মরমী সাধক রাধারমণ দত্ত কেবল একজন লোককবি নন, বরং তিনি বাংলা লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৮৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা এই সাধক কবি ‘রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ’ নামে পরিচিত হলেও আপামর সংগীতানুরাগীদের হৃদয়ে তিনি কেবল ‘রাধারমণ’ হিসেবেই অমর হয়ে আছেন। বাংলা লোকসংগীতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি সিলেট অঞ্চল এবং ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে ধামাইল গান ও নৃত্যের যে অনন্য ধারা প্রবর্তন করেছেন, তা আজও বাঙালির যাপিত সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের সার্থকতা নিহিত রয়েছে তাঁর মেধা এবং গভীর জীবনদর্শনের মেলবন্ধনে, যা তাঁকে সাধারণ একজন গীতিকার থেকে মরমী সাধকের উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রাধারমণ দত্তের সংগীতের মূল উপজীব্য হলো শ্রীকৃষ্ণের বিরহ-বেদনা এবং চিরন্তন প্রেমের আকুতি। না-পাওয়ার নিদারুণ কষ্ট আর আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা তাঁর গানের ছত্রে ছত্রে প্রতিফলিত হয়, যা শ্রোতাকে পার্থিব জগৎ থেকে অপার্থিব অনুভবের স্তরে নিয়ে যায়। তিনি কেবল প্রেম ও বিরহের গানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক ভজন এবং অনুরাগের সুরে মানুষের নশ্বরতা ও অন্তরাত্মার মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর রচিত কয়েক হাজার গানের মাঝে ‘ধামাইল’ গানগুলো সুর ও তালের বিশিষ্টতায় অনন্য, যা বিয়েসহ বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই মহান সাধক ১৯১৫ সালে দেহত্যাগ করলেও তাঁর সৃজিত সুর ও মরমী দর্শন আজও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
রাধারমণ দত্তের গান
১. ভ্রমর কইয়ো গিয়া
ভ্রমর কইয়ো গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া।
কইও কইওরে ভ্রমর কৃষ্ণরে বুঝাইয়া,
মুই রাধা মৈরা যামু কৃষ্ণের লাগিয়া ॥
আগে যদি জানতামরে ভ্রমর যাইবা ছাড়িয়া,
মাথার কেশ দুইভাগ করি বাঁধিতাম কষিয়া ॥
রাধারমণ বলে গো ভ্রমর শোনো মন দিয়া,
বিচ্ছেদে পুড়িছে তনু আছো কি চাহিয়া ॥
২. শ্যালো পিরিতি বিষম জ্বালা
শ্যালো পিরিতি বিষম জ্বালা,
ওরে বন্ধু বিনে কারে জানাই গো অবলার কথা ॥
বন্ধুর লাগি পাগলিনী কুলমান দিয়া জলা,
এখন আমার জীবন কান্দে পাইয়া পিরিত হলা ॥
রাধারমণ বলে গো সখী সয় না মনের ব্যথা,
বন্ধু ছাড়া এ জগতে কে কহিবে কথা ॥
৩. করি কার কুঞ্জে গেলায় রে বন্ধু (ধামাইল)
করি কার কুঞ্জে গেলায় রে বন্ধু আমারে ছাড়িয়া।
আমারে দিলায় বন্ধু বিচ্ছেদ অনল জ্বালিয়া ॥
সারা নিশি পথ চেয়ে কান্দি বিনোদিনী,
এখন তোমার দেখা নাই ওগো গুণমণি ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু তুমি সে নিষ্ঠুর,
আমারে একেলা করি গেলায় কত দূর ॥
৪. কুঞ্জ সাজাও গো (ধামাইল)
কুঞ্জ সাজাও গো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।
আতর গোলাপ ছিটাইয়া দাও কুঞ্জেরই মাঝারে ॥
সখি গো পরাইয়া দাও মনে মনে সুন্দর মালা,
নিশি ভোরে আসবে বুঝি শ্যালো ননীচোরা কালা ॥
রাধারমণ বলে গো সখী করি করি আশা,
পূর্ণ হইবে আজ কি আমার মনেরই লালসা ॥
৫. কেন আইলাম ভবে রে
কেন আইলাম ভবে রে মন কিছুই পাইলাম না।
মিছে কাজে সময় গেল ভজলাম না উপাসনা ॥
বাড়ি গাড়ি জমিদারি সবই মায়ার খেলা,
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ তামাশার মেলা ॥
রাধারমণ বলে গো মন গুরুর চরণ ধরো,
যাবার বেলায় সঙ্গী হবে যা পুণ্য সঞ্চয় করো ॥
৬. আমার বন্ধু দয়াময়
আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিলে আমার ঘুচে মনের ভয়।
তিলক চন্দন পরি পাটে সখা লয়ে সাথে,
রাখাল বেশে ধেনু লয়ে যাও গো তুমি পথে ॥
রূপ হেরিলে আঁখি আমার স্থির নাহি রয়,
রাধারমণ বলে বন্ধু তুমি সে দয়াময় ॥
৭. আমারে ছাড়িয়া বন্ধু (বিরহ)
আমারে ছাড়িয়া বন্ধু গেলায় মথুরা।
তোর বিরহে পুইড়া হইলাম আঙ্গার আর খরা ॥
সখী গো যারে দিলে প্রাণ মন তার দেখা না পাই।
বন্ধুর পিরিতে আমি জ্যান্ত মরা হয়ে যাই ॥
রাধারমণ বলে গো সখী পিরিত বড় দায়,
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৮. জল ভর সুন্দরী কন্যা (বিখ্যাত লোকসুর)
জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিলা পাড়ি।
হাতে নিয়া কাঙ্কের কলসি চলো আপন বাড়ি ॥
তোমার কলসি গড়া কন্যা সোনা দিয়া মোড়া,
তোমার রূপ দেখিয়া বন্ধু হইলো পাগল পারা ॥
রাধারমণ বলে গো কন্যা শোনো মন দিয়া,
রূপের ডালি লইয়া তুমি চলো পথ দিয়া ॥
৯. কালিয়া বন্ধুয়া রে (প্রেম)
কালিয়া বন্ধুয়া রে কেন করলা ছিনিমিনি।
তোর লাগিয়া সারা নিশি জাগে বিনোদিনী ॥
কুঞ্জবনে বাঁশির সুরে ডাকো বারে বার,
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু করো গো করুণা,
তব চরণে ঠাঁই দিও এই তো প্রার্থনা ॥
১০. দেহ তরী চললো বাওয়া (দেহতত্ত্ব)
দেহ তরী চললো বাওয়া ভব নদীর কূলে।
মাঝি আমার মন পাখিটা গেছে সব ভুলে ॥
ছয় জনায় টেনে নেয় ছয় দিকে রে তরী,
কেমনে পৌঁছাব আমি গুরুর নাম ধরি ॥
রাধারমণ বলে রে মন সময় বয়ে যায়,
গুরুর দয়া ছাড়া পারের নাহি কোনো উপায় ॥
১১. অমিয় সাগরে সিনান করিতে
অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলই গরল ভেল।
চাঁদের কিরণ সুশীতল বলিয়া হৃদয়ে দহন দিল ॥
কিবা সে পিরিত সখি কিবা সে পিরিত।
বন্ধুর পিরিতে আমার গেল যে জাতি-চরিত ॥
রাধারমণ বলে গো সখী সয় না মনের ব্যথা।
পিরিত করিয়া জীবনে বাড়াইলাম ব্যাকুলতা ॥
১২. শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে
শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে, নিরলে তোমারে পাইলে।
মনের কথা কইতাম আমি তোমার চরণে বইলে ॥
আগে যদি জানতাম রে বন্ধু যাইবা রে ছাড়িয়া।
পাগলিনী হইতাম না তোর পিরিত করিয়া ॥
রাধারমণ বলে গো বন্ধু পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
১৩. ওরে বন্ধু দয়াময় (ধামাইল)
ওরে বন্ধু দয়াময়, তোমার লাগি পাগলিনী কুলমান গেল হায়।
যমুনারই ঘাটে বসি পথ যে পানে চাই।
তিলক চন্দন পরা শশী দেখা যদি পাই ॥
রাধারমণ বলে সখী সয় না বিরহ জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
১৪. মন রে তুই চিনিস না আপনার পর
মন রে তুই চিনিস না আপনার পর ভবের বাজারে।
মায়ার জালে বন্দি হইয়া থাকিস অন্ধকারে ॥
মিছে কাজে সময় গেল দিন তো ফুরাইয়া আসে।
আসল কাজ তো বাকি রইল পইড়া মায়ার পাশে ॥
রাধারমণ বলে রে মন গুরুর নাম ধরো।
যাবার বেলায় সঙ্গী হবে যা পুণ্য সঞ্চয় করো ॥
১৫. সই গো পিরিত বড়ই বিষম দায়
সই গো পিরিত বড়ই বিষম দায়।
একবার যে মজল পিরিতে তার রক্ষা পাওয়া দায় ॥
কুল-মান আর জাতি-ধর্ম সব ভাসাইলাম জলে।
তব পিরিতের হলা জ্বলে আমার এই তনু মূলে ॥
রাধারমণ বলে গো সখী বন্ধুর কি দোষ।
আপনার করমে আমি পাইছি এই রূপ রোষ ॥
১৬. জল ভরা সুন্দরী কন্যা (২য় সংস্করণ/ধামাইল)
জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিলা পাড়ি।
হাতে নিয়া কাঙ্কের কলসি চলো আপন বাড়ি ॥
তোমার কলসি গড়া কন্যা সোনা দিয়া মোড়া।
তোমার রূপ দেখিয়া বন্ধু হইলো পাগল পারা ॥
রাধারমণ বলে গো কন্যা শোনো মন দিয়া।
রূপের ডালি লইয়া তুমি চলো পথ দিয়া ॥
১৭. কুন কুঞ্জে গেলায় রে বন্ধু (বিরহ)
কুন কুঞ্জে গেলায় রে বন্ধু আমারে ছাড়িয়া।
আমারে দিলায় বন্ধু বিচ্ছেদ অনল জ্বালিয়া ॥
সারা নিশি পথ চেয়ে কান্দি বিনোদিনী।
এখন তোমার দেখা নাই ওগো গুণমণি ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু তুমি সে নিষ্ঠুর।
আমারে একেলা করি গেলায় কত দূর ॥
১৮. কুঞ্জ সাজাও গো আজ (২য় ভাব)
কুঞ্জ সাজাও গো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।
আতর গোলাপ ছিটাইয়া দাও কুঞ্জেরই মাঝারে ॥
সখি গো পরাইয়া দাও মনে মনে সুন্দর মালা।
নিশি ভোরে আসবে বুঝি শ্যালো ননীচোরা কালা ॥
রাধারমণ বলে গো সখী করি করি আশা।
পূর্ণ হইবে আজ কি আমার মনেরই লালসা ॥
১৯. কেন আইলাম ভবে রে (মরমী ভাব)
কেন আইলাম ভবে রে মন কিছুই পাইলাম না।
মিছে কাজে সময় গেল ভজলাম না উপাসনা ॥
বাড়ি গাড়ি জমিদারি সবই মায়ার খেলা।
সাঙ্গ হবে জীবনের এই রঙ তামাশার মেলা ॥
রাধারমণ বলে গো মন গুরুর চরণ ধরো।
যাবার বেলায় সঙ্গী হবে যা পুণ্য সঞ্চয় করো ॥
২০. তনু মন করিয়া পাগল (প্রেম)
তনু মন করিয়া পাগল বন্ধু কোন দেশে গেলা।
তোর লাগিয়া আমার পরাণ হইলো রে একেলা ॥
কালিয়া বন্ধুয়া রে কেন করলা ছিনিমিনি।
তোর লাগিয়া সারা নিশি জাগে বিনোদিনী ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু করো গো করুণা।
তব চরণে ঠাঁই দিও এই তো প্রার্থনা ॥
২১. মনের দুঃখ কারে কই গো সখী
মনের দুঃখ কারে কই গো সখী বন্ধু হইলো পর।
এখন আমার শূন্য হইলো প্রাণেরই এই ঘর ॥
পিরিত করা বড় জ্বালা আমি না জানি।
বন্ধুর লাগি নয়ন জলে ভাসাইলাম তরণী ॥
রাধারমণ বলে গো সখী সয় না মনের ব্যথা।
বন্ধু ছাড়া এ জগতে কে কহিবে কথা ॥
২২. বাঁশি বাজায় কোন জনায়
বাঁশি বাজায় কোন জনায় কদম তলার ডালে।
বাঁশির সুরে মন ভোলায় সখী উজান ঢলে ॥
ঘরে রইতে দিলে না রে বন্ধুয়ার বাঁশি।
কুল-মান যা ছিল আমার সব হলো রে বাসি ॥
রাধারমণ বলে সখী কী হবে উপায়।
বাঁশির টানে প্রাণ আমার থাকতে নাহি চায় ॥
২৩. ওরে আমার মন-পাখি (দেহতত্ত্ব)
ওরে আমার মন-পাখি কেন করিস খাঁচার মায়া।
একদিন তো ছেড়ে যাবি তোর এই মাটির কায়া ॥
আসল ঘর তো চিনলি না রে মিছে মায়ায় পইড়া।
যাবার সময় যাবে সবই মায়ার বাঁধন ছিঁড়া ॥
রাধারমণ বলে রে মন সময় থাকতে জাগো।
দয়াল গুরুর চরণে মোর মুক্তি পথ মাগো ॥
২৪. আমি যার লাগি হইলাম বনবাসী (বিরহ)
আমি যার লাগি হইলাম বনবাসী দেখা দেয় না সে।
পিরিত করিয়া এখন মরি হাহুতাশে ॥
নিশিদিনে পথ চেয়ে রয় বিনোদিনী রাধা।
এখন কেন বন্ধু তুমি দাও পিরিতে বাধা ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু করো গো করুণা।
তব পিরিত বিনে প্রাণে শান্তি তো মিলে না ॥
২৫. জল ভর সুন্দরী কন্যা (৩য় সংস্করণ – ধামাইল)
জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিলা পাড়ি।
হাতে নিয়া কাঙ্কের কলসি চলো আপন বাড়ি ॥
মাটির কলসি কঙ্কে করি কন্যা যায় গো ধীরে ধীরে।
রূপের ডালি দেইখা কন্যা মন কাড়িলা মোরে ॥
রাধারমণ বলে কন্যা পিরিত করো আমার সাথে।
বসে থাকবো দুজন মিলে কালনী নদীর তটে ॥
২৬. শ্যাম কালিয়া বন্ধু আমার (প্রেম)
শ্যাম কালিয়া বন্ধু আমার কেন গেলা ছাড়ি।
তোর পিরিতে জ্বলে মরি হইয়া বিবাগি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
বন্ধুর পিরিতে কেন হইলো এতো ভুল ॥
রাধারমণ বলে বন্ধু দেখা দাও আমারে।
শান্তি যেন পায় রে এই প্রাণ তোমার দিদারে ॥
২৭. কেন আইলাম ভবের মেলায় (আক্ষেপ)
কেন আইলাম ভবের মেলায় কি কাজ করিলাম।
আসল কাজ তো ফেলে রেখে মিছে রঙ্গে মজিলাম ॥
যারে ভাবি আপন মানুষ কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ওই ঘরেতে ॥
রাধারমণ বলে রে মন গুরুর চরণ ধরো।
তবেই হবে ভব পার শান্তি লাভ করো ॥
২৮. কুঞ্জ সাজাও গো (৩য় ভাব – ধামাইল)
কুঞ্জ সাজাও গো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।
আতর গোলাপ ছিটাইয়া দাও কুঞ্জেরই মাঝারে ॥
সখি গো পরাইয়া দাও মনে মনে সুন্দর মালা।
নিশি ভোরে আসবে বুঝি শ্যালো ননীচোরা কালা ॥
রাধারমণ বলে গো সখী করি করি আশা।
পূর্ণ হইবে আজ কি আমার মনেরই লালসা ॥
২৯. মরণ কথা মনে রেখো (তত্ত্ব)
মরণ কথা মনে রেখো ওরে আমার মন।
কেউ যাবে না সাথে তোমার সাঙ্গ হলে জীবন ॥
ধন-দৌলত বাড়ি-গাড়ি সবই রবে পড়ে।
গুরুর নামই সম্বল হবে অন্ধকার ওই ঘরে ॥
রাধারমণ বলে রে মন মিছে করো আশা।
গুরুর চরণ বিনে নাই রে পরম বাসা ॥
৩০. আমার বন্ধু দয়াময় (বিখ্যাত মরমী গান)
আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিলে আমার ঘুচে মনের ভয়।
তিলক চন্দন পরি পাটে সখা লয়ে সাথে,
রাখাল বেশে ধেনু লয়ে যাও গো তুমি পথে ॥
রূপ হেরিলে আঁখি আমার স্থির নাহি রয়,
ভাইবে রাধারমণ বলে বন্ধু দয়াময় ॥
৩১. বাঁশি কেন বাজে রে (ধামাইল)
বাঁশি কেন বাজে রে সই যমুনার কূলে।
গৃহকর্ম তেয়াগিয়া মন কেন মোর দোলে ॥
কালো শশী বাঁশি বাজায় কদম তলার ডালে।
কুল-মান সব হারাইলাম ঐ বাঁশিরই ছলে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনো গো ললিতা।
বন্ধুর বাঁশি কহে আমার মরমের কথা ॥
৩২. প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বাঁশি
প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্বতলে বাঁশি।
বাঁশি শুনে ঘরে থাকতে পারলাম না রে সই ॥
মন নিল হরিয়া আমার ঐ না কালা চাঁদে।
ভাইবে রাধারমণ বলে মন কেন মোর কান্দে ॥
৩৩. ওরে আমার প্রাণ সজনী (ধামাইল)
ওরে আমার প্রাণ সজনী কুঞ্জ সাজাও গিয়া।
আসবেন রে প্রাণ কানাইয়া সাজাও মন দিয়া ॥
আতর গোলাপ ছড়াও সখী কুঞ্জেরি মাঝারে।
শুভাগমন হবে বন্ধু নিশি আধাঁরে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে আশার পথ চাইয়া।
কত নিশি গেল আমার পথ যে নেহারিয়া ॥
৩৪. পিরিত বিষের হলা (মরমী)
পিরিত বিষের হলা রে বন্ধু পিরিত বিষের হলা।
পিরিত করিয়া দয়াল হারাইলাম কুলা ॥
আগে যদি জানতাম বন্ধু যাইবায় রে ছাড়িয়া।
পাগলিনী হইতাম না তোর পিরিত করিয়া ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৩৫. আমার বন্ধু কালাচাঁদ (প্রেম)
আমার বন্ধু কালাচাঁদ যমুনারই কূলে।
তিলক চন্দন পরা শশী কদম্বেরই ডালে ॥
বাঁশির সুরে মন মাতাল পাগলিনী হইলাম।
জাতি-ধর্ম কুল-মান সব হারাইলাম ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে বিরহী রাধিকা।
বন্ধু বিনা এ জগতে আমি রে একা ॥
৩৬. কে বলে পিরিত ভালা (ধামাইল)
কে বলে পিরিত ভালা রে সই কে বলে পিরিত ভালা।
পিরিত করিয়া রাধা হইল রে একেলা ॥
সোনা বন্ধু মথুরাতে দিলা মোরে ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে সখী পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৩৭. ওরে মন ভোমরা (দেহতত্ত্ব)
ওরে মন ভোমরা কেন করলি ভুল।
মায়ার জালে বন্দি হইয়া হারাইলি সব কূল ॥
দিন গেলে তো আসবে রাতি ভেবে দেখ রে মনে।
একলা তুমি যাইবা রে ভাই গহিন সেই বনে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে গুরুর চরণ ধরো।
মিছে মায়ার এই জগত থেকে উদ্ধার করো ॥
৩৮. আজ কেন আমার কুঞ্জে (বিরহ)
আজ কেন আমার কুঞ্জে বন্ধু আইলো না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হলো রে চুনো ॥
যমুনার তীরে বসে ডাকি বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত পরম ধন।
চিনতে পারলে মিলে যাবে সেই তো মহাজন ॥
৩৯. জল ভর সুন্দরী কন্যা (জনপ্রিয় ধামাইল)
জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিলা পাড়ি।
হাতে নিয়া কাঙ্কের কলসি চলো আপন বাড়ি ॥
মাটির কলসি কঙ্কে করি কন্যা যায় গো ধীরে ধীরে।
রূপের ডালি দেইখা কন্যা মন কাড়িলা মোরে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত করো আমার সাথে।
বসে থাকবো দুইজন মিলে যমুনারই তটে ॥
৪০. ওরে ও নিঠুর বন্ধু (আক্ষেপ)
ওরে ও নিঠুর বন্ধু কেন দিলা ফাঁকি।
তোর বিরহে দিন-রজনী কেবল আমি কাঁদি ॥
বসন্ত আসিলে বনে ফোটে কত ফুল।
তুমি বিনে আমার জীবনে হয় গো বড়ই ভুল ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪১. শ্যাম পিরিতি আমার হাড় কালা করিল
শ্যাম পিরিতি আমার হাড় কালা করিল।
হৃদয়ে বিচ্ছেদ অনল দ্বিগুণ জ্বলিল ॥
কে জানে পিরিতের জ্বালা দাহে যার অঙ্গ।
বিচ্ছেদ তুষের অনলে পুড়ে দেহ সঙ্গ ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত যদি করো।
তবে কেন নিষ্ঠুর হইয়া দূরে দূরে থাকো ॥
৪২. কালিয়া বন্ধুয়া রে (ধামাইল)
কালিয়া বন্ধুয়া রে কেন করলা ছিনিমিনি।
তোর লাগিয়া সারা নিশি জাগে বিনোদিনী ॥
কুঞ্জবনে বাঁশির সুরে ডাকো বারে বার।
দেখা দিলে ঘুচে যেত সকল অন্ধকার ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় দায়।
তব পিরিত বিনে প্রাণে শান্তি তো মিলে না ॥
৪৩. আমি যাই গো যাই গো সখী (বিদায় গীতি)
আমি যাই গো যাই গো সখী বিদায়ে দে মোরে।
শ্যাম পিরিতে পাগল হইয়া ছাড়লাম নিজ ঘরে ॥
কুলমান সব ভাসাইলাম যমুনারই জলে।
এখন কেন বন্ধু মোরে রাখলা না তলে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় বিষ।
পিরিত করিয়া রাধা হইল রে নিশি ॥
৪৪. ওরে আমার প্রাণ সজনী (মিলন)
ওরে আমার প্রাণ সজনী ধনি সাজাও গিয়া।
আসবেন রে প্রাণ কানাইয়া সাজাও মন দিয়া ॥
মল্লিকা মালতী মাল্য গাঁথো রে যতনে।
তব রূপের ডালি সাজাও বন্ধুর আগমনে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পূর্ণ আশা মোর।
বন্ধু আইলে কুঞ্জ মাঝে কাটবে অন্ধকার ॥
৪৫. মন রে তোর মরণ কথা (তত্ত্ব)
মন রে তোর মরণ কথা মনে কেন নাই।
যাবার বেলায় সাথি হবে গুরুর নামই ভাই ॥
মাটির ঘর আর মাটির বাড়ি রবে পড়ে সব।
সাঙ্গ হলে ভব মেলা থামবে কলরব ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে গুরুর নাম লও।
তবেই তুমি মুক্তি পথের সঠিক দিশা পাও ॥
৪৬. কদম তলায় দেইখা আইলাম (ধামাইল)
কদম তলায় দেইখা আইলাম শ্যাম চিকণ কালা।
গলে দোলে বনমালা পরি কষার মালা ॥
হাসিয়া হাসিয়া বন্ধু চায় আমার পানে।
কি জাদু করিল বাঁশি পশিল এই কানে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় দায়।
পাগলিনী করিল মোরে কালাচাঁদের গায় ॥
৪৭. শ্যাম তুমি নিষ্ঠুর হইলে (বিরহ)
শ্যাম তুমি নিষ্ঠুর হইলে দেখা কেন দাও না।
বিচ্ছেদ অনলে অঙ্গ হইয়া গেল চুনো ॥
মথুরাতে গেলে বন্ধু আমাদেরে ছাড়ি।
আমারে দিলায় বন্ধু পিরিতের হাড়ি ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনো প্রাণ সই।
বন্ধু ছাড়া এ জগতে আমি কেমনে রই ॥
৪৮. পিরিত করিয়া আমি (আক্ষেপ)
পিরিত করিয়া আমি হারাইলাম কুল।
মাথায় ছিল লম্বা কেশ করিলাম রে ভুল ॥
ছিঁড়লাম কেশ কাটিলাম বেশ বন্ধুর লাগিয়া।
এখন বন্ধু কেন থাকে মোরে পাশরিয়া ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় দায়।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে আমায় ॥
৪৯. সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী
সখী গো বন্ধু আমার অভিমানী দেখা দেয় না আর।
নিশিদিন কান্দি আমি হইয়া একাকার ॥
কি অপরাধ করিলাম আমি বন্ধুয়ারই কাছে।
এত ডাকি তবু কেন দূরে দূরে আছে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত বড় জ্বালা।
যারে বাসি ভালো সেই তো দিল হাড়ের মালা ॥
৫০. জল ভর সুন্দরী কন্যা (৪র্থ সংস্করণ – ধামাইল)
জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিলা পাড়ি।
হাতে নিয়া কাঙ্কের কলসি চলো আপন বাড়ি ॥
তোমার কলসি গড়া কন্যা সোনা দিয়া মোড়া।
তোমার রূপ দেখিয়া বন্ধু হইলো পাগল পারা ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত করো আমার সাথে।
বসে থাকবো দুজন মিলে যমুনারই তটে ॥
৫১. আমি কি হেরিলাম কদম্বতলে
আমি কি হেরিলাম কদম্বতলে সজনী।
ভুবন মোহন রূপ হাসিয়া হাসিয়া রে ॥
গলে দোলে বনমালা হাতে মোহন বাঁশি।
রূপ দেখিয়া হইলো রে মন বাড়ির বাহির বাসী ॥
চন্দনে চর্চিত অঙ্গ পীত বসন সাজে।
কি মধুর রব বাঁশি কুঞ্জবনে বাজে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে ধনি গো ললিতা।
বন্ধুর রূপ দেখিয়া মোর গেল কুল আর বনিতা ॥
৫২. আমার প্রাণবন্ধু আসিব রে
আমার প্রাণবন্ধু আসিব রে ধনি কুঞ্জ সাজাও গিয়া।
মল্লিকা মালতী মাল্য গাঁথো রে যতনে দিয়া ॥
অগুরু চন্দন ছিটাও সখী কুঞ্জেরই মাঝারে।
আজ বুঝি দেখা পাবো প্রাণ বন্ধুয়ারে ॥
বিছাও গো সুন্দর পাটি যতনে করিয়া।
আইলে যেন সুখ পায় বন্ধু মোর কুঞ্জেতে বসিয়া ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে আশার পথ চাইয়া।
কত নিশি পোহাইলাম আমি বিরহী হইয়া ॥
৫৩. কালাচাঁদ তোমার পিরিতে পাগল
কালাচাঁদ তোমার পিরিতে পাগল পাগল করিলি মোরে।
ঘরে রইতে পারলাম না রে তোমার বাঁশির সুরে ॥
বাঁশির স্বরে মন উদাস পাড়ায় থাকতে নারি।
কুলের বাহির করলি মোরে তুই সে প্রাণ হরি ॥
জাতি গেল কুল গেল রে আর কি আছে বাকি।
এখন কেন দেখা দিয়া মারো প্রেমের ফাঁকি ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনো গো বিনোদিনী।
বন্ধুর প্রেমে পাগল হইলাম আমি অভাগিনী ॥
৫৪. সই গো কেমনে যমুনায় যাই (ধামাইল)
সই গো কেমনে যমুনায় যাই বন্ধু কদম তলায়।
বাঁশি বাজাইয়া কালা মন নিতে চায় ॥
জল ভরিবার ছলে আমি যাই যমুনার ঘাটে।
বাঁশির সুরে প্রাণ বন্ধুরে দেখি রাজপথে ॥
নয়নের পলক পরে না রে বন্ধুয়ারে দেখলে।
কি মায়া করিল কালা ওই কদম তলে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে বিরহী রাধিকা।
বন্ধুর প্রেমে মাতোয়ারা আমি যে একালিকা ॥
৫৫. দিন গেল দিন গেল রে (দেহতত্ত্ব)
দিন গেল দিন গেল রে মিছে কাজে দিন গেল।
আসল কাজ তো হইল না রে ভজন বাকি রইল ॥
অনিত্য মিছারি কাজ লয়ে দিন কাটাইলাম।
যাবার বেলা দেখি আমি শিয়রে শমন ॥
ধন জন পরিবার কেউ যাবে না সাথে।
একলা তুমি রইবে পড়ে অন্ধকার ঘরেতে ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে গুরুর নাম সার।
নাম বিনা গতি নাই রে জানিলাম এবার ॥
৫৬. তোমার পিরিতে বন্ধু আমার দশা হলো এই
তোমার পিরিতে বন্ধু আমার দশা হলো এই।
পাগলিনী হইয়া আমি পথে পথে ধাই ॥
কি অপরাধ করিলাম বন্ধু তোমারই চরণে।
একবার দেখা দিয়া বন্ধু বাঁচাও রে প্রাণে ॥
মথুরাতে গেলে বন্ধু আমায় করিয়া একলা।
তোমার বিরহে অঙ্গ হইলো রে আমার হলা ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে পিরিত পরম বিষ।
পিরিত করিয়া রাধা হারাইলো দিশ ॥