শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন । অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির এক দশক (২০০৯-২০১৮) । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু সময়কাল আসে যা কেবল অর্থনৈতিক সূচকের উন্নয়নের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ়, দূরদর্শী এবং সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই এক দশক তেমনই এক গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায়। এই ১০ বছরে বাংলাদেশ এমন ৪টি ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানচিত্রকে যেমন নিষ্কণ্টক ও শক্তিশালী করেছে, তেমনি জাতিকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত গ্লানি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করে বিশ্বদরবারে এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।

এই এক দশকের প্রথম ও প্রধান অর্জন হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন করে আদালতের রায় কার্যকর করা। ১৯৭৫ সালের কলঙ্কিত অধ্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিচারহীনতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা করে। দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু এবং শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের ঋণ শোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তৃতীয় অনন্য অর্জনটি হলো কোনো প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রতিবেশি রাষ্ট্র মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের ঐতিহাসিক নিষ্পত্তি। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের একচ্ছত্র সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির নতুন স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছে। চতুর্থত, ভূ-রাজনীতির দীর্ঘ ৬৮ বছরের মানবিক বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি (২০১৫) বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়। এর মাধ্যমে কোনো প্রকার সংঘাত ছাড়াই ১৬২টি ছিটমহলের হাজার হাজার মানুষ ফিরে পেয়েছে তাদের প্রকৃত নাগরিকত্ব, পরিচয় ও মৌলিক মানবাধিকার। বর্তমান নিবন্ধে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে অর্জিত এই ৪টি যুগান্তকারী সাফল্যের পটভূমি, আইনি লড়াই এবং চূড়ান্ত অর্জনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন: অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির এক দশক (২০০৯-২০১৮)

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন । অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)। ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

জাতির পিতার হত্যার বিচারের রায় কার্যকর ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও কালিমালিপ্ত অধ্যায়। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে খুনিদের বিচারের পথ আইনিভাবে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, যা ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর, ১৯৯৬ সালের ১২ই নভেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করলে বিচারহীনতার অবসান ঘটে। এরপর ১৯৯৬ সালের ২রা অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলাটি দায়ের করেন।

এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ এবং তা মোট চার ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে, ১৯৯৮ সালের ৮ই নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। দ্বিতীয় ধাপে, নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল শুনানিতে ২০০০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ একটি বিভক্ত রায় দেয়। যেখানে বিচারপতি এম রুহুল আমিন ১৫ জন আসামির মধ্যে ৫ জনকে খালাস দিয়ে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ জন আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এই বিভক্তির কারণে মামলাটি হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে পাঠানো হয়। ২০০১ সালের ৩০শে এপ্রিল বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করীমের সমন্বয়ে গঠিত তৃতীয় বেঞ্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৫ জনের মধ্যে ৩ জনকে খালাস দিয়ে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায় এবং আপিল বিভাগে বিচারক সংকট তৈরি করে শুনানি স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পর, ২০০৭ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে তিন বিচারপতির বেঞ্চে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির আপিল শুনানি পুনরায় শুরু হয়। অবশেষে ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে মামলার বিচারকার্যে চূড়ান্ত গতি আনয়ন করেন। ২০০৯ সালের ১৯শে নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চতুর্থ ও চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চলা আইনি ও বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘটে।

২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আদালতের রায় অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনি—লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল এ কে এম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)-এর ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে আংশিক কলঙ্কমুক্ত করা হয়। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে একজন (আজিজ পাশা) ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে পলাতক অবস্থায় মারা যায়। অবশিষ্ট খুনিদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ঐতিহাসিক কলঙ্ক মোচন

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ও স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারেরা বাঙালি জাতির ওপর যে নজিরবিহীন গণহত্যা, লুণ্ঠন ও নারকীয় নির্যাতন চালিয়েছিল, তার বিচার সুদীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে আলোর মুখ দেখেনি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের ইশতেহারে এই গণদাবিটিকে অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ও ঐতিহাসিক বিজয় লাভের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০০৯ সালের ২৯শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এই বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস হয়।

সংসদে গৃহীত এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে প্রণীত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৭৩’ (International Crimes Tribunals Act 1973) অনুযায়ী অভিযুক্তদের তদন্ত এবং বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৯ সালের ২৫শে মার্চ এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। আইনটিকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের ও সমসাময়িক যুগের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য ২০০৯ সালের ২১শে মে বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়ে আইন কমিশনে পাঠানো হয়। আইন কমিশন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ আইনজীবী, বিচারপতি ও আইনজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশোধনের পরামর্শ দিলে, ২০০৯ সালের ৯ই জুলাই জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী পাস করা হয়।

স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ ৩৯ বছর পর, ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচারকার্য পরিচালনার জন্য রাজধানীর পুরাতন হাইকোর্ট ভবনকে আদালত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। মামলার সংখ্যা ও বিচার ত্বরান্বিত করতে পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি আদালত গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ২১শে জানুয়ারি প্রথম ঐতিহাসিক রায়টি প্রদান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রোকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়।

২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে ৩০টিরও বেশি মামলার রায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হয়। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১২ই ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১১ই এপ্রিল জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, ২০১৫ সালের ২২শে নভেম্বর এক যৌথ রায়ের ধারাবাহিকতায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, ২০১৬ সালের ১১ই মে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং ২০১৬ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম অর্থযোগানদাতা ও জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এছাড়া আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করা অবস্থায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সাবেক আমির গোলাম আযম এবং বিএনপির সাবেক নেতা আবদুল আলীম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে যে, বিলম্বে হলেও সত্য ও সুশাসনের জয় অনিবার্য।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন । অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)। ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

 

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি: নীল অর্থনীতির নবদিগন্ত

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশে থাকা খনিজ সম্পদের ওপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা সুনির্দিষ্ট না থাকায় স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। ২০০১ সালে শেখ হাসিনার তৎকালীন সরকার জাতিসংঘের ‘সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন’ বা আনক্লস (UNCLOS) অনুসমর্থন করে সমুদ্রে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকারের আইনি ভিত্তি স্থাপন করে। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, আনক্লস অনুসমর্থনের পর ১০ বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে মহীসোপানের অকাট্য বৈজ্ঞানিক দাবি জাতিসংঘের মহীসোপান সীমা নির্ধারণ বিষয়ক কমিশন (CLCS)-এর কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী সরকারগুলোর উদাসীনতায় এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০০৯ সালে পুনরায় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট স্থায়ীভাবে সমাধানের এক ঐতিহাসিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ব্যর্থতার পর, ২০০৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আনক্লসের আইনি কাঠামো মেনে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ‘আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল’ (ITLOS)-এ ১৪ই ডিসেম্বর ২০০৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তিতে ইটলসের বিচারিক এখতিয়ার মেনে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিশেষ ঐকমত্য তৈরি হয়, যা ইটলসের ইতিহাসের ১৬তম মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

২০১০ সালের ১লা জুলাই বাংলাদেশ নিজের পক্ষে সব ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও দালিলিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করে। এর জবাবে মিয়ানমার তাদের প্রমাণাদি জমা দেয় সে বছরের ১লা ডিসেম্বর। ২০১১ সালের ১৫ই মার্চ মিয়ানমারের দাবির বিপক্ষে বাংলাদেশ শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করে এবং এর বিপরীতে মিয়ানমার তাদের বক্তব্য তুলে ধরে ২০১১ সালের ১লা জুলাই। অবশেষে ২০১১ সালের ৮ থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বর জার্মানির হামবুর্গে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দফায় মৌখিক শুনানিতে নিজেদের পক্ষে অকাট্য যুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা তুলে ধরে। বাংলাদেশের মূল যুক্তি ছিল ‘ন্যায্যতার নীতি’ (Principle of Equity), যার ভিত্তিতে উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমার দাবি পেশ করা হয়। অন্যদিকে মিয়ানমারের যুক্তি ছিল ‘সমদূরত্ব পদ্ধতি’ (Equidistance Method), যা মানলে বাংলাদেশ একটি অবরুদ্ধ সমুদ্রে পরিণত হতো। ২০১২ সালের ১৪ই মার্চ ইটলস বাংলাদেশের ‘ন্যায্যতার নীতি’ মেনে নিয়ে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে।

মিয়ানমারের সাথে এই বিজয়ের পর ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (PCA) সফলভাবে পরিচালনা করা হয়। ২০১৪ সালের ৭ই জুলাই নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিসি আদালত ভারতের সাথে মামলার রায় ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশ লাভ করে।

এই দুই যুগান্তকারী রায়ের ফলে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়টি চিরতরে সুরাহা হয়ে যায়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার লাভ করে। এই অর্জন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির এক নতুন বৈপ্লবিক সম্ভাবনা উন্মোচন করে, যা গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে অজেয় করে তোলে।

ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়: দীর্ঘ ৬৮ বছরের মানবিক বঞ্চনার অবসান

অখণ্ড ভারত বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ স্থপতি সিরিল রেডক্লিফের ত্রুটিপূর্ণ ও তাড়াহুড়ো করে করা মানচিত্র বিভাজন থেকেই ছিটমহলের মতো এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়। এক দেশের মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে থেকে যায় অন্য দেশের ছোট ছোট ভূখণ্ড। এর ফলে দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে এক চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ও মানবেতর জীবন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কোনো দেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ না থাকায় এই ছিটমহলগুলোতে বসবাসকারী মানুষেরা দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনি সুরক্ষা এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলেন।

দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মোট ১৬২টি ছিটমহল ছিল। এর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরে। ২০১১ সালের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলোতে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ হাজার এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের বাসিন্দা ছিলেন প্রায় ১৪ হাজার। অর্থাৎ মোট প্রায় ৫১ হাজার মানুষ রাষ্ট্রহীন নাগরিক হিসেবে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। দুই দেশের এই ছিটমহলগুলোর মোট ভূমির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৬৮ একর, যার মধ্যে ভারতীয় ছিটমহলের পরিমাণ ছিল ১৭unique একর এবং বাংলাদেশি ছিটমহলের পরিমাণ ছিল ৭,১১০ একর। ভারতীয় ছিটমহলগুলোর সিংহভাগই ছিল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলায়—লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি এবং নীলফামারিতে ৪টি। অপরদিকে, ভারতের কুচবিহারে ৪৭টি এবং জলপাইগুড়ি জেলায় ৪টি বাংলাদেশি ছিটমহল অবস্থিত ছিল।

এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের সমাধানে প্রথম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে তিনি এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে একটি যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিহাসে ‘মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ এই চুক্তিটি দ্রুততম সময়ে অনুসমর্থন (Ratification) করলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে তা কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকে। ২০১১ সালে শেখ হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় এই সীমান্ত চুক্তির সাথে একটি অতিরিক্ত প্রটোকল সই হয়। তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে ভারতের সংবিধান সংশোধন করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির ফলশ্রুতিতে ভারতের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়। ২০১৫ সালের ৫ই মে ভারতের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এবং ৭ই মে নিম্নকক্ষ লোকসভায় সর্বসম্মতভাবে ‘১১৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল’ পাসের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সীমান্ত চুক্তি অনুমোদিত হয়। বিল পাসের পর, ২০১৫ সালের ৬ই জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফর করেন এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থলসীমান্ত চুক্তির দলিল বিনিময় হয়।

অবশেষে, ২০১৫ সালের ৩১শে জুলাই মধ্যরাত (১লা আগস্ট) থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়। এই মাহেন্দ্রক্ষণে কোনো প্রকার যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ হয় নতুন ভূখণ্ড। অবসান ঘটে ১৬২টি ছিটমহলের হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিত্ব ও মানবেতর জীবনের। ছিটমহলবাসী লাভ করেন তাঁদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মৌলিক মানবাধিকার। শেখ হাসিনা সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগে এই অঞ্চলগুলোতে দ্রুত রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করে তাঁদের মূল অর্থনীতির মূলধারার সাথে একীভূত করা হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "১০ বছরে ৪টি অনন্য অর্জন" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

সামগ্রিক মূল্যায়ন:

২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই ১০ বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কলঙ্ক, অমীমাংসিত জাতীয় সংকট ও আইনি অস্পষ্টতা থেকে মুক্তির এক মহাকাব্যিক সময়। জাতির পিতার হত্যার বিচার সম্পন্ন করা এবং একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল আইনের শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানই ঘটায়নি, বরং বিশ্বদরবারে এক অকুতোভয়, নীতিবান ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিচারিক বিজয় দীর্ঘদিনের গ্লানি মুছে বাঙালি জাতিকে এক নতুন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত করেছে।

একই সাথে, আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং কোনো প্রকার সংঘাত ছাড়াই ৬৮ বছরের মানবিক সংকট দূর করে ছিটমহলবাসীদের বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করা ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক অসামান্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহাবিজয়। এই ৪টি অনন্য অর্জন কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক সাফল্য নয়; এগুলো বাংলাদেশের মানচিত্রকে করেছে সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক, নিরেট ও সুরক্ষিত। শেখ হাসিনার এই বলিষ্ঠ, দূরদর্শী ও জাতীয় স্বার্থরক্ষা ক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্বই প্রমাণ করে যে, সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্য থাকলে যেকোনো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা জয় করে একটি দেশের ভাগ্যকে চিরদিনের জন্য বদলে দেওয়া সম্ভব।

আরও দেখুন: