একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সুপরিকল্পিত ও গতিশীল পররাষ্ট্রনীতির ওপর। “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”—স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত এই কালজয়ী মূলনীতিকে ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশের “বৈদেশিক সম্পর্ক” খাতে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে। এই দশ বছরে বাংলাদেশ কেবল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতেই নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতির মূল মঞ্চে এক আত্মবিশ্বাসী, প্রজ্ঞাবান ও উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিগত এক এক দশকে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিবেশি ভারতের সাথে দীর্ঘ চার দশকের অমীমাংসিত স্থল সীমানা চুক্তি (LBA) বাস্তবায়ন এবং ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা সুনির্দিষ্টকরণের ফলে বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল জলরাশির ওপর বাংলাদেশের একচ্ছত্র সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ (Blue Economy)-র এক নতুন স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ফলে গণচীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ (Strategic Partnership) উন্নীত হয়েছে এবং জাপানের সাথে অংশীদারিত্ব পৌঁছেছে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায়। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রত্যক্ষ কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে শ্রমবাজার পুনর্বিন্যাস ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ৬২টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর বাংলাদেশের বৈদেশিক সক্ষমতারই বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক জান্তা দ্বারা বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও গণহত্যার শিকার ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার অকুতোভয় সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অফ হিউম্যানিটি’ (Mother of Humanity) বা মানবতার জননী হিসেবে এক অনন্য বৈশ্বিক মর্যাদায় ভূষিত করেছে। বর্তমান নিবন্ধে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯টি নতুন কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পদে বাংলাদেশের গৌরবময় নির্বাচন এবং বিশ্ব দরবারে অর্জিত যুগান্তকারী কূটনৈতিক সাফল্যসমূহের বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরা হলো।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বৈদেশিক সম্পর্কে অগ্রগতি

১. প্রতিবেশি ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সংযোগের নতুন দিগন্ত
২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পারস্পরিক বিশ্বাস, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের (Connectivity) এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যান। এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডমার্ক বা ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল ২০১১ এবং ২০১৫ সালের উচ্চপর্যায়ের সফরসমূহ।
স্থল সীমানা চুক্তি (LBA) ও ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান: ২০১১ সালের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। এই সফরের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক ‘মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৫ ও ৭ মে ভারতের সংসদ (রাজ্যসভা ও লোকসভা)-এ সর্বসম্মতিক্রমে ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই চুক্তির অনুমোদন (Ratification) দেওয়া হয়। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৬-৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন’ এবং ‘লেটার অব মোডালিটিস’ বিনিময় হয়। এর ফলে ২০১৫ সালের ৩১শে জুলাই মধ্যরাত থেকে দীর্ঘ ৬৮ বছরের অমানবিক ছিটমহল সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটে। ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের অংশ হয়ে যায়।
আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য পরিকাঠামো: ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক সফরে দুই দেশের মধ্যে মোট ২২টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের অনুরোধে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাবান্ধার বিপরীতে ভারতের ‘ফুলবাড়ী’তে পূর্ণাঙ্গ ইমিগ্রেশন সুবিধা চালু করা হয়, যা নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের ত্রিপাক্ষিক বাণিজ্যের পথ সুগম করে। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল রুট সম্পর্কিত প্রটোকল, ঢাকা-গৌহাটি-শিলং এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়। রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’-এর ঢাকা ও কলকাতায় প্রান্তীয় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং নতুন করে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ চালুর মাধ্যমে খুলনা-কলকাতা রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত করা হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের নতুন উৎস তৈরি করে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি: এই এক দশকে জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা এক নতুন মাত্রা পায়। ভারত থেকে ভেড়ামারা-বহরমপুর গ্রিডের মাধ্যমে এবং ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের শিল্পায়নে অবদান রাখতে শুরু করে। এছাড়া, ২০১৮ সালের ২৫-২৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন। এই সফরে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বাংলাদেশের অর্থায়নে নবনির্মিত ঐতিহ্যবাহী ‘বাংলাদেশ ভবন’-এর শুভ উদ্বোধন করেন এবং সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ‘Guest of Honour’ হিসেবে যোগ দেন। এই সফরেই আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ (ডি.লিট) উপাধিতে ভূষিত করে।
২. মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি: শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক
বিগত এক দশকে শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম প্রধান সাফল্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের এক নতুন ও গতিশীল অধ্যায়ের সূচনা করা। প্রথাগত জনশক্তি রপ্তানির গণ্ডি পেরিয়ে এই সম্পর্ককে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও যৌথ বিনিয়োগের স্তরে উন্নীত করা হয়।
শ্রমবাজারের রেকর্ড প্রবৃদ্ধি ও সুরক্ষা:
২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত মোট ৬২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের বলিষ্ঠ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে ২০১৭ সালে শুধুমাত্র সৌদি আরবেই রেকর্ড সংখ্যক ৫,৫১,৩০৮ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থান লাভ করেন। জিসিসি (GCC) ভুক্ত অন্যান্য দেশেও কর্মসংস্থানের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকার পাশাপাশি জর্ডান, ইরাক ও লেবাননের মতো নতুন নতুন দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সফলভাবে সম্প্রসারিত হয়।
উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর:
এপ্রিল ২০০৯ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা আব্দুল্লাহর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফর করেন। পরবর্তীতে জুন ২০১৬-তে তাঁর পুনরায় সৌদি আরব সফর, ২০১৪ সালের অক্টোবরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর, ২০০৯ ও ২০১২ সালে কাতার সফর, ২০১৬ সালের মে মাসে কুয়েতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফর মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এক অনন্য উচ্চতা প্রদান করে।
মানবিক কূটনীতি ও প্রবাসীদের প্রত্যাবাসন:
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানব পাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি এবং পাচারের শিকার নাগরিকদের দ্রুততম সময়ে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বলিষ্ঠ কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়। এই এক দশকে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক জলসীমায় উদ্ধারকৃত ২,৫৫০ জন বাংলাদেশিসহ লিবিয়া, থাইল্যান্ড এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন থেকে প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিককে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও কূটনৈতিক তৎপরতায় নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
৩. দূরপ্রাচ্য ও পরাশক্তি কূটনীতি: চীন, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের উন্নয়ন এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা সরকার চীন, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছে।
চীনের সাথে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’:
২০১০ এবং ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণচীনে ঐতিহাসিক সরকারি সফর এবং ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায় তথা ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ (Strategic Partnership) উন্নীত হয়। ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক সফরে দুই দেশের মধ্যে ২৭টি বৃহৎ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করে। এর আগে ২০১৪ সালের চীন সফরে ২০ দফা সম্বলিত একটি যৌথ ইশতেহার এবং ২টি চুক্তি, ২টিকে সমঝোতা স্মারক ও ২টি পত্র বিনিময়সহ মোট ৬টি গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এই দ্বিপাক্ষিক গভীরতার অংশ হিসেবেই ২০১৭ সালের ১৮-১৯ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বাংলাদেশ সফর করেন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দ্বিপাক্ষিক মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন।
জাপানের সাথে বিগ-বি (BIG-B) উদ্যোগ ও বিনিয়োগ:
২০১৪ ও ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর এবং ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক ‘Comprehensive Partnership’-এ রূপ নেয়। ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরকালে জাপান বাংলাদেশকে ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার) সহজ শর্তে ঋণের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সহযোগিতার আওতায় মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (BIG-B) গ্রহণ করা হয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক ও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণসহ মেগা প্রকল্পগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের এক নতুন যুগের সূচনা হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো বাংলাদেশ সফর করে এই অংশীদারিত্বকে আরও বেগবান করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ:
২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা সংলাপ (Security Dialogue), অংশীদারিত্ব সংলাপ (Partnership Dialogue), সামরিক সংলাপ এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘টিকফা’ (TICFA) সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) জন কেরির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুদেশের মধ্যে সন্ত্রাস দমন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বহুমাত্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরও জোরদার হয়।

৪. ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও উন্নত বিশ্বের সাথে সম্পর্কের নতুন বিন্যাস
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহ এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। প্রথাগত দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এই দেশগুলোর সাথে সমমর্যাদা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন যুগের সূচনা করে।
রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক ও সামরিক সহযোগিতা:
শেখ হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় সাফল্য ছিল রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ চুক্তি, পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক তথ্য কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত চুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের স্টেট ক্রেডিট চুক্তিসহ মোট ৩টি চুক্তি ও ৬টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে জলবায়ু ও বদ্বীপ ব্যবস্থাপনা কূটনীতি:
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য ও জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশ অনন্য ভূমিকা রাখে। ২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেদারল্যান্ডস সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতার মাস্টারপ্ল্যান ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ (Bangladesh Delta Plan 2100) প্রণয়নে ডাচ সরকারের সাথে কৌশলগত পানি ব্যবস্থাপনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া, ২০১৭ সালের ১১-১৩ই ডিসেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের যৌথ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী প্যারিসে অনুষ্ঠিত “One Planet Summit”-এ অংশগ্রহণ করেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিবেশ কূটনীতির অবস্থান সুদৃঢ় করে।
দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের সফর:
এই এক দশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গুরুত্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, জার্মানি, বেলারুশ ও গ্রিসের রাষ্ট্রপ্রধানদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ে সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেন। ২০১২ সালে বেলারুশের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে শিক্ষা, কৃষি, আইন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সামরিক বিনিয়োগসহ মোট ১২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রথম “Girl Summit”-এ অংশগ্রহণ করেন।
৫. উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরেশিয়ান কূটনীতি
প্রথাগত বাজারের বাইরে নতুন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সীমান্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকার উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরেশিয়া অঞ্চলে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের নীতি গ্রহণ করে।
কানাডার সাথে অংশীদারিত্ব:
কানাডার সাথে বাংলাদেশের ৪৬ বছরের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিয়মিতভাবে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক ফরেন অফিস কনসালটেশন (FOC) সভা অনুষ্ঠিত হতে থাকে, যা দুই দেশের বাণিজ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকার সাথে নতুন ফ্রন্ট:
লাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ব্রাজিলের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে ২০১৮ সালের ২০শে মার্চ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ-ব্রাজিল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক ও কৃষি খাতে লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়।
তুরস্কের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক:
২০১৭ সালের ১৯-২০শে ডিসেম্বর তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম বাংলাদেশে এক রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক লবিং এবং প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৬. বহুপাক্ষিক কূটনীতি: জাতিসংঘ এবং বৈশ্বিক ফোরামে নীতিনির্ধারণী নেতৃত্ব
বিগত এক দশকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে (Multilateral Forums) বাংলাদেশ কেবল অংশগ্রহণকারী ছিল না, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এজেন্ডা নির্ধারণে নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়েছিল।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ মডেল:
২০১০ সালে জাতিসংঘের ৬৫তম সাধারণ অধিবেশন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (MDG+10) সম্মেলনে সহ-সভাপতিত্ব করেন। ২০১১ সালের ৬৬তম অধিবেশনে তিনি ‘Every Woman Every Child’ এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংক্রান্ত শীর্ষ সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ২০১২ সালের ৬৭তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন’ (People’s Empowerment and Development) মডেলটি একটি বৈপ্লবিক দর্শন হিসেবে জাতিসংঘে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
বিশ্ব শিক্ষা ও পরিবেশ ফোরামে শীর্ষ নেতৃত্ব:
৬৮তম সাধারণ অধিবেশন চলাকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক শিক্ষা উদ্যোগ ‘Global Education First Initiative’-এর অন্যতম শীর্ষনেতা (Champion) হিসেবে যোগ দেন। এছাড়া, ২০১৬ সালের নভেম্বরে হাঙ্গেরির রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত ‘Budapest Water Summit 2016’-এ অংশ নিয়ে পানি ও স্যানিটেশন নীতি নির্ধারণে নেতৃত্ব দেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে মরক্কোর মারাক্কেশে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (COP 22)-এর হাই-লেভেল সেগমেন্টে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নিয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর (CVF) পক্ষে জোরালো দাবি উপস্থাপন করেন।
G7, BRICS ও বৈশ্বিক ফোরামে অংশগ্রণ:
২০১৬ সালের অক্টোবরে ভারতের গোয়াতে অনুষ্ঠিত “BRICS-BIMSTEC Outreach Summit”-এ প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। এছাড়া, ২০১৮ সালের ৮-৯ই জুন কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর জোট ‘G7 Outreach Leaders Programme’-এ বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্বনেতাদের সাথে আলোচনা করেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) নির্বাহী চেয়ারম্যান অধ্যাপক ক্লাউস শোয়াবের আমন্ত্রণে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে অনুষ্ঠিত ৪৭তম বার্ষিক সভায় এবং ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে (MSC) প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সফল নেতৃত্ব দেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দফতর স্থাপন:
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য হলো ঢাকায় বিমসটেক (BIMSTEC)-এর স্থায়ী সচিবালয় স্থাপন। এছাড়া, সার্কের (SAARC) অধীনে ঢাকায় ‘সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন’ (SARSO)-এর সদর দফতর স্থাপন করা হয়, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য মানদণ্ড নির্ধারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রাচীনতম আঞ্চলিক সংস্থা ‘অরগানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’ (OAS)-এর স্থায়ী পর্যবেক্ষকের মর্যাদাপূর্ণ পদমর্যাদা লাভ করে।

৭. আন্তর্জাতিক সংস্থায় নেতৃত্ব ও গৌরবময় নির্বাচন
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী কূটনীতির অন্যতম বড় প্রমাণ ছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পদে ধারাবাহিক বিজয়। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ফলেই এটি সম্ভব হয়েছিল।
সিপিএ ও আইপিইউ-তে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব:
এই এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্ব সংসদীয় রাজনীতির শীর্ষ দুটি পদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (CPA)-এর নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন এবং ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU)-এর প্রেসিডেন্ট পদে বাংলাদেশের বিজয় বিশ্বজুড়ে দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জাতিসংঘের শীর্ষ পর্ষদসমূহে সদস্যপদ লাভ:
বাংলাদেশ এই পাঁচ বছরে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সংখ্যক কমিটি, অঙ্গ সংস্থা ও ফোরামের পরিচালনা পর্ষদে স্থান করে নেয়। এর মধ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল (UNHRC), ইকোসোক (ECOSOC), ইউএনডিপি (UNDP), ইউএনএফপিএ (UNFPA), ইউনেস্কো (UNESCO), ইউএন-উইমেন (UN-Women), সিডও (CEDAW), এফএও (FAO), ডব্লিউএইচও (WHO), ইউএনএইডস (UNAIDS), ইউএনইপি (UNEP), ইউএন-হ্যাবিট্যাট (UN-HABITAT), আইএমও (IMO), আইটিইউ (ITU), ইউপিইউ (UPU), আইএসবিএ (ISBA) এবং আইএলও (ILO) অন্যতম।
অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মানজনক পদ:
এছাড়াও বাংলাদেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক সাউথ-সাউথ স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, সাউথ-সাউথ সহযোগিতা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটির সভাপতি, জাতিসংঘের ক্রেডেনশিয়াল কমিটির চেয়ারম্যান, গ্লোবাল ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান এবং ইউএন-উইমেন এক্সিকিউটিভ বোর্ডের ভাইস-চেয়ারপার্সন পদে নির্বাচিত হয়ে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। এই ধারাবাহিক সাফল্যের প্রেক্ষিতেই ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরকালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে সামগ্রিক “উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি রোল মডেল দেশ” হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে ‘অভিবাসন ও উন্নয়ন সম্পর্কিত বৈশ্বিক ফোরাম’ (GFMD)-এর সভাপতি নির্বাচিত হয় এবং ২০১৬ সালের ১০-১২ই ডিসেম্বর ঢাকায় অত্যন্ত সফলভাবে ৯ম জিএফএমডি (GFMD) শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে।
৮. সমুদ্রসীমা বিজয়: আইনি লড়াই ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব
আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের এই দশকের অন্যতম বড় স্ট্র্যাটেজিক ও ভূ-রাজনৈতিক মহাবিজয়।
মিয়ানমার ও ভারতের সাথে মামলার নিষ্পত্তি:
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবেশী দেশ দুটির সাথে চলা সমুদ্রসীমা বিরোধের অবসান ঘটাতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়। এর ফলশ্রুতিতে ২০১২ সালে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল (ITLOS)-এর রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের সাথে এবং ২০১৪ সালের ৭ই জুলাই নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিসি আদালত (PCA)-এর রায়ের মাধ্যমে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়।
সার্বভৌম অধিকারের পরিধি:
এই দুই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সর্বমোট ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার ওপর বাংলাদেশের একচ্ছত্র সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের আইনগত অধিকার নিশ্চিত হয়, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ (Blue Economy) বিকাশের মূল ভিত্তি।
৯. রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক কূটনীতি ও ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তা কর্তৃক নির্মম জেনোসাইড ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক সীমান্ত অভিমুখে ছুটে আসে, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমান্ত খুলে দিয়ে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আশ্রয় ও মানবিক ব্যবস্থাপনা:
সম্পূর্ণ নিজস্ব একক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ১০ লক্ষাধিক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে টেকসইভাবে আশ্রয়, অন্ন ও চিকিৎসা প্রদান করে, যা আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী ব্যবস্থাপনার উদাহরণ। বাংলাদেশের এই অকুতোভয় ও মানবিক সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী সর্বস্তরের প্রশংসা কুড়ায়।
বৈশ্বিক নেতাদের আগমন ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রয়াস:
এই মানবিক সংকটের গভীরতা দেখে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ বাংলাদেশ সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে ৫ দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেন। বাংলাদেশ এই সংকটের স্থায়ী ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক (জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ওআইসি) ফোরামে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
১০. প্রশাসনিক সাফল্য: ১৯টি নতুন মিশন স্থাপন
বিশ্বজুড়ে প্রবাসীদের কল্যাণ সাধন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও নিবিড় করার লক্ষ্যে ২০০৮-০৯ হতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে পূর্বে বন্ধ হওয়া ৩টি মিশন পুনঃস্থাপনসহ মোট ১৯টি নতুন বাংলাদেশ মিশন ও কনস্যুলেট জেনারেল অফিস চালু করা হয়।
নতুন স্থাপিত মিশনসমূহ:
গ্রিসের এথেন্স, ইতালির মিলান, ভারতের মুম্বাই ও গুয়াহাটি, তুরস্কের ইস্তাম্বুল, পর্তুগালের লিসবন, চীনের কুনমিং, লেবাননের বৈরুত, মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়া, মরিশাসের পোর্ট লুইস, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, পোল্যান্ডের ওয়ারশ, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা, নাইজেরিয়ার আবুজা, আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি (পুনঃস্থাপন) এবং কানাডার টরন্টো।
অনুমোদন ও সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া:
এছাড়াও রোমানিয়ার বুখারেস্ট (পুনঃস্থাপন) এবং ভারতের চেন্নাইয়ে মিশন স্থাপনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। পাশাপাশি আফগানিস্তানের কাবুল (পুনঃস্থাপন), সুদানের খার্তুম এবং সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে নতুন মিশন চালুর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্যাডার কাঠামোতে ৬০টি নতুন বিসিএস (পররাষ্ট্র বিষয়ক) ক্যাডার পদ সৃজিত হয়।
১১. বিবিধ কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্জন
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো স্বীকৃতি:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিবিড় ও সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক লবিংয়ের ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক ‘International Memory of the World Register’-এ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (Documentary Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা:
এই এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বমঞ্চ থেকে বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার আসে। এর মধ্যে ২০১১ সালে জাতিসংঘের ‘South-South Award’, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পরিবেশ বিষয়ক পুরস্কার ‘Champions of the Earth’, ইউনেস্কোর ‘Tree of Peace Award’, ২০১৮ সালের ‘Global Women’s Leadership Award’, গ্লোবাল হোপ কোয়ালিশন থেকে ‘Award for Humanitarian Leadership’ এবং ইন্টার প্রেস সার্ভিস (IPS) থেকে ‘IPS International Achievement Award’ অন্যতম।
সাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক:
এই সময়ে ইসলামিক শিক্ষামূলক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ISESCO) কর্তৃক ঢাকাকে ২০১২ সালের জন্য ‘ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ ‘আসেম’ (ASEM) এবং ‘সিকা’ (CICA)-এর নতুন সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্তি লাভ করে।
বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা ও বিচারিক কূটনীতি:
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী ও কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে এলিয়ট ট্রুডোসহ বহু বিদেশি বন্ধুদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT-BD)-এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সফলভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইতিবাচক সমর্থন আদায়ে সফল কূটনৈতিক প্রয়াস চালানো হয়।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই এক দশক ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অনন্য ও স্বর্ণালী মাইলফলক। জাতির পিতার দেওয়া ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—এই শাশ্বত আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতিতে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারতের সাথে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
চীনের সাথে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’, জাপানের সাথে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, রাশিয়ার প্রত্যক্ষ কারিগরি সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশ এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার মতো অকুতোভয় মানবিক সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী যে নৈতিক উচ্চতা এনে দিয়েছে, তা বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে করেছে বহুগুণ সমুজ্জ্বল। একই সাথে ১৯টি নতুন মিশন স্থাপন এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নীতিনির্ধারণী পর্ষদে বাংলাদেশের গৌরবময় ও সরব উপস্থিতি আমাদের কূটনৈতিক পরিপক্বতাকেই বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে। গত ১০ বছরের এই সুদূরপ্রসারী ও গতিশীল পররাষ্ট্রনীতি কেবল আমাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদাই বৃদ্ধি করেনি, বরং বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
আরও দেখুন:
