রাগ শুদ্ধ সারং বা সারং | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যাহ্নকালীন ভূখণ্ডে প্রখর রোদ, তৃষ্ণা এবং এক অনন্য মাধুর্যের আবহ নিয়ে যে রাগগুলো শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে, তার মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল ও মহিমান্বিত রূপ হলো ‘রাগ শুদ্ধ সারং’। সারং পরিবারের অন্যান্য রূপগুলোর (যেমন বৃন্দাবনী সারং বা সামন্ত সারং) মতো এটি কাফী ঠাটের অধীনে বিভক্ত না হয়ে মূলত কল্যাণ ঠাটের আশ্রয়ে স্থান পেয়েছে। দুপুরের প্রখর রোদ্দুরে মেহফিলে যখন শুদ্ধ সারং-এর সুর ডানা মেলে, তখন তীব্র মধ্যমের উজ্জ্বলতা এবং শুদ্ধ ধৈবতের মিষ্টি অলঙ্করণ চারপাশের নিস্তব্ধতায় এক অপার্থিব স্নিগ্ধতার সঞ্চার করে।

সঙ্গীত শাস্ত্রে অঞ্চল ও ঘরানাভেদে এটি ‘শুদ্ধ সারং’ বা সংক্ষেপে কেবল ‘সারং’ নামেও বহুল পরিচিত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

সারং অঙ্গের ইতিহাস মূলত রাজস্থানের মেঠো সুর এবং ব্রজধামের ভক্তিমূলক সঙ্গীত থেকে উদ্ভূত। তবে ‘শুদ্ধ সারং’ রাগটি সারং পরিবারের সাধারণ মেঠো রূপের সীমা ছাড়িয়ে আভিজাত্যপূর্ণ এক ব্যাকরণগত মার্জিত রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই রাগে কল্যাণ অঙ্গের ‘কড়ি মধ্যম’ বা তীব্র মধ্যমের উপস্থিতি এবং দুই মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) বিশেষ সংলাপ যুক্ত হওয়ার কারণে একে কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এর প্রফাতকালীন বা মধ্যাহ্নকালীন মেজাজে শান্ত, শৃঙ্গার এবং কিছুটা বৈরাগ্য রস প্রকাশ পায়। দুপুরের খররোদ যখন চরাচরকে ক্লান্ত করে তোলে, তখন এই রাগের স্বরতরঙ্গ শ্রোতার মনকে এক প্রশান্তির নীড়ে নিয়ে যায়।

 

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কল্যাণ ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহণে পাঁচটি এবং অবরোহণে ছয়টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • বাদী স্বর: র (ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও ধৈবত (দ) বর্জিত; অবরোহণে কেবল গান্ধার (গ) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), তীব্র মধ্যম (হ্ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন) এবং ষড়্‌জ (স)। (গান্ধার প্রথানুসারে সম্পূর্ণ বর্জিত)।
  • সময়: মধ্যাহ্নকাল বা দিনের দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: প্রফুল্ল, গাম্ভীর্যপূর্ণ, চপল অথচ গভীর ও ভক্তিময়।
আরোহ: স র ম প, হ্ম প নি র্স
অবরোহ: র্স নি ধ প, হ্ম প ম র, স র নি স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম, ম প, হ্ম প ম র, স র নি স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

শুদ্ধ সারং রাগের প্রধান আকর্ষণ এবং কারিগরি জটিলতা লুকিয়ে রয়েছে এর দুই মধ্যমের নিখুঁত ব্যবহারে।

১. দুই মধ্যমের বিশেষ কাজ: আরোহণে সোজা শুদ্ধ মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়ার পর কিংবা তীব্র মধ্যমের স্পর্শ করে পঞ্চমে নামার খেলায় রাগের প্রধান রূপটি ফুটে ওঠে। অবরোহে হ্ম প ম র (তীব্র মধ্যম – পঞ্চম – শুদ্ধ মধ্যম – ঋষভ) চলনটি হলো শুদ্ধ সারং-এর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।

২. অবরোহে শুদ্ধ ধৈবতের স্থান: বৃন্দাবনী সারং-এ যেখানে ধৈবত সম্পূর্ণ বর্জিত এবং কোমল নিখাদ ব্যবহৃত হয়, শুদ্ধ সারং-এর অবরোহে সেখানে স্পষ্ট শুদ্ধ ধৈবত (র্স নি ধ প) ব্যবহার করা হয়।

৩. ঋষভ ও পঞ্চমের স্থায়িত্ব: বাদী স্বর ঋষভ হওয়ায় সুরের কাজ প্রধানত স র নি স বা ম প ম র বাক্যাংশে ঋষভের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়ায়, যা সারং অঙ্গের মিষ্টি মেঠো টানকে স্পষ্ট করে।

ধ্রুপদ, খেয়াল এবং তারযুক্ত যন্ত্র—যেমন সেতার, সারোদ ও সারেঙ্গীতে দুপুরবেলা এই রাগের বিস্তার মেহফিলে চমৎকার আবেশ তৈরি করে। ওপরের সংযুক্ত ভিডিও পরিবেশনাগুলোতে শিল্পীদের সুনিপুণ স্বরপ্রক্ষেপণে দুই মধ্যমের এই অদ্ভুত বৈচিত্র্য স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়।

 

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, মধ্যাহ্নকালের প্রখর সময়ে শুদ্ধ সারং রাগের সুর মানুষের মানসিক অবসাদ ও শারীরিক উত্তাপ কমাতে সাহায্য করে। এর দুই মধ্যমের দোলা এবং পরিষ্কার ঋষভ-পঞ্চম সংগতি মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শান্ত রাখে এবং নতুন উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনে।

 

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ বৃন্দাবনী সারং: কাফী ঠাটের জনপ্রিয় সারং রূপ; এতে কড়ি মধ্যম ও শুদ্ধ ধৈবত থাকে না, বরং দুই নিখাদ ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ মিঞাঁ কি সারং: তানসেনের প্রবর্তিত সারং রূপ; যাতে কানাড়া ও মল্লার অঙ্গের প্রভাবে কিছুটা গম্ভীর ছায়াপাত দেখা যায়।
  • রাগ শ্যাম কল্যাণ: কল্যাণ অঙ্গের একটি রাগ; এতেও দুই মধ্যমের ব্যবহার রয়েছে, তবে গান্ধারের উপস্থিতি একে শুদ্ধ সারং থেকে আলাদা করে।
  • রাগ সামন্ত সারং: এতে অবরোহে কোমল নিখাদ ও ধৈবতের কাজ থাকে, যা শুদ্ধ সারং থেকে একে পৃথক রূপ দেয়।
রাগ শুদ্ধ সারং হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই অনন্য সৃষ্টি যা শাস্ত্রীয় নিয়মকানুনের কঠোরতা বজায় রেখেও প্রকৃতির এক মিষ্টি আবেশ তৈরি করতে পারে। কোন প্রকার জটিল কোমল স্বরের ভার ছাড়াই কেবল দুই মধ্যম ও শুদ্ধ স্বরগুলোর নিখুঁত কারুকাজে এটি শ্রোতার মনে গভীর ব্যাকুলতা ছড়িয়ে দেয়। নিস্তব্ধ দুপুরে যখন সেতারের তারে কিংবা খেয়ালের টানে শুদ্ধ সারং-এর হ্ম প ম র-র রেশ ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তেই শ্রোতাকে এক শান্ত ও স্নিগ্ধ সুরলোকে নিয়ে যায়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — সারং অঙ্গ ও কল্যাণ ঠাটের রাগ বিশ্লেষণ।