রাগ সামন্ত সারং বা সামন্ত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যাহ্নকালীন সারং ভূখণ্ডে যে কটি রাগ স্বরবিন্যাসের সুবিন্যস্ত কারুকাজ এবং শাস্ত্রীয় আভিজাত্য দিয়ে সুররসিকদের মন হরণ করে, তার মধ্যে অন্যতম মননশীল ও মধুর রূপ হলো ‘রাগ সামন্ত সারং’ (বা সংক্ষেপে সামন্ত সারং)। সারং পরিবারের মূল চালিকাশক্তি ‘বৃন্দাবনী সারং’-এর চপলতার সাথে যখন অবরোহণে ধৈবতের কোমল স্পর্শ ও বিশেষ বক্র চলন যুক্ত হয়, তখন যে অপূর্ব সাঙ্গীতিক অবয়ব তৈরি হয়, তা-ই হলো সামন্ত সারং। প্রখর গ্রীষ্ণ বা উদাস দুপুরে এই রাগের ধ্বনি চারপাশের থমথমে নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ও মরমী ব্যাকুলতা ফুটিয়ে তোলে।

সঙ্গীত শাস্ত্রের বিভিন্ন ঘরানায় এটি ‘সামন্ত সারং’ কিংবা কেবল ‘সামন্ত’ নামেও পরিচিত।

ইতিহাস ও রাগের পরিচয়

‘সামন্ত’ শব্দটির ঐতিহাসিক ও শাব্দিক অর্থের মধ্যে এক প্রকার আভিজাত্য, রাজকীয়তা এবং সুরক্ষার অনুভাব লুকিয়ে আছে। প্রাচীন সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈষ্ণব পদাবলী এবং ব্রজধামের ভজন ঐতিহ্যে মধ্যাহ্নকালীন রস পরিবেশনে এই রাগের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ব্যাকরণগত বিচারে এটি কাফী ঠাটের অন্তর্গত একটি রাগ।

সাধারণ বৃন্দাবনী সারং-এর সাথে এর মূল তফাৎ হলো এর অবরোহে ধৈবত এবং কোমল নিখাদের প্রযোগ। এর মূল রস হলো শৃঙ্গার (প্রেম ও প্রতীক্ষা) এবং করুণ রস। দুপুরের খটখটে রোদ্দুরে এই রাগের সুরতরঙ্গ শ্রোতার মনে এক পরম শান্ত আবহের সঞ্চার করে।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কাফী ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ বা ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহণে পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হলেও অবরোহণে ধৈবত ও কোমল নিখাদের বক্র প্রয়োগ দেখা যায়)।
  • বাদী স্বর: র (ঋষভ)।
  • সমবাদী স্বর: প (পঞ্চম)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও ধৈবত (দ) সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ও কোমল ধৈবত (দ/দ – অবরোহে বক্রভাবে), শুদ্ধ ও কোমল নিখাদ (ন/ণ) এবং ষড়্‌জ (স)। (গান্ধার স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত)।
  • সময়: মধ্যাহ্নকাল বা দিনের দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যবর্তী সময়)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, আভিজাত্যপূর্ণ, করুণ অথচ মিষ্টি প্রফুল্লতায় ভরা।
আরোহণ: স র ম প, ন র্স
অবরোহণ: র্স ণ দ প, ম প, ণ দ প, ম র, স র নি স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, ম প ণ দ প, ম র, স র নি স

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

সামন্ত সারং রাগের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে এর অবরোহণের স্বরচলনে। সাধারণ সারং-এ যেখানে ধৈবত একেবারেই বর্জিত, সেখানে সামন্ত সারং-এ ধৈবতের উপস্থিতি রাগটিকে এক অনবদ্য মাত্রা দান করে।

১. ধৈবতের বক্র প্রয়োগ: এই রাগে অবরোহে পঞ্চমে নামার সময় ম প ণ দ প বা র্স ণ দ প (কোমল নিখাদ – ধৈবত – পঞ্চম) সংগতিটি বেশ সূক্ষ্মভাবে নেওয়া হয়। এই বিশেষ অলঙ্করণটিই সামন্ত সারং-এর প্রধান চাবিকাঠি।

২. দুই নিখাদের খেলা: আরোহণে পরিষ্কার শুদ্ধ নিখাদ ব্যবহার করে তারা সপ্তকে যাওয়া হলেও অবরোহণে কোমল নিখাদের মিষ্টি স্পর্শ রাগটিকে এক করুণ রূপ দেয়।

৩. ঋষভ ও পঞ্চমের স্থায়িত্ব: বাদী স্বর ঋষভ এবং সমবাদী পঞ্চম হওয়ায় স র নি স বা ম র বাক্যাংশে ঋষভের ওপর স্থির হওয়া এবং সারং অঙ্গের চেনা মেঠো টান তৈরি করা গায়কির অন্যতম শর্ত।

ধ্রুপদ, ধামার এবং ঐতিহ্যবাহী খেয়াল পরিবেশনায় সামন্ত সারং-এর গাম্ভীর্য চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। তারযুক্ত যন্ত্র—যেমন সেতার, সারোদ ও সারেঙ্গীতে মধ্যাহ্নকালে এই রাগের আলাপ আসরে এক মরমী ভাবলোক তৈরি করে।

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, দুপুরের অলস ও প্রখর সময়ে সামন্ত সারং রাগের ধীরগতির বিস্তার মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে দারুণ সাহায্য করে। অবরোহে ধৈবতের মিষ্টি মোচড় এবং ঋষভের স্থায়িত্ব মস্তিষ্কের উত্তেজনা প্রশমিত করে এক গভীর আত্মতৃপ্তি এনে দেয়।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ বৃন্দাবনী সারং: সারং পরিবারের মৌলিক রূপ; তবে এতে ধৈবতের ব্যবহার থাকে না, যা সামন্ত সারং-এ স্পষ্ট।
  • রাগ মিঞাঁ কি সারং: তানসেনের প্রবর্তিত সারং রূপ; সামন্ত সারং-এ ধৈবত থাকলেও এতে মিঞাঁ কি সারং-এর মতো কোমল গান্ধার বা কানাড়া অঙ্গের প্রযোগ থাকে না।
  • রাগ শুদ্ধ সারং: কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগ; এতে কড়ি বা তীব্র মধ্যমের কাজ থাকে, যা সামন্ত সারং থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
  • রাগ লঙ্কা দহন সারং: সারং পরিবারের আরেকটি বিরল রূপ, যেখানে অবরোহণে কোমল গান্ধারের সূক্ষ্ম কাজ সামন্ত সারং-এর চেয়ে আলাদা মেজাজ তৈরি করে।
রাগ সামন্ত সারং হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যের সেই প্রাঞ্জল নিদর্শন যা প্রথাগত নিয়ম মেনেই রূপের অনন্যতা প্রকাশ করতে পারে। কোনো প্রকার ভারাক্রান্ত ব্যাকরণের প্রয়োগ ছাড়াই কেবল ধৈবত ও কোমল নিখাদের সুনিপুণ ব্যবহারে এটি সারং পরিবারের মেঠো সুরকে এক রাজকীয় উচ্চতায় উন্নীত করেছে। স্তব্ধ দুপুরে যখন এই রাগের ম প ণ দ প-র মিষ্টি মোচড় বাতাসে ধ্বনিত হয়, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অপার্থিব শান্তিময় সুরলোকে নিয়ে যায়।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — সারং অঙ্গের রাগ বিশ্লেষণ।