সঙ্গীতের প্রাণ হলো স্বর। স্বর ছাড়া সঙ্গীত কল্পনাই করা যায় না। যেমন বর্ণ দিয়ে ভাষা গঠিত হয়, তেমনি স্বর দিয়েই গঠিত হয় সঙ্গীতের ভাষা। তাই অনেক সঙ্গীতজ্ঞ স্বরকে সঙ্গীতের প্রধান বর্ণ বা ধ্বনি-অক্ষর বলেও অভিহিত করেন। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ প্রকৃতির নানা শব্দ—বাতাসের মৃদু সোঁ সোঁ আওয়াজ, নদীর কলকল ধ্বনি, কিংবা পাখির ডাক—অনুকরণ করে সুর সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। এই অনুকরণের মধ্য দিয়েই সঙ্গীতের প্রাথমিক ধারণা গড়ে ওঠে।

সঙ্গীতের স্বর বা সুর
প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে একটি প্রচলিত কাহিনি আছে—প্রথম স্বরগুলোর জন্ম নাকি হয়েছিল প্রকৃতির বিভিন্ন জীবের কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে। সাতটি প্রাণীর ডাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সৃষ্টি হয় সাতটি মূল স্বর। ময়ূরের ডাক থেকে এসেছে “সা”, বৃষ বা ষাঁড়ের ডাক থেকে “রে”, ছাগলের ডাক থেকে “গা”, বকের স্বর থেকে “মা”, কোকিলের মধুর কণ্ঠ থেকে “পা”, ঘোড়ার শব্দ থেকে “ধা”, আর হাতির গভীর ডাক থেকে এসেছে “নি”। যদিও এটি একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা, তবে এর মাধ্যমে বোঝা যায়—প্রকৃতি থেকেই মানুষের সঙ্গীতবোধের উৎস।

প্রথমদিকে এই সাতটি স্বরই ছিল সঙ্গীতের ভিত্তি। পরে এর সঙ্গে আরও পাঁচটি উপস্বর বা পরিবর্তিত স্বর যুক্ত হয়। এইভাবে মোট বারোটি স্বরের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ভারতীয় সঙ্গীতের মূল স্বরব্যবস্থা। এই বারোটি স্বরের নানা বিন্যাস ও মিশ্রণ থেকে জন্ম নেয় রাগ—যা সঙ্গীতের আবেগ, রঙ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। “রাগ” শব্দটির মূল অর্থই হলো রঞ্জন করা বা মনকে রাঙিয়ে তোলা। অর্থাৎ রাগ এমন এক সুরবিন্যাস, যা মানুষের হৃদয়ে বিশেষ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

প্রাচীন ভারতীয় সঙ্গীততত্ত্বে বলা হয়, মূলত ছয়টি প্রধান রাগ ছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, মহাদেব শিবের মুখ থেকে সৃষ্টি হয় পাঁচটি রাগ—শ্রী, বসন্ত, ভৈরব, পঞ্চম ও মেঘ। আর দেবী পার্বতীর মুখ থেকে জন্ম নেয় আরেকটি রাগ—নট-নারায়ণ। যদিও আধুনিক সঙ্গীততত্ত্বে রাগের সংখ্যা অনেক বেশি, তবুও এই পৌরাণিক ধারণা ভারতীয় সঙ্গীতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো শ্রুতি। সাধারণভাবে বলা যায়, শ্রুতি হলো সেই সূক্ষ্ম ধ্বনি বা ক্ষুদ্রতম স্বরভাগ, যা মানুষের কানে আলাদা করে ধরা যায়। প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে মোট ২২টি শ্রুতির কথা বলা হয়েছে। এই ২২টি সূক্ষ্ম শ্রুতির মধ্য থেকে ১২টি প্রধান শ্রুতি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়—এগুলোকেই আমরা স্বর বলে জানি। এই ১২টি স্বরের সাহায্যেই প্রায় সব সঙ্গীতধ্বনির প্রতিনিধিত্ব করা যায়।
এই ১২টি স্বরের মধ্যে ৭টি হলো শুদ্ধ স্বর। এগুলোকে সঙ্গীতের মূল বা প্রাকৃতিক স্বর বলা হয়। বাকি ৫টি স্বরকে বলা হয় বিকৃত স্বর। “বিকৃত” শব্দটি শুনতে কিছুটা কঠোর মনে হলেও বাস্তবে এগুলোও অত্যন্ত মধুর ও গুরুত্বপূর্ণ সুর। এই পাঁচটি বিকৃত স্বরের মধ্যে চারটি কোমল স্বর এবং একটি তীব্র বা কড়ি স্বর। বিকৃত স্বরগুলো সাধারণত পাশের শুদ্ধ স্বরের একটু নিচে বা একটু ওপরে অবস্থান করে।
ভারতীয় সঙ্গীতের বারোটি স্বর হলো—
১. ষড়জ (সা) – এটিকে সঙ্গীতের ভিত্তি স্বর বলা হয়। কেউ কেউ একে খারাজ বা খাড়াজ নামেও উল্লেখ করেন।
২. ঋষভ (রে) – এটিকে কখনো রিখাব বা রেখাব বলেও ডাকা হয়।
৩. কোমল ঋষভ – সংক্ষেপে প্রকাশ করা হয় বিশেষ চিহ্নে বা ‘কোমল রে’ হিসেবে।
৪. গান্ধার (গা)
৫. কোমল গান্ধার
৬. মধ্যম (মা)
৭. তীব্র মধ্যম বা কড়ি মা
৮. পঞ্চম (পা)
৯. ধৈবত (ধা)
১০. কোমল ধৈবত
১১. নিষাদ (নি) – কখনো একে নিখাদ বলেও উল্লেখ করা হয়।
১২. কোমল নিষাদ
গান গাওয়ার সময় সাধারণত এই স্বরগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ—সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি—এইভাবেই ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সঙ্গীততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখির সময় স্বরগুলোর পূর্ণ নাম ব্যবহার করা হয়। তাই একজন সঙ্গীতশিক্ষার্থী বা সঙ্গীতপ্রেমীর জন্য এই নামগুলো জানা ও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বরই সঙ্গীতের প্রাণ, ভিত্তি এবং ভাষা। স্বরের সূক্ষ্ম ওঠানামা, তার বিন্যাস ও সম্পর্ক থেকেই জন্ম নেয় রাগ, তাল ও সঙ্গীতের অসীম সৌন্দর্য। প্রকৃতপক্ষে সঙ্গীতের জগৎ এক বিশাল সুরলোক—আর সেই সুরলোকের প্রথম দরজা খুলে যায় স্বরের মধ্য দিয়েই।
আরও দেখুন:
