২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ়, দূরদর্শী এবং সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। দীর্ঘ চার দশকের ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (LDC)-এর বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ এই এক এক দশকে বিশ্বমঞ্চে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়কালে কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোরই (যেমন: জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং রাজস্ব আহরণ) স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ অগ্রগতি হয়নি, বরং ব্যাংকবিহীন সাধারণ মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনতে মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নে এসেছে যুগান্তকারী সাফল্য। একই সাথে আন্তর্জাতিক মহলের সমস্ত ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থিক চক্রান্ত নস্যাৎ করে নিজস্ব অর্থায়নে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের যে সক্ষমতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক আত্মমর্যাদাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইতিহাস ও রাজনীতির এই বিশেষ পর্বে আমরা শেখ হাসিনার স্বর্ণালী দশকের (২০০৯-২০১৮) সেই আর্থিক মহোৎসব ও কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ রূপরেখা ধাপে ধাপে আলোচনা করব।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১০ বছরে আর্থিক খাতের কয়েকটি মাইলফলক অর্জন। অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)
১. নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন
বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই তালিকা প্রকাশ করে।
বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস:
বিশ্বব্যাংক প্রতিবছর ১ জুলাই মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (GNI per capita) ভিত্তিতে দেশগুলোকে চারটি আয়ভিত্তিক গ্রুপে ভাগ করে—
- নিম্ন আয়ের দেশ (LIC): মাথাপিছু আয় ১,০৪৫ মার্কিন ডলার বা তার নিচে।
- নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ (LMIC): মাথাপিছু আয় ১,০৪৬ – ৪,১২৫ মার্কিন ডলার।
- উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ (UMIC): মাথাপিছু আয় ৪,১২৬ – ১২,৭৩৫ মার্কিন ডলার।
- উচ্চ আয়ের দেশ (HIC): মাথাপিছু আয় ১২,৭৩৬ মার্কিন ডলার বা তার বেশি।
বাংলাদেশের অবস্থান ও ধারাবাহিক অগ্রগতি:
২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০৫ মার্কিন ডলার, সেখানে শেখ হাসিনার টানা ১০ বছরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নীতির ফলে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১,৩১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। ফলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিম্ন আয়ের অভিশাপ মুক্ত হয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রবেশ করে।
এই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১,৭৫১ মার্কিন ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়। এই গৌরবময় অর্জনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের বৈপ্লবিক সাফল্য। এই এক দশকে সুষম অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০০৯ সালের ৩৪.৩% থেকে অবিশ্বাস্যভাবে হ্রাস পেয়ে ২০১৮ সালে ২১.৮%-এ নেমে আসে। একই সাথে চরম দারিদ্র্যের হার ২৫.৮% থেকে কমে ১১.৩%-এ নেমে আসে, যা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) কর্তৃক বৈশ্বিকভাবে “দারিদ্র্য বিমোচনের রোল модель” হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এই অর্জন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন ধারার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা প্রমাণ করে—শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের টেকসই পথের দিকে এগোচ্ছে। বিশেষ করে এই ১০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির হার ৫.০five% থেকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৭.৮৬% (পরবর্তীতে সংশোধিত ৮.১৫%) স্পর্শ করে, যা তৎকালীন সময়ে এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অন্যতম দ্রুততম প্রবৃদ্ধি হিসেবে গণ্য হয়েছিল।
২. স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ অর্জন করেছে এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মাইলফলক। ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ECOSOC) উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি (CDP) নিউইয়র্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের ৩টি সূচকের সবকটিতেই সফলতার সাথে যোগ্যতা অর্জন করেছে।
উত্তরণের মানদণ্ড ও বাংলাদেশের অর্জন:
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, তিনটি সূচকের মধ্যে কমপক্ষে দুইটিতে উত্তীর্ণ হতে হয়, কিন্তু বাংলাদেশ তিনটিতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি স্কোর অর্জন করে—
- মাথাপিছু জাতীয় আয় (GNI per capita): জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদণ্ড ছিল ১,২৩০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি, যেখানে তৎকালীন তিন বছরের গড় হিসাবে বাংলাদেশের অর্জন ছিল ১,২৭২ মার্কিন ডলার।
- মানবসম্পদ সূচক (Human Assets Index – HAI): নির্ধারিত মানদণ্ড ছিল ৬৬ বা তার বেশি স্কোর, যেখানে শিক্ষা, পুষ্টি ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে সরকারের অভাবনীয় সাফল্যের কারণে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৭২.৮।
- অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (Economic Vulnerability Index – EVI): নির্ধারিত মানদণ্ড ছিল ৩২ বা তার কম স্কোর (কম স্কোর মানে অর্থনীতি তত বেশি স্থিতিশীল), যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ২৫।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা:
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, দুই ধারাবাহিক পর্যালোচনায় (২০১৮ ও ২০২১) এই অর্জন ধরে রাখতে হতো এবং বাংলাদেশ তা সফলভাবে ধরে রেখে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এই উত্তরণ সম্ভব হয়েছিল শেখ হাসিনার দক্ষ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার (Macroeconomic Management) কারণে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ৭.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের ওপর ভর করে ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে। একই সাথে ২০০৮-০৯ সালের ১৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারের মোট রপ্তানি আয়, তৈরি পোশাক খাতের আধুনিকায়ন এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টির ফলে ২০১৮ সাল নাগাদ ৩৭.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।
এই উত্তরণ প্রমাণ করে, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এখন আর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নয়, বরং একটি টেকসই বাস্তবতা।

৩. পদ্মা সেতু প্রকল্প
সকল দেশি-বিদেশি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী, দূরদর্শী এবং অটল নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতার ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক।
অবস্থান, সংযোগ ও নির্মাণ অগ্রগতি (২০০৯-২০১৮):
- পদ্মা সেতুর এক প্রান্ত মুন্সীগঞ্জের মাওয়া এবং অপর প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরাকে সংযুক্ত করেছে। এই ত্রিমাত্রিক সংযোগের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি অবহেলিত জেলা সরাসরি রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ পায়।
- ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা এই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। তবে ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী সম্পূর্ণ কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
- ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।
- এই মেগা প্রকল্পের আর্থিক ও পরিকাঠামোগত উপযোগিতা বাড়াতে ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ‘পদমা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প’-এর নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মূল সেতুর ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব (সংযোজিত ও সমৃদ্ধ তথ্য):
- জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান: অর্থনীতিবিদ ও জাইকা (JICA)-এর অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু সম্পূর্ণরূপে চালু হলে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক ১.২৬% বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২.৩% বৃদ্ধি পাবে।
- বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের বৈপ্লবিক রূপান্তর: এই সেতু নির্মাণের ফলে মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর সরাসরি ঢাকার সাথে সংযুক্ত হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সরবরাহ চেইনকে (Supply Chain) গতিশীল করেছে। ২১টি জেলায় কলকারখানা স্থাপন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বিকাশ এবং লাখ লাখ মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের এক নতুন আর্থিক করিডোর উন্মোচিত হয়েছে।
৪. ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প (MRT Line-6)
ঢাকার শতাব্দীপ্রাচীন যানজট নিরসন, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে শেখ হাসিনা সরকার ‘ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা মেট্রোরেল প্রকল্প চালু করে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম দ্রুতগতির বৈদ্যুতিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
প্রকল্পের মূল তথ্য ও বাস্তবায়ন রূপরেখা (২০০৯-২০১৮):
- অর্থনৈতিক মডেল: উত্তরা ৩য় পর্ব থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত ২০.১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA) সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৫% সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে এবং বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৫% অর্থায়ন করে।
- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২৬ জুন এই প্রকল্পের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
- ট্রেন চলাচল ও যাত্রীসুবিধা: এই রুটে প্রতিদিন ২৪টি অত্যাধুনিক ট্রেন সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলাচলের পরিকল্পনা করা হয়। প্রতিটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ট্রেনে ৬টি করে বগি থাকবে এবং প্রতি ট্রিপে প্রায় ১,৬৯৬ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।
- রুট অ্যালাইনমেন্ট: উত্তরা তৃতীয় ধাপ – পল্লবী – রোকেয়া সরণি (চন্দ্রিমা উদ্যান, সংসদ ভবন) – খামারবাড়ি – ফার্মগেট – সোনারগাঁও হোটেল – শাহবাগ – টিএসসি – দোয়েল চত্বর – তোপখানা রোড হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক (মতিঝিল) পর্যন্ত।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও আর্থিক সাশ্রয়:
স্বর্ণালী দশকের (২০০৯-২০১৮) পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটিকে তিন ধাপে বিন্যস্ত করা হয়েছিল: ১ম ধাপ (উত্তরা থেকে আগারগাঁও), ২য় ধাপ (আগারগাঁও থেকে মতিঝিল) এবং ৩য় ধাপ (মতিঝিল থেকে কমলাপুর সম্প্রসারণ)। ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ উত্তরার ডিপো এবং প্রথম অংশের ভৌত অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক রিটার্ন (Economic Return): ঢাকা শহরের যানজটের কারণে বছরে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি (প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা) হতো, মেট্রোরেল চালুর মাধ্যমে সেই অপচয় রোধ করার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এটি মানুষের দৈনিক কর্মঘণ্টা বাঁচানো, জ্বালানি তেলের ব্যবহার হ্রাস এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশাল অবদান রাখতে শুরু করে।
৫. মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ
২০১৮ সালের ১২ মে বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৫ মিনিটে মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে দেশের প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহের অধিকারী এলিট ৫৭তম দেশ হিসেবে গৌরবের সাথে আত্মপ্রকাশ করে।
উৎক্ষেপণ, নির্মাণ ও গ্রাউন্ড স্টেশন:
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: উৎক্ষেপণকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’ (SpaceX)-এর অত্যাধুনিক ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটের মাধ্যমে উপগ্রহটি কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চ প্যাড থেকে কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এর আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০১৫ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সের খ্যাতনামা ‘থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস’ কোম্পানির সাথে ২৪৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে স্যাটেলাইটটির নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল।
উপগ্রহটির নির্বিঘ্ন নিয়ন্ত্রণ, ডেটা প্রসেসিং ও পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়—একটি গাজীপুরের জয়দেবপুরে এবং অন্যটি রাঙামাটির বেতবুনিয়ায়।
কক্ষপথ, প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা (সংযোজিত ও সমৃদ্ধ তথ্য):
- কক্ষপথ অধিগ্রহণ: ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ‘ইন্টারস্পুটনিক’ থেকে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ১১৯.১° পূর্ব দ্রাঘিমায় নিজস্ব ‘অরবিটাল স্লট’ (Orbital Slot) চিরস্থায়ীভাবে অধিগ্রহণ করে।
- স্যাটেলাইটটিতে মোট ৪০টি ট্রান্সপোন্ডার রয়েছে (২৬টি Ku-ব্যান্ড এবং ১৪টি C-ব্যান্ড)। এর মধ্যে বাংলাদেশ নিজে ২০টি ট্রান্সপোন্ডার ব্যবহার করছে এবং অবশিষ্ট ২০টি ট্রান্সপোন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেওয়ার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
- বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও রাজস্ব আয়: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পূর্বে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল এবং ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়ার বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে পাঠাতে হতো। এই প্রকল্পের ফলে সেই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সম্পূর্ণ সাশ্রয় হওয়া শুরু হয় এবং নিজস্ব ট্রান্সপোন্ডার আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিকভাবে লিজ দিয়ে বার্ষিক প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার আয়ের নতুন খাত তৈরি হয়।
- সেবার পরিধি ও সামাজিক অর্থনীতি: এই স্যাটেলাইটটি বাংলাদেশ ছাড়াও সামগ্রিক সার্ক (SAARC) ভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার এবং মধ্য এশিয়ার একাংশ কাভার করে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাইরেক্ট-টু-হোম (DTH) ভিডিও সার্ভিস, ই-লার্নিং, টেলি-মেডিসিন এবং দুর্যোগকালীন সময়ে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সচল রাখার এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব সাধিত হয়।

৬. রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভারী শিল্পায়নের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ও সুদূরপ্রসারী মাইলফলক হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant)। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক স্থবিরতা ও আন্তর্জাতিক বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনা সরকারের দৃঢ় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আলো দেখে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শেখ হাসিনার উদ্যোগ (২০০৯-২০১৮):
- প্রারম্ভিক ইতিহাস: ১৯৬১ সালে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ১৯৭০ সালে এই প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-১৯৭৫ মেয়াদে নতুন করে উদ্যোগ নেন, যা তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আবার থমকে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ১৯৯৭-২০০০ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন রূপরেখা প্রস্তাব করেন।
- বাস্তবায়ন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে জি-টু-জি (G2G) ভিত্তিতে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক রাশিয়া সফরে রাষ্ট্রীয় রপ্তানি ঋণ চুক্তি (State Export Credit Agreement) স্বাক্ষরিত হয় এবং ২ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধন করেন। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই মূল নির্মাণ পর্বের জন্য রাশিয়ার সাথে প্রায় ১১.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক ‘স্টেট ক্রেডিট চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।
- পারমাণবিক ক্লাবে প্রবেশ: ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের প্রথম ‘কংক্রিট ঢালাই’ উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক ‘পারমাণবিক ক্লাব’ (Nuclear Club)-এ প্রবেশ করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই দ্বিতীয় ইউনিটেরও কংক্রিট ঢালাই কাজের উদ্বোধন করা হয়।
আর্থিক ও বিদ্যুৎ খাতের সাশ্রয়:
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২টি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কয়লা বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে অনেক কম। ফলে এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার ভিত্তি তৈরি হয়, যা প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে শুরু করে।
৭. ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প
ঢাকার তীব্র যানজট নিরসন এবং দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে বিমানবন্দর ও উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করতে শেখ হাসিনা সরকার দেশের প্রথম ও দীর্ঘতম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মহাপ্রকল্প হাতে নেয়।
প্রকল্পের বিবরণ ও বাস্তবায়ন রূপরেখা (২০০৯-২০১৮):
অর্থনৈতিক মডেল ও নকশা: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত চার লেনের এই মূল এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য ১৯.৭৩ কিলোমিটার। তবে ওঠানামার র্যাম্পসহ এর মোট দৈর্ঘ্য ৪৬.৭৩ কিলোমিটার। প্রায় ১৩,৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের প্রকল্প, যা থাইল্যান্ডের ‘ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড’-এর সাথে যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল এর নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে জমি অধিগ্রহণ ও নকশা জটিলতা কাটিয়ে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এর ভৌত অবকাঠামোর কাজ পুরোদমে শুরু হয়। ২০১৮ সালের মধ্যে বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত প্রথম পর্বের ভৌত অগ্রগতি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সুবিধা :
এই এক্সপ্রেসওয়ের মূল অর্থনৈতিক গুরুত্ব হলো—উত্তরাঞ্চল ও গাজীপুর থেকে আসা ঢাকাগামী এবং চট্টগ্রামগামী পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানগুলো ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাস্তায় না ঢুকে সরাসরি শহরের ওপর দিয়ে পার হয়ে যেতে পারবে। এর ফলে রাজধানী ঢাকার ভেতরের যানজট প্রায় ৩০% কমে যাবে এবং আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিবহন খরচ ও সময় অর্ধেকে নেমে আসবে, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৮. ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (BEZA) প্রতিষ্ঠা
কেবল নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে শিল্পায়ন না করে সারা দেশে সুষম, সমতাভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (Economic Zones) গড়ে তোলার এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করেন।
আইনি কাঠামো ও বর্তমান অগ্রগতি (২০০৯-২০১৮):
- প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর: ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন’ পাসের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ’ (BEZA) গঠন করা হয়। এটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব সংস্থায় রূপান্তরিত হয়।
- ২০১৮ সালের মধ্যে সরকার সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট ৩৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেয় এবং জমি অধিগ্রহণসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চলকে মিলিয়ে প্রায় ৩০,০০০ একর জমিতে গড়ে উঠছে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’।
বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা:
- ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (FDI): এই ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (OSS) সুবিধা নিশ্চিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, জাপান, চীন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলগুলোতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষর করে।
- অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা: এই মেগা পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বার্ষিক অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে এটি দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষের সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে উদ্বৃত্ত জনশক্তিকে উৎপাদনশীল শিল্প খাতে স্থানান্তরিত করার এক বিশাল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।
৯. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল (কর্ণফুলী টানেল)
দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ ও নদী ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী প্রকল্প হলো চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত সড়ক টানেল। এটি বাংলাদেশের তো বটেই, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীর তলদেশের দীর্ঘতম সড়ক টানেল প্রকল্প।
প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য ও আঞ্চলিক সংযোগ (২০০৯-২০১৮):
নকশা ও অর্থায়ন: চার লেনবিশিষ্ট এই টানেলটির মূল দৈর্ঘ্য ৩.৩২ কিলোমিটার এবং দুই পাশের সংযোগ সড়কসহ (Approach Road) এর মোট দৈর্ঘ্য ৯.৩৯ কিলোমিটার। প্রায় ৮,৪৫০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহজ শর্তের ঋণের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়।
বাস্তবায়ন পর্যায়: ২০১৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে এই টানেল নির্মাণের জন্য দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যৌথভাবে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে নদীর তলদেশে বোরিং বা খনন কাজের জন্য বিশালাকার টিবিএম (Tunnel Boring Machine) স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
আর্থিক ও কৌশলগত গুরুত্ব:
‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেল: এই টানেলটি চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ (One City Two Towns) মডেলে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এটি নদীর ওপারে অবস্থিত আনোয়ারা উপজেলাকে সরাসরি মূল শহরের সাথে যুক্ত করেছে।
ব্লু ইকোনমি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডোর: কর্ণফুলী টানেলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এশিয়ান হাইওয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি চালু হলে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং কক্সবাজারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সাথে ঢাকার দূরত্ব ও সময় নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। নদীর পূর্ব প্রান্তে নতুন শিল্পকারখানা, গভীর সমুদ্র বন্দর এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী গতি সঞ্চার করেছে।

১০. অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (MFS) বৈপ্লবিক বিকাশ
২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনা সরকার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন’ (Inclusive Financing) নীতি গ্রহণ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রথাগত আর্থিক কাঠামোর আওতায় আনা।
- মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS): ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সিং নীতিমালার অধীনে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু হয়। বিকাশ (bKash), রকেট (Rocket) এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, দিনমজুর ও প্রান্তিক কৃষক মুহূর্তের মধ্যে অর্থ লেনদেনের সুবিধা পান।
- লেনদেনের রেকর্ড ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি: ২০০৯ সালে যেখানে দেশের মাত্র ২০% মানুষের আনুষ্ঠানিক আর্থিক অ্যাকাউন্ট ছিল, ২০১৮ সাল নাগাদ মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কল্যাণে তা ৫০% এর বেশি জনগোষ্ঠীতে উন্নীত হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দৈনিক মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের পরিমাণ ১,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের তারল্য (Liquidity) ও গতিশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
- ১০ টাকার কৃষক অ্যাকাউন্ট: দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে মাত্র ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দেয় সরকার। এর মাধ্যমে প্রায় এক কোটিরও বেশি কৃষক সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি কৃষি ভর্তুকি ও প্রণোদনার টাকা পেতে শুরু করেন, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আর্থিক খাতের দুর্নীতি সম্পূর্ণ দূর করে।
১১. ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন
ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের অংশ হিসেবে প্রথাগত ব্যাংকিং খাতকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এই এক দশকে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু যুগান্তকারী সংস্কার সম্পন্ন করে।
- অনলাইন ও রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম: এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেনের জন্য সরকার ‘বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক’ (BEFTN) এবং ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ’ (NPSB) চালু করে। এর ফলে চেক ক্লিয়ারিংয়ের সময় কয়েক দিন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় নেমে আসে।
- RTGS-এর প্রবর্তন: ২০১৫ সালে চালু হয় ‘রিয়েল টাইম গ্রস সেটলমেন্ট’ (RTGS) ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বড় অঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় গতি আনয়ন করে।
- তৃণমূলে এজেন্ট ব্যাংকিং: ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘এজেণ্ট ব্যাংকিং’ নীতিমালা জারি করে। যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের স্থায়ী শাখা খোলা লাভজনক ছিল না, সেখানে এজেন্টদের মাধ্যমে জমার খাতা খোলা, ঋণ বিতরণ এবং রেমিট্যান্সের টাকা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৮ সালের মধ্যে এটি গ্রামীণ সঞ্চয়কে জাতীয় পুঁজিতে রূপান্তরের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়।
১২. রাজস্ব খাত (NBR) ও কর কাঠামোর ডিজিটাল রূপান্তর
মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন এবং স্বনির্ভর বাজেট প্রণয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বা ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এই ১০ বছরে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে।
- ই-টিআইএন (e-TIN) ও অনলাইন রিটার্ন: ২০১৩ সালে সনাতন কর শনাক্তকরণ নম্বরের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘ই-টিআইএন’ (e-TIN) ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে করদাতার সংখ্যা কয়েক লাখ থেকে দ্রুত ৩০ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করে। একই সাথে ঘরে বসে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সুবিধা চালু করা হয়।
- ভ্যাট আইন ও অটোমেশন: ২০১২ সালে নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন’ পাস করা হয়, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা আনতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (EFD) বা সেলস ডেটা কন্ট্রোলার (SDC) বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
- রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি: ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫২,৫২৭ কোটি টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের কর বান্ধব নীতি ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রায় ২,০৬,৪০৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়, যা দেশের ইতিহাসে প্রায় ৪০০% প্রবৃদ্ধি।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের এই এক দশক ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার অবিনশ্বর অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সাহসিকতার কারণে বাংলাদেশ কেবল বিশ্বব্যাংকের ঋণ জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নই করেনি, বরং সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে এক অভূতপূর্ব স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।
মাথাপিছু আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের রেকর্ড সৃষ্টি, মহাকাশ ও পারমাণবিক ক্লাবে দেশের গৌরবময় পদচারণা এবং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দেওয়ার মাধ্যমে এই ১০ বছরেই মূলত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এই স্বর্ণালী দশকের সুপরিকল্পিত রূপরেখাই আজ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
