শাস্ত্রীয় সংগীত কেন শুনব? এই প্রশ্নটি হয়তো আপনার মাথায়ও এসেছে, যেমনটি আমার এসেছিল। সময়ের সাথে সাথে এ বিষয়ে যা অনুভব করেছি, সেটাই শেয়ার করছি। এই উত্তর পেতে ধৈর্য ধরে এই লেখাটি পড়তে হবে। এটুকু ধৈর্য যদি না থাকে, তবে শাস্ত্রীয় সংগীতের যাত্রা এখানেই বন্ধ করা ভালো। যদি সেই ঝুঁকি নিতে চান, তবে চলুন আগানো যাক।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কেন শুনবো?
জন্মগতভাবে আমরা কিছু অনুভবের ক্ষমতা নিয়ে আসি; অর্থাৎ শরীর দিয়ে যা বোধ করা যায়। যেমন: আহার, নিদ্রা, যৌনতা, ব্যথা, গরম-ঠাণ্ডার অনুভব ইত্যাদি। এগুলোর অনুভব বা আকাঙ্ক্ষা কমবেশি সব মানুষেরই সমান। শিক্ষা বা অভিজ্ঞতাভেদে এখানে খুব একটা পার্থক্য হয় না। পাশাপাশি আমরা কিছু মৌলিক অনুভূতি নিয়েও জন্মাই—যেমন আনন্দ, উত্তেজনা, ভালোবাসা ও স্নেহ। তবে সেগুলোর বিকাশ ও প্রকাশ অনেকটা বড় হয়ে ওঠার পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
জন্মগত অনুভব-অনুভূতি অত্যন্ত সীমিত এবং আদিম। সেগুলো পূরণ করার পদ্ধতিও আদিম। সেগুলোর অভাব বোঝার জন্য বা অভাব পূরণের জন্য কোনো বিশেষ যোগ্যতা, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। যা দরকার, তার প্রায় সবটুকু প্রকৃতি আমাদের জন্মসূত্রেই দিয়েছে।
কিন্তু জন্মগত অনুভব-অনুভূতি ছাড়াও শত-সহস্র রকমের অনুভব ও অনুভূতি আছে। এই দীর্ঘ মানবসভ্যতা তার বিবর্তন, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেসব নতুন নতুন অনুভব বা অনুভূতির আবিষ্কার করেছে। সেটার বোধ মানুষের তখনই হয়, যখন তার দেহ-মন তা বোঝার জন্য তৈরি হয়। মানুষের আবিষ্কৃত এই বোধগুলো অনুভব করতে যেমন শিক্ষার প্রয়োজন, অভাব মেটাতেও তেমনই বিশেষ শিক্ষা, দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। শিল্প, কলা বা নান্দনিকতার অনুভূতিগুলো ঠিক তেমনই।

পৃথিবীর যে মানুষগুলো একটু মাথা খাটিয়েছেন (অথবা অলস মস্তিষ্ক বলে গালও দিতে পারেন), তাঁরা শুধুমাত্র আদি অনুভব মিটিয়ে নিজেকে সুখী বা পূর্ণ ভাবতে পারেননি। তাঁরা বাড়তি ক্ষুধা মেটাতে আদি আকাঙ্ক্ষাগুলোরও রূপ বদলে দিয়েছেন। ‘নেটিভ ফুড’-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সন্ধান করেছেন; গড়ে তুলেছেন বিশিষ্ট সব রন্ধনপ্রণালী। গতানুগতিক যৌনতাকে ছাড়িয়ে গিয়ে তৈরি করেছেন কামশাস্ত্র। এমন সব সৃষ্টিশীল মানুষেরই আবিষ্কার আজকের ক্রীড়া, শিল্প, সাহিত্য ও সংগীত।

চলুন একটা উদাহরণ নিয়ে আলাপ করি:
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ৭৬ এ আঁকা “Struggle” নামের পেইন্টিংটি এমনিতে দেখতে আমার আপনার সবারই ভাল লাগে। এটুকু ভালো লাগার জন্য আপনার আঁকা তৈল চিত্রের মর্ম, বা জয়নুল আবেদিনের ক্রাফটম্যানশিপের উচ্চতা বেঝার দরকার নেই। কিন্তু এরচেয়ে বেশি ভালো যদি লাগাতে চান তবে আপনাকে আরও ভিতরে ঢুকতে হবে। জানতে হবে – এ ছবির পটভূমি, ইতিহাস, ক্রাফটম্যানশিপের বিস্তারিত। সেগুলো করার পরে ছবিটি আপনার কাছে বদলে যাবে। ছবিতে আপনি অনেক কিছু দেখবেন যা আগে দেখননি।
দেখবেন – দীর্ঘ শোষণ এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বাঙালির টিকে থাকার লড়াই, কাদা বা জঞ্জালের রুপকে জীবনের বাধা, আর ষাঁড়টির সংগ্রামের মাধ্যমে সেই বাধা অতিক্রম করার অদম্য জেদ।
একটু যদি অ্যানাটমি বোঝেন, তাহলে দেখবেন—ছবির ভেতরে শিল্পী কিছু ‘ডাইনামিক লাইন’ দিয়ে এক তীব্র ‘টেনশন’ বা টানটান উত্তেজনা তৈরি করেছেন। সেখানে চলছে পেশির সংকোচন আর প্রসারণের এক চরম খেলা (Extreme Contraction)। ষাঁড়টির চামড়ার ওপর দিয়ে পাঁজরের হাড়গুলো (Ribs) যেভাবে ঠেলে বের হয়ে আসছে, তা দেখে আপনি স্পষ্ট বুঝতে পারবেন—যন্ত্রণার চূড়ান্ত মুহূর্তে পশুটি বুক ফেটে যাওয়া শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই যে পেশির আড়ষ্টতা, এটাই তো সংগ্রামের আসল চেহারা।
আরও খেয়াল করে দেখবেন, ষাঁড়টির মেরুদণ্ড কিন্তু সোজা নয়, বরং একটি নিখুঁত ধনুকের (Arc) মতো বাঁকানো। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এই ধনুকাকৃতি গঠনই সবচেয়ে বেশি চাপ বা ‘স্ট্রেস’ নিতে পারে। শিল্পী জয়নুল এখানে অ্যানাটমিকে যেন মেকানিক্স বা বলবিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। ষাঁড়টির সামনের পা দুটি যেভাবে মাটিতে দেবে গেছে আর পেছনের পা দুটি যেভাবে প্রসারিত, তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়—এর শরীরের ভারকেন্দ্র (Center of Gravity) মাটির একেবারে কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছে। আর মুখটি মাটির দিকে ঝুঁকে থাকা মানে হলো—সে তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিচ থেকে ওপরের দিকে চাকার মূলে সঞ্চালিত করছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো শিল্পীর সেই জাদুকরী স্বাধীনতা। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন—শিল্পী এখানে ষাঁড়ের ঘাড় এবং পেছনের অংশের অনুপাত কিছুটা বদলে দিয়েছেন, যাতে এই লড়াইয়ের ভয়াবহতা বা বিশালত্ব (Magnanimity) ফুটে ওঠে। বাস্তবে সাধারণ একটা ষাঁড় হয়তো শরীরকে এতটা বাঁকাতে পারে না, কিন্তু জয়নুল তাঁর ‘সংগ্রাম’ চিত্রে সেই অতিমানবীয় শক্তি বোঝাতে অ্যানাটমিকে কিছুটা প্রসারিত করেছেন। শিল্পের ভাষায় একেই বলে ‘এস্থেটিক ডিস্টোরশন’—যেখানে সত্যকে সাধারণের চেয়ে আরও বড় করে দেখানোর জন্য বাস্তবের ব্যাকরণকে কিছুটা ছাড়িয়ে যেতে হয়।
একটু যদি আর্টের ক্রাফটম্যানশিপ বা নির্মাণকৌশল বোঝেন, তাহলে দেখবেন—জয়নুল এখানে তুলির আঁচড়ে কোনো মোলায়েম ভাব রাখেননি। পুরো ছবিতে তিনি ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত রুক্ষ এবং বলিষ্ঠ ব্রাশ স্ট্রোক। এই রুক্ষতা আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; কারণ আপনি যখন একটা জানপ্রাণ লড়াইয়ের ছবি আঁকছেন, তখন সেখানে মসৃণ রঙের প্রলেপ মানায় না। তুলির প্রতিটি রুক্ষ আঁচড় এখানে কাদার ঘর্ষণ আর গায়ের ঘামকে জীবন্ত করে তুলেছে।
ছবির নেগেটিভ স্পেস বা ফাঁকা জায়গার ব্যবহারটা খেয়াল করুন। শিল্পী ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব বেশি ডিটেইল বা হিজিবিজি রাখেননি, বরং চারপাশটা বেশ সাধারণ রেখেছেন। এর ফলে আপনার চোখ অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ পায় না; আপনি সরাসরি গিয়ে পড়েন সেই ষাঁড় আর চাকাটার ওপর। এই পরিমিতিবোধই ছবিটিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।
রঙের ক্ষেত্রেও দেখবেন এক অদ্ভুত সংযম বা পরিমিতিবোধ। শিল্পী এখানে লাল-নীল বা উজ্জ্বল রঙের মেলা বসাননি। পুরো ছবিতে রাজত্ব করছে মাটির রঙ বা ‘আর্থি টোন’—গাঢ় বাদামি, ধূসর আর কালচে আভা। এই রঙের ব্যবহার আপনাকে সরাসরি বাংলার সেই কাদাভেজা মেঠো পথের ঘ্রাণ দেবে। অল্প রঙ ব্যবহার করে গভীর আবেগ ফুটিয়ে তোলা একজন বড় মাপের ক্রাফটম্যানের প্রধান লক্ষণ।
আরও দেখবেন তাঁর রেখার সংবেদনশীলতা। জয়নুলকে বলা হয় রেখার জাদুকর। আপনি যদি মনোযোগ দিয়ে দেখেন, বুঝবেন খুব বেশি কারুকার্য না করে কেবল কয়েকটা বলিষ্ঠ রেখার টানেই তিনি পশুর হাড়ের খাঁচা আর পেশির টান বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই যে অল্প কথায় অনেক কিছু বলে ফেলার দক্ষতা—মানে ‘মিনিমালিজম’—এটাই জয়নুলকে বিশ্বমানের কারিগরে পরিণত করেছে। তিনি রেখা দিয়ে শুধু আকার আঁকেননি, বরং রেখা দিয়ে তিনি হাহাকার আর জেদ বুনেছেন।
এই ছবিটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা দেখুন আমাদের গুরুকুল আট্য এন্ড কালচারের ওয়েবসাইটে : ‘সংগ্রাম’ (Struggle), জয়নুল আবেদিনের তেলরং চিত্র, ১৯৭৬
একজন ছবি-বোদ্ধা এই ছবির গুণাগুণ নিয়ে আরও কয়েক পাতা অনায়াসেই লিখে ফেলতে পারবেন। ছবি আমি তেমন বুঝি না, তাই এই লাইনে খুব একটা এগোলাম না। তবে আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন—কোনো বিষয় যদি আগে থেকে জানা বা বোঝা থাকে, তবে একই জিনিস আপনার সামনে কত বেশি রূপ-রস উন্মোচন করতে পারে। শিল্পের যেকোনো মাধ্যমই আসলে এমন। যে যত গভীরে বা খুঁটিনাটি (Detail) বুঝতে মনোযোগ দেবে, সে তত বেশি আনন্দ পাবে। তবে আপনার দেখা আর আমার দেখা এক নাও হতে পারে। দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হলেও কারো উপলব্ধিই কিন্তু শূন্য হবে না। আমার যেমন একটি বিস্তারিত পার্সপেক্টিভ থাকবে, আপনারও থাকবে তেমনি একটি নিজস্ব ভিউ।
গানেও তেমনই। আপনি যখন নজরুলের “হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে” গানটি শুনবেন, আপনার একরকম ভালো লাগবে। কিন্তু যদি এই গানটি শোনার সময় আপনি রাগ বাগেশ্রী চেনেন এবং তার রঙরূপ আপনার মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে, তবে গানটির মধ্যে আপনি অনেক নতুন রূপ খুঁজে পাবেন এবং আপনার মনে এক বিশেষ আনন্দ জাগবে।
এবার বলি—যিনি তাঁর আদি আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে সুখী এবং নিজেকে পূর্ণ মনে করেন, তাঁর জন্য এই আর্টিকেল এই পর্যন্তই। কিন্তু যে ব্যক্তি আগ বাড়িয়ে বাড়তি ঝামেলা করে সেই অভাবগুলোর অনুভূতি পেতে চান, সেই ক্ষুধা–তৃষ্ণা মেটানোর রসদ জোগাড় করতে চান—তাকে নিয়েই আমার এই পাগলামির আর্টিকেল আরও লম্বা হবে।
Rishabh Bhowmick নামে একজন তার মতো করে বলেছেন :
এর উত্তর যদি পেয়ে থাকেন তবে চলুন ফিরে যাই : গান খেকো সিরিজ [ সূচি ] তে।
