় ও ৪থ ভাগ) – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।
৩. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।
৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann (Maru Bihag Section)।
৬. অভিনব গীতাঞ্জলি – পণ্ডিত রামাশ্রয় ঝা।
আরও দেখুন: