রাগ মালকোষ উত্তর ভারতের এক অতি প্রাচীন, গম্ভীর ও জনপ্রিয় রাগ। মাত্র পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হলেও (সা, কোমল গা, শুদ্ধ মা, কোমল ধা এবং কোমল নি) এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশাল মাপের রাগ হিসেবে বিবেচিত। এর আরোহণ এবং অবরোহণে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) বর্জিত। মালকোষের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এর প্রতিটি স্বরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় এবং স্বরগুলোর মীড় ও জোড় অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। ফলে রাগটির বিস্তার ভীষণ বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়।
এই রাগে ধ্রুপদ, ধামার এবং খেয়াল পরিবেশন করা হয়। এর অতি গম্ভীর প্রকৃতির কারণে চপল অঙ্গের ঠুমরি বা টপ্পা সংগীতে মালকোষের ব্যবহার নেই বললেই চলে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক গানে এবং সিনেমার গানেও রাগ মালকোষের সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।
রাগ মালকোষ

বিশেষত্ব
- ধ্যানমগ্ন মেজাজ: রাগটির আবেগ গভীর, ধীর এবং ধ্যানমূলক। একে সাধারণত ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং অনন্ততার অনুভূতির সাথে যুক্ত করা হয়। গভীর রাতের (রাত্রির তৃতীয় প্রহর) নিস্তব্ধতায় গম্ভীর আবহ তৈরি করার জন্য এটি অদ্বিতীয়।
- বাদনে শ্রেষ্ঠত্ব: কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি যন্ত্রসঙ্গীতে (সেতার, সরোদ, রুদ্রবীণা) রাগ মালকোষের আলাপের কদর অনেক বেশি। ভারী কাজের জন্য একে যন্ত্রশিল্পীদের অন্যতম প্রিয় রাগ মনে করা হয়।
- পেন্টাটনিকের জাদু: রাগ মালকোষ “পেন্টাটনিক” (পাঁচ স্বরের) রাগ হওয়া সত্ত্বেও এর স্বর বিন্যাস ও চলনের কারণে এর মাধুর্য অসীম।
- পরিবার ও মিশ্রণ: মালকোষের রূপকে ভিত্তি করে বা অন্য স্বরের সামান্য পরিবর্তনে বহু নতুন রাগ তৈরি হয়েছে, যেমন— চন্দ্রকোষ (নিখাদ শুদ্ধ করে), মালগুঞ্জ ইত্যাদি। প্রাচীন রাগ-রাগিণী বিন্যাস পদ্ধতিতে মালকোষকে অন্যতম প্রধান “পুরুষ রাগ” হিসেবে গণ্য করা হতো।
ইতিহাস ও কিংবদন্তি
- পৌরাণিক উৎস: সনাতন কিংবদন্তি অনুযায়ী, মহাদেব শিবের বীরভদ্র রূপের ক্রোধ ও তাণ্ডব শান্ত করার জন্য দেবী পার্বতী এই সুরের সৃষ্টি করেছিলেন। মালকোষ নামটি এসেছে ‘মাল’ (অর্থ নাগ বা বীর) এবং ‘কৌশিক’ (অর্থ আকর্ষণ বা শান্ত করা) থেকে।
- ঐতিহাসিক প্রাচীনতা: মালকোষকে অনেকেই গান্ধর্ব বিদ্যার অন্যতম আদি সুর হিসেবে মনে করেন। এর অস্তিত্ব কয়েক শতাব্দী প্রাচীন।
- মর্যাদার প্রতীক: মোগল দরবারের সংগীতসম্রাট তানসেনের সময়কাল থেকেই এই রাগের আভিজাত্য রাজদরবারে স্বীকৃত ছিল। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে রাগ মালকোষ পরিবেশন করা যে কোনো শিল্পীর জন্যই এক বিরাট পরীক্ষা ও মর্যাদার ব্যাপার।
রাগ মালকোষের শাস্ত্র [Grammar of this Raga]
প্রকৃতি ও স্বরবিন্যাস:
- ঠাট: ভৈরবীর অন্তর্গত রাগ (ভৈরবী ঠাট)।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা)।
- ব্যবহৃত স্বর: সা, কোমল গা (জ্ঞা), শুদ্ধ মা, কোমল ধা (দা) এবং কোমল নি (নী)।
- বাদী স্বর: মধ্যম (মা)।
- সমবাদী স্বর: ষড়্জ (সা)।
- সময়: রাত্রির তৃতীয় প্রহর (গভীর রাত)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ধীর ও আধ্যাত্মিক ভাবসম্পন্ন।
আরোহণ-অবরোহণ:
- আরোহ: ণ্ স জ্ঞ ম দ ণ্ র্স
- অবরোহ: র্স ণ্ দ ম জ্ঞ স (অথবা র্স ণ্ দ ম জ্ঞ ম জ্ঞ স)
এই রাগে কোমল নিখাদ (ণ্) থেকে ষড়্জ (স)-এ যাওয়ার চলনটি এবং মধ্যম (ম) থেকে কোমল গান্ধার (জ্ঞা)-এ ফিরে আসার ভঙ্গিটি এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
পকড় (Pakar): মালকোষের স্বাতন্ত্র্যসূচক স্বরসমষ্টি বা পকড় হলো—
জ্ঞা ম দ ম জ্ঞ স বা ম জ্ঞ ম জ্ঞ স, ণ্ দ স
এতে রাগটির গম্ভীর মেজাজ এবং গভীর আবহ মুহূর্তেই শ্রোতার কানে ধরা পড়ে।

কন্ঠে মালকোষ:
ধ্রুপদে মালকোষ:
রাগ মালকোষের প্রামাণিক ধ্রুপদ বন্দিশ ও আলাপ (আর্কাইভ ও অডিও রেকর্ড অনুযায়ী):
১. ওম অনন্ত হরি নারায়ণ (নোম-তোম আলাপ) – ঘরানা: ডাগরবাণী। ডাগর ঘরানার শিল্পীরা ধ্রুপদের গান শুরু করার আগে এই বীজমন্ত্রের সিলেবলগুলো দিয়ে মালকোষের অতি গম্ভীর স্বর বিস্তার বা আলাপ করেন। (সূত্র: ডাগর ঘরানার ঐতিহাসিক অডিও রেকর্ডস)।
২. শঙ্কর মহাদেব (Shankara Mahadeva) – ঘরানা: ডাগর ঘরানা (ধ্রুপদ বন্দিশ, তাল: চৌতাল বা সুলতাল)। মালকোষের আভিজাত্য প্রকাশে ডাগর ভাইদের গাওয়া শিব আরাধনার সবচেয়ে প্রামাণিক ধ্রুপদ। (সূত্র: Shiva Mahadeva অ্যালবাম, ডাগর ব্রাদার্স)।
৩. পূজন চলি মহাদেব (Pujan Chali Mahadev) – ঘরানা: হিন্দুস্তানি প্রাচীন ধ্রুপদ (তাল: সুলতাল/চৌতাল)। মিয়া তানসেনের রচিত বলে প্রচলিত এই বন্দিশটিতে পার্বতীর শিব পূজার বর্ণনা রয়েছে। ধ্রুপদ শিল্পীরা মালকোষের চলন বোঝাতে এই বন্দিশটি প্রায়ই ব্যবহার করেন।
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন ।
খেয়ালে মালকোষ:
১. মন্দির দেখ ডরে মোরা মন – ধরন: বিলম্বিত খেয়াল (একতাল) – সূত্র: ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড-৩) ও ওস্তাদ আমীর খাঁ-এর HMV রেকর্ড – ইন্দোর ঘরানার এই কালজয়ী বন্দিশটি রাগ মালকোষের গভীর ধ্যানের শ্রেষ্ঠ প্রামাণিক দলিল।
২. আজ মোরে ঘর আয়ে বালমা – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ত্রিতাল) – সূত্র: পাটিয়ালা ঘরানার ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ-এর গায়কী ও ভাতখন্ডে স্বরলিপি – মালকোষের আনন্দময় ও চপল রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্য গোয়ালিয়র ও পাটিয়ালা ঘরানার সবচেয়ে জনপ্রিয় দ্রুত বন্দিশ।
৩. যা কহু সখি তু যা – ধরন: বিলম্বিত খেয়াল (ঝুমরা/তিলওয়াড়া) – সূত্র: জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার উস্তাদ আল্লদিয়া খাঁ সাহেবের ঐতিহ্য ও ভাতখন্ডে স্বরলিপি – রাধিকার বিরহের আর্তি প্রকাশ এবং জটিল তান প্রয়োগের জন্য জয়পুর ঘরানার প্রিয় বন্দিশ।
৪. পবন চলত বাহে মন্দ মন্দ – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ত্রিতাল) – সূত্র: পণ্ডিত ফৈয়াজ খাঁ (আগ্রা ঘরানা) এবং পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বন্দিশ আর্কাইভ – আগ্রা ঘরানার নিজস্ব রীতিতে মালকোষের আভিজাত্য ও বীরত্ব ফুটিয়ে তোলার জন্য এই দ্রুত বন্দিশটি অনন্য।
৫. মেরি গলে লাগ যা – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ত্রিতাল) – সূত্র: কিরানা ঘরানার ঐতিহ্য ও পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর রেকর্ড – মালকোষের কোমল স্বরগুলোর (গা ও নী) নিখুঁত মীন প্রয়োগ এই ছোট খেয়ালটিতে খুব চমৎকারভাবে শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে।
৬. কোয়লিয়া বোলে আম্বুয়া কি ডাল পর – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ত্রিতাল) – সূত্র: গোয়ালিয়র ঘরানা এবং আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমির (ITC-SRA) ডেটাবেজ – বসন্তের কোকিলের ডাক ও প্রকৃতির রূপ নিয়ে রচিত এই বন্দিশটি নতুন শিক্ষার্থীদের মালকোষ শেখার আদর্শ গান।
৭. লঙ্গর কা কয়সে ঘর জাঁউ – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ত্রিতাল) – সূত্র: গোয়ালিয়র ঘরানার প্রাচীন স্বরলিপি সংকলন – শ্রীকৃষ্ণের চপলতা ও পথ আগলে দাঁড়ানোর বর্ণনা সমৃদ্ধ এই বন্দিশটিতে মালকোষের গাম্ভীর্যের মাঝেও চপল ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়।
৮. সই মেরি মান রাখো – ধরন: বিলম্বিত খেয়াল (একতাল) – সূত্র: আগ্রা ঘরানার ওস্তাদ শরাফত হোসেন খাঁ-এর গাওয়া প্রামাণিক রেকর্ড ও আইটিসি আর্কাইভ – সুফি ও আধ্যাত্মিক ভাবের এই বিলম্বিত বন্দিশটি ঈশ্বরের কাছে সমর্পণের এক পরম উদাহরণ।
৯. আব তো যাগো চতুর সুজান – ধরন: দ্রুত খেয়াল (ঝপতাল/ত্রিতাল) – সূত্র: পাটিয়ালা ঘরানার প্রাচীন ওস্তাদদের মুখজ ঐতিহ্য এবং ভাতখন্ডে স্বরলিপি – প্রভাতী জাগরণী গীত হিসেবে মালকোষের গম্ভীর চলনকে এই বন্দিশে একটি সচেতনতার রূপ দেওয়া হয়েছে।
১০. চলো রে মাধো কে পাস – ধরন: মধ্যলয় খেয়াল (রূপক/ঝপতাল) – সূত্র: মেওয়াতি ঘরানার পণ্ডিত জসরাজ এবং ভাতখন্ডে স্বরলিপি – শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে যাওয়ার ভক্তিরসকে মালকোষের শাস্ত্রীয় কাঠামোর সাথে চমৎকারভাবে এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ মালকোষ:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. গরজে গম্ভীর গগনে কম্বু — ফিরোজা বেগম (নজরুলের এক অনবদ্য শাস্ত্রীয় বন্দিশ মালকোষে সুর করা)।
২. শ্মশান-চিতার ভস্ম মেখে — পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী / পান্নালাল ভট্টাচার্য (নজরুলের মালকোষ রাগে নিবদ্ধ এক কালজয়ী শ্যামাসংগীত)।
৩. নিশি ভোর হলো রে জাগো — পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী (ভোরবেলার আর্তি প্রকাশে মালকোষের চমৎকার প্রয়োগ)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ মালকোষ:
কবিগুরু তাঁর অনেক কম্পোজিশনেই প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।
রবীন্দ্রনাথের গানে মালকোষের শুদ্ধ প্রয়োগ খুঁজে পাওয়া কঠিন, তবে প্রাচীন ধ্রুপদ ভাঙা একটি গানে মালকোষের স্পষ্ট অবয়ব পাওয়া যায়: ১. আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে (রাগ: মালকোষ, তাল: চৌতাল) — এটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরেও বেশ সমাদৃত।
পুরো মালকোষে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সৃষ্টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই বিষয়ে গবেষক সমীর সেনগুপ্তের চমৎকার একটি বিশ্লেষণ রয়েছে —
“আর এইখানেই ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য থেকে রবীন্দ্রনাথ দূরে সরে যান। ইনি গান রচনা করেছেন, কিন্তু মালকোষে গান রচনা করেন নি। রবিশংকর যখন দু-ঘণ্টা মালকোষ বাজিয়ে ওঠেন, তখন তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করে না ‘মশাই, এই যে দু-ঘণ্টা মালকোষ বাজালেন, ঠিক কি বলতে চাইলেন বলুন তো?’ সেটা যতোখানি বেয়াদবি হবে, ততখানিই বেয়াদবি হবে রবীন্দ্রনাথের কোন গান, যেটা মালকোষের মত লাগছে, কিন্তু স্বর সবসময় মালকোষের মত চলছে না, বা কোথাও এমন পর্দা লাগছে যেটা মালকোষে লাগে না, সেটা মালকোষ হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ করা; কারণ রবীন্দ্রনাথ মালকোষে গান বাঁধেন নি। এবং সেখানেই তিনি রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন যেখানে তিনি মালকোষ থেকে সরে গেছেন।”

আধুনিক গানে রাগ মালকোষ:
আধুনিক বাংলা গানে শতভাগ ব্যাকরণ মেনে খাঁটি মালকোষের গান পাওয়া দুষ্কর। কিছু খুঁজে পেলে যুক্ত করবো।
১. মেনেছি গো হার মেনেছি — শিল্পী: জগন্ময় মিত্র (সুরকার: সুবল দাশগুপ্ত)। গানটির শুরুতে “মেনেছি গো হার মেনেছি…” অংশটিতে মালকোষ রাগের কোমল স্বরগুলোর প্রয়োগ (বিশেষ করে কোমল গা এবং কোমল ধা-এর নিখুঁত ব্যবহার) একদম স্পষ্ট ধরা পড়ে। পরে গিয়ে আবার ভৈরবী গেছে।
গজলে রাগ মালকোষ:
গজলেও আধুনিক গানের মতই অবস্থা। গজল গাওয়া হয় মূলত প্রেমের আর্তি, বিরহ বা হালকা চালের ভাব প্রকাশের জন্য। অন্যদিকে রাগ মালকোষ হলো প্রচণ্ড ভারী, গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক ধ্যানমূলক একটি রাগ। এই দুইয়ের মেজাজ সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়ায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে বিশুদ্ধ মালকোষে কোনো প্রামাণিক গজল নেই বললেই চলে! গজল সম্রাট ওস্তাদ মেহেদী হাসানও মালকোষের মতো গম্ভীর রাগকে গজলে না এনে মূলত ইমন, দরবারী, পিলু, পাহাড়ী বা খাম্বাজের মতো মেলোডি-প্রধান রাগে গজল বাঁধতেন।
হিন্দুস্থানি চলচ্চিত্রের গানে রাগ মালকোষ:
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠিন ব্যাকরণ সাধারণ গান-বাজনায় পুরোপুরি বজায় রাখা মুশকিল। তবে আমি সবসময় বলি, নতুনদের রাগাশ্রয়ী সাধারণ গানগুলো বেশি করে শোনা উচিত। এতে রাগের কঠিন তত্ত্বে না ঢুকেও খুব সহজে রাগের একটা বেসিক ছাঁচ বা অবয়ব অবচেতন মনে বসে যায়। কান তৈরির জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় নেই।
তবে রাগ মালকোষের সুর শোনার অভ্যাস করার জন্য আমাদের আধুনিক গান, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত কিংবা গজলের ওপর নির্ভর না করাই ভালো। কারণ, মালকোষের উপরে এসব ধারার গান তেমন একটা বাঁধা হয়নি। কিছু গানে মালকোষের হালকা অঙ্গ থাকলেও সেগুলো নতুন শ্রোতাদের শোনার জন্য আদর্শ নয়।
আমি বরং মালকোষের আসল রূপটি চেনার জন্য মালকোষের উপরে বাঁধা হিন্দি চলচ্চিত্রের গান শুনতে বলবো। কারণ, হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি সুরকাররা চলচ্চিত্রের গানে এই গম্ভীর রাগটির এমন নিখুঁত ও সহজ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, যা কান তৈরি করতে অতুলনীয় উদাহরণ হতে পারে।
হিন্দি চলচ্চিত্রে রাগ মালকোষের একটি তালিকা:
- মন তড়পত হরি দরশন কো – চলচ্চিত্র: বাইজু বাওরা (১৯৫২) – কণ্ঠ: মোহাম্মদ রফি – সুরকার: নওশাদ – বিশ্লেষণ: শাস্ত্রীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বিশুদ্ধতা ও ভক্তির সবচেয়ে নিখুঁত ও কালজয়ী মালকোষের গান।
- আয়ে সুর কে পঞ্চী আয়ে – চলচ্চিত্র: সুর সঙ্গম (১৯৮৫) – কণ্ঠ: পণ্ডিত রাজন মিশ্র – সুরকার: লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল – বিশ্লেষণ: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রামাণিক কণ্ঠশিল্পীর গায়কীতে ত্রিতাল লয়ে মালকোষের খাঁটি ধ্রুপদী রূপ।
- মন রে তু কাহে না ধীর ধরে – চলচ্চিত্র: চিত্রলেখা (১৯৬৪) – কণ্ঠ: মোহাম্মদ রফি – সুরকার: রোশন – বিশ্লেষণ: মালকোষের গভীরতা ও বিষাদকে চলচ্চিত্রের আধুনিক মেলোডিতে রূপান্তরের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
- তু হ্যায় আজা সানাম – চলচ্চিত্র: পেহচান (১৯৭০) – কণ্ঠ: মোহাম্মদ রফি ও সুমন কল্যাণপুর – সুরকার: শংকর-জয়কিশন – বিশ্লেষণ: গম্ভীর রাগ মালকোষকে রোমান্টিক ও চপল দ্বৈত কণ্ঠে মেলোডি রূপ দেওয়ার দারুণ প্রয়াস।
- এক লড়কি ভিগি ভাগি সি – চলচ্চিত্র: চলতে চলতে (১৯৫৮) – কণ্ঠ: কিশোর কুমার – সুরকার: এস. ডি. বর্মণ – বিশ্লেষণ: অবাক করা বিষয় হলেও কিশোর কুমারের এই অতি চপল হাস্যকৌতুকপূর্ণ গানটির মূল সুরের কাঠামো মালকোষের স্বর দিয়ে তৈরি।
- আধা হ্যায় চন্দ্রমা রাত আধি – চলচ্চিত্র: নবরং (১৯৫৯) – কণ্ঠ: আশা ভোঁসলে ও মহেন্দ্র কাপুর – সুরকার: সি. রামচন্দ্র – বিশ্লেষণ: মূল কাঠামোতে মালকোষের পাঁচটি স্বর (সা, জ্ঞা, মা, দা, নী) অক্ষুণ্ন রেখে তৈরি কালজয়ী মেলোডি।
- ছম ছম ঘুনঘুরু বোলে – চলচ্চিত্র: কাজল (১৯৬৫) – কণ্ঠ: আশা ভোঁসলে – সুরকার: রবি – বিশ্লেষণ: কত্থক নৃত্যের সাথে মানানসই দ্রুত লয়ে এবং ত্রিতালে মালকোষের শাস্ত্রীয় প্রয়োগ।
- আজ কি রাত বড়ি পুণ্য কি রাত – চলচ্চিত্র: অমর (১৯৫৪) – কণ্ঠ: মোহাম্মদ রফি – সুরকার: নওশাদ – বিশ্লেষণ: নওশাদ সাহেবের সুর করা আরেকটি আধ্যাত্মিক আরতি ঘরানার গান যা মালকোষের শান্ত রূপ প্রকাশ করে।
মালকোষে গীত:
ওস্তাদ বড় ফাতেহ আলী খান – পেয়ার নেহি হ্যায় সুরসে জিসকো।
ভজনে মালকোষ:
১. পায়ো জী ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো – কণ্ঠ: লতা মঙ্গেশকর – সুরকার: হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর – সূত্র: মীরাবাঈয়ের ভজন (HMV/Saregama আর্কাইভ) – ভজনটিতে মূলত শাস্ত্রীয় মালকোষের চলন ব্যবহার করে ভক্তি ও সমর্পণের এক পরম উচ্চতা তৈরি করা হয়েছে।
২. ম্যাই সানোঁ কিহি বিধি সুধ হোয় – কণ্ঠ: পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর – ঘরানা: গোয়ালিয়র ঘরানা – সূত্র: অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR) আর্কাইভ ও প্রাচীন ভক্তিগীতি রেকর্ড – মালকোষের তীব্র বিষাদ ও ভক্তিকে শাস্ত্রীয় গায়কীর মাধ্যমে নিবেদন করার এক ঐতিহাসিক প্রামাণিক দলিল।
৩. পাগ ঘুংরু বান্ধ মীরা নাচি রে – কণ্ঠ: পণ্ডিত ডি. ভি. পলুস্কর বা পণ্ডিত কুমার গন্ধর্ব – ঘরানা: গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয় ঐতিহ্য – সূত্র: প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মীরা ভজন রেকর্ড – সিনেমার চপল ভজনের সাথে একে গুলিয়ে ফেলা যাবে না; এটি শাস্ত্রীয় মার্গ সঙ্গীতে গাওয়া মালকোষের খাঁটি ভজন।
৪. ঐসা সুবচন বোলো রে – কণ্ঠ: পণ্ডিত জসরাজ – ঘরানা: মেওয়াতি ঘরানা – সূত্র: হরেকৃষ্ণ মন্দির ও মেওয়াতি ঘরানার ভজন সংকলন – মালকোষের শান্ত রূপের ওপর ভিত্তি করে নীতিশিক্ষা ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনবদ্য নিবেদন।
৫. রাম রঙ্গে রাঙলে মন – কণ্ঠ: পণ্ডিত ভীমসেন যোশী – ঘরানা: কিরানা ঘরানা – সূত্র: সন্ত তুকারামের অভঙ্গ (Abhang) বা ভজন রেকর্ড – মালকোষের পাঁচটি স্বরকে অক্ষুণ্ন রেখে মারাঠি ভক্তিমূলক এই ভজনটিতে আধ্যাত্মিক আনন্দের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
চেতনা সঙ্গীত:
১. দিয়েছো দিশা তুমি – অ্যালবাম: তোমার অমৃত বাণী (মতুয়া চেতনা সঙ্গীত) – কণ্ঠ: অন্তরা বিশ্বাস – কথা ও সুর: পবিত্র বিশ্বাস – রাগ: মালকোষ (লোকায়ত প্রয়োগ) – তাল: আদ্ধা – মন্তব্য: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রথাগত গাম্ভীর্যকে বাংলার লোকায়ত ভক্তি ও মতুয়া দর্শনের সাথে মিলিয়ে মালকোষের এক সহজ ও সুন্দর মেলোডি তৈরি করা হয়েছে।
মালকোষে জিনান (শিয়া ইসলাইলীদের ভক্তি সঙ্গীত):
১. আলি আলি মহিঁ রহম রহমান (Ali Ali Mahin Reham Rehman) – ধারা: শিয়া ইসমাইলি জিনান (Ginan/Sufi Kalam) – কণ্ঠ: আবিদা পারভীন – রাগ: মালকোষ (সুফি অঙ্গ) – মন্তব্য: হযরত আলীর শানে রচিত প্রাচীন আধ্যাত্মিক সিন্ধি/হিন্দি জিনান, যা আবিদা পারভীন সাহেব মালকোষের বিষাদ ও বীরত্বপূর্ণ সুফি মেজাজে গেয়েছেন।

যন্ত্রে মালকোষ:
সেতার:
১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (Pandit Ravi Shankar) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা – সূত্র: The Master Musicians of India (Live Recording) – মালকোষের ধীর আলাপের গভীরতা ও জোড় অংশের নিখুঁত মীড়-এর ব্যবহার মাইহার ঘরানার এই রেকর্ডে অনন্য।
২. ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (Ustad Vilayat Khan) – ঘরানা: ইটাওয়া বা ইমদাদখানি ঘরানা – সূত্র: The Genius of Vilayat Khan (Saregama Archive) – সেতারে মানুষের গলার গান ফুটিয়ে তোলার গায়াকী অঙ্গের প্রয়োগে ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর এই রেকর্ডটি এক চরম বিস্ময়।
৩. পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জী (Pandit Nikhil Banerjee) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা – সূত্র: Live at Amsterdam, 1984 (Live Classical Archive) – মালকোষের বিলম্বিত আলাপে যে মায়াবী বিষাদ ও আধ্যাত্মিক ধ্যান থাকে, তা নিখিল ব্যানার্জীর সেতারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
৪. ওস্তাদ রইস খাঁ (Ustad Rais Khan) – ঘরানা: মেওয়াতি/ইমদাদখানি ঘরানা – সূত্র: Great Sitar Maestros (HMV Classic Collection) – অতি দ্রুত লয়ে এবং ত্রিতালে মালকোষের চলনে ওস্তাদ রইস খাঁর হাতের কাজের নিখুঁত গতি বা স্পিড এই রেকর্ডটিতে উপভোগ্য।
৫. ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খাঁ (Ustad Shahid Parvez Khan) – ঘরানা: ইটাওয়া বা ইমদাদখানি ঘরানা – সূত্র: Live in Concert (Saptak Archives) – আধুনিক প্রজন্মের মধ্যে বিলায়েত খাঁ ঘরানার খাঁটি ধারক হিসেবে শাহিদ পারভেজের মালকোষের গায়াকী ও ঝালা কাজ এক পরম সুন্দর শ্রবণ অভিজ্ঞতা।
৬. পণ্ডিত কার্তিক কুমার (Pandit Kartick Kumar) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা – সূত্র: Maestros Choice (Saregama/HMV) – রবিশঙ্করের সরাসরি এই সুযোগ্য শিষ্যের সেতারে মালকোষের ঐতিহ্যবাহী মাইহার চলন খুব সুন্দর ও নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে।
৭. ওস্তাদ ইমরত খাঁ (Ustad Imrat Khan) – ঘরানা: ইটাওয়া বা ইমদাদখানি ঘরানা – সূত্র: Ragas of India (Navras Records Archive) – সেতার ও সুরবাহারে ওস্তাদ ইমরত খাঁর মালকোষ পরিবেশন ধ্রুপদ অঙ্গের গম্ভীরতার এক অন্যরকম ঐতিহাসিক ছোঁয়া দেয়।
৮. পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখার্জী (Pandit Budhaditya Mukherjee) – ঘরানা: ইমদাদখানি ঘরানা – সূত্র: Live at NCPA Mumbai (Classical Heritage) – বুধাদিত্য মুখার্জীর দ্রুত গতির নিখুঁত কাজ এবং নিখাদ মালকোষের স্বর প্রয়োগ তাঁকে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত করেছে।
৯. পণ্ডিত অরবিন্দ পারিখ (Pandit Arvind Parikh) – ঘরানা: ইটাওয়া ঘরানা – সূত্র: Music of India (Saregama Archive) – বিলায়েত খাঁ সাহেবের এই গুণী শিষ্যের মালকোষ রেকর্ডে সেতারের অতি সূক্ষ্ম কাজ ও ব্যাকরণের শুদ্ধতা দেখার মতো।
১০. পণ্ডিত কুশল দাস (Pandit Kushal Das) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা – সূত্র: Live Concert Records (Chhandayan Archive) – আধুনিক মাইহার ঘরানার ধারক কুশল দাসের সেতারে মালকোষ রাগের ধ্রুপদী গভীরতা খুব শান্ত ও সুগঠিত মেলোডি তৈরি করে।
সাঁনাই:
সানাই ফুঁ দিয়ে বাজানোর যন্ত্র হওয়ায় এতে মালকোষের কোমল গান্ধার (জ্ঞা) এবং কোমল নিখাদের (নী) যে একটানা দীর্ঘ স্থিতি বা মীড় দেওয়া যায়, তা অন্য অনেক তারের যন্ত্রেও আনা কঠিন। বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেবের মালকোষের বিলম্বিত অংশটি শুনলে বোঝা যায় কেন সানাইকে আধ্যাত্মিক সুরের প্রতীক বলা হয়।
১. ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ (Ustad Bismillah Khan) – ঘরানা: বেনারস ঘরানা – সূত্র: The Genius of Bismillah Khan (Saregama/HMV Archive) – সানাইয়ে রাগ মালকোষের বিলম্বিত আলাপের কান্না ও আধ্যাত্মিক বিষাদ ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর ফুঁৎকারে এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে।
২. ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ ও ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (Ustad Bismillah Khan & Ustad Vilayat Khan) – যুগলবন্দী (সানাই ও সেতার) – সূত্র: Duet: Shehnai & Sitar (Saregama/RPG) – শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রেকর্ড; সানাই ও সেতারের পিং-পং সংলাপে মালকোষের দ্রুত লয়ের ঝালা ও দানি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
৩. পণ্ডিত অনন্ত লাল (Pandit Anant Lal) – ঘরানা: বেনারস ঘরানা – সূত্র: Maestros of Shehnai (All India Radio Archive) – ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর সমসাময়িক এই শিল্পীর বাজানো মালকোষে বেনারস অঙ্গের শুদ্ধতা এবং রাগ বিস্তার খুব নিখুঁত ও মার্জিত।
৪. পণ্ডিত দয়ারাম (Pandit Daya Ram) – ঘরানা: বেনারস ঐতিহ্য – সূত্র: Great Masters of Wind Instruments (Classical Archive) – মালকোষের গম্ভীর চলনকে সানাইয়ের ফুঁয়ে কোনো রকম চপলতা ছাড়াই অতি ধীর গতির ধ্রুপদী বিস্তারে বাজানোর এক অনন্য রেকর্ড।
৫. পণ্ডিত শৈলেশ ভাগবত (Pandit Shailesh Bhagwat) – আধুনিক বেনারস ঐতিহ্য – সূত্র: Live in Saptak & NCPA (Sursagar Records) – বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেবের সুযোগ্য এই শিষ্যের মালকোষে গুরুর ঐতিহ্যবাহী টানের পাশাপাশি আধুনিক ত্রিতালের দ্রুত লয়ের চমৎকার কাজ শোনা যায়।
সরদ:
১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (Ustad Ali Akbar Khan) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা (Maihar Gharana) – সূত্র: The Master Musicians of India (Connoisseur Society) – সরোদের গম্ভীর আওয়াজে মালকোষের ধীর আলাপের যে আধ্যাত্মিক বিষাদ ও মায়াবী ধ্যান তৈরি হয়, তা সম্রাট আলী আকবর খাঁর সরোদে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
২. ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (Ustad Amjad Ali Khan) – ঘরানা: সোনিয়া-বংশজ ঘরানা (Seniya Bangash Gharana) – সূত্র: Golden Heritage of Sarod (Saregama/HMV Archive) – মালকোষের অতি দ্রুত লয়ের ত্রিতালের তান এবং জোড়-ঝালার অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা ও গতি ওস্তাদ আমজাদ আলীর সরোদে এক পরম শ্রবণ অভিজ্ঞতা।
৩. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত (Pandit Buddhadev Das Gupta) – ঘরানা: শাহজাহানপুর ঘরানা (Shahjahanpur Gharana) – সূত্র: The Raga Guide & Live at NCPA (Raga Records) – শাহজাহানপুর ঘরানার ঐতিহ্য মেনে কোনো রকম চপলতা ছাড়াই মালকোষের প্রথাগত গাম্ভীর্য ও ব্যাকরণের শুদ্ধতা বজায় রাখা এক অনন্য কাজ।
৪. ওস্তাদ আশীষ খাঁ (Ustad Aashish Khan) – ঘরানা: মাইহার ঘরানা (Maihar Gharana) – সূত্র: Sarod Maestro (Traditional World Music Archive) – ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর এই সুযোগ্য পুত্রের সরোদে মালকোষের ঐতিহ্যবাহী মাইহার চলনের নিখুঁত গমক ও ধ্রুপদী অঙ্গ ধরা পড়েছে।
৫. পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (Pandit Tejendra Narayan Majumdar) – ঘরানা: সেনিয়া-মাইহার ঘরানা (Seniya-Maihar Gharana) – সূত্র: Live in Concert (Saptak Archives & Saregama Classical) – ওস্তাদ বাহাদুর খাঁর সরাসরি এই শিষ্যের মালকোষের গায়াকী ও ঝালা কাজ আধুনিক সরোদ শিক্ষার জন্য এক চমৎকার প্রামাণিক দলিল।

রিলেটেড রাগ:
রাগ মালকোষের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ:
১. চন্দ্রকোষ (Chandrakauns) – মালকোষের কোমল নিখাদ (নী)-এর জায়গায় শুদ্ধ নিখাদ (নী) ব্যবহার করলেই রাগ চন্দ্রকোষের সৃষ্টি হয়।
২. কৌশিক কানাড়া (Kaushik Kanada) – মালকোষের পাঁচটি স্বরের সাথে যদি রাগ কানাড়ার অঙ্গ অর্থাৎ পঞ্চম (পা) এবং ঋষভ (রে) সামান্য বক্রভাবে যোগ করা হয়, তবে তা কৌশিক কানাড়ায় রূপ নেয়।
৩. মধুকাউন্স (Madhukauns) – মালকোষের কোমল গান্ধার (জ্ঞা)-এর জায়গায় শুদ্ধ গান্ধার (গা) এবং পঞ্চম (পা)-এর প্রয়োগ ঘটালে তা মধুকাউন্স রাগ হয়ে ওঠে।
৪. যোগকাউন্স (Jogkauns) – রাগ মালকোষ এবং রাগ যোগ-এর মিশ্রণে এই রাগটি তৈরি, যেখানে মালকোষের চলনের সাথে শুদ্ধ গান্ধার (গা) এবং কোমল নিখাদ (নী) ও শুদ্ধ নিখাদ (নী) এসে মেশে।
৫. হংসকাউন্স (Hamsakauns) – মালকোষের কোমল নিখাদ (নী)-কে বর্জন করে যদি পঞ্চম (পা) এবং শুদ্ধ নিখাদ (নী) ব্যবহার করা হয়, তবে তাকে হংসকাউন্স বলা হয়।
৬. মালগুঞ্জি (Malgunji) – রাগ মালকোষের কাঠামোতে যখন রাগ বাগেশ্রী ও রাগ রাগেস্বশ্রীর ছোঁয়া এসে লাগে, তখন এই অপূর্ব মিশ্র রাগের জন্ম হয়।
৭. নির্ঝরিণী (Nirjharini) – মালকোষের পাঁচটি স্বরের সাথে সামান্য শুদ্ধ ঋষভ (রে) ও পঞ্চম (পা) নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তৈরি করা একটি আধুনিক উপ-রাগ।
আরও দেখুন:
![রাগ মালকোষ Raga Malkauns সহজে রাগ চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট রাগ মালকোষ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 1 রাগ মালকোষ [ Raga Malkauns ] সহজে রাগ চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2023/07/রাগ-মালকোষ-Raga-Malkauns-সহজে-রাগ-চেনার-উপায়-।-শ্রোতা-সহযোগী-নোট.png)