শুষির বাদ্যে দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতে দুমরাওন ঘরানা মূলত শুষির বাদ্য, বিশেষ করে শেহনাই (সানাই)-কেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগীতধারা। বিহারের বক্সার জেলার অন্তর্গত দুমরাওন রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানার বিকাশ ঘটে। ঐতিহাসিকভাবে এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উস্তাদ পৈগাম্বর বখশ-এর নাম উল্লেখ করা হয়, যিনি রাজদরবারে শেহনাইবাদনের একটি সুসংহত শৈলী গড়ে তোলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেন।

দুমরাওন ঘরানার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর গায়কী আঙ্গনির্ভর শেহনাইবাদন। এই ধারায় শেহনাইকে কেবল একটি লোকায়ত বা মাঙ্গলিক যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং শাস্ত্রীয় রাগসংগীতের একটি পূর্ণাঙ্গ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলাপের সূচনা হয় ধীরে ও ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে, যেখানে প্রতিটি স্বরকে পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে জোর, ঝালা ও গৎ অংশে লয়ের বিকাশ ঘটে, যা শেহনাইয়ের স্বরসীমার মধ্যে থেকেও এক বিস্তৃত রাগরূপ নির্মাণ করে।

এই ঘরানার ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ, যিনি দুমরাওনেই জন্মগ্রহণ করেন এবং এই ঘরানার উত্তরসূরি হিসেবে শেহনাইকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলেন। তাঁর গুরু ছিলেন তাঁর মামা উস্তাদ আলি বখশ ‘ভিলায়তু’, যিনি নিজেও এই ঘরানার একজন বিশিষ্ট সাধক ছিলেন এবং কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে শেহনাইবাদনের মাধ্যমে এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

দুমরাওন ঘরানার শৈলীতে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো মীড়ের সূক্ষ্ম ব্যবহার, দীর্ঘ শ্বাসনিয়ন্ত্রণ, এবং স্বরের আবেগময় প্রকাশ। শেহনাইয়ের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই ঘরানার শিল্পীরা কণ্ঠসংগীতের মতো সূক্ষ্ম অলংকার—গমক, আন্দোলন, কণ্ঠসদৃশ তান—সফলভাবে প্রয়োগ করেন। এর ফলে শেহনাইয়ের ধ্বনি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক, তেমনি গভীরভাবে মানবিক অনুভূতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই ঘরানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংযোগ। মন্দির, উৎসব এবং পূজার সঙ্গে শেহনাইয়ের যে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক, তা এই ঘরানার সংগীতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে বেনারসের ঘরানার সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে শাস্ত্রীয় সংগীত ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়।

দুমরাওন ঘরানা মূলত শেহনাইবাদনের একটি ধারাবাহিক পরম্পরা, যা গুরু-শিষ্য সম্পর্কের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত হয়েছে। যদিও এটি তবলা বা সেতারের মতো বহু শাখায় বিভক্ত নয়, তবুও এর নিজস্ব পরিচয় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বতন্ত্র।

আরও দেখুন: