উর্দু শায়েরির ইতিহাসে সাগর সিদ্দিকী এক তীব্র হাহাকার, এক পরম রহস্যের নাম। যেখানে দাগ দেহেলভি বা আহমাদ ফারাজরা রাজদরবার, আভিজাত্য কিংবা ড্রয়িংরুমের মোহময় আলোয় জীবন কাটিয়েছেন, সাগর সিদ্দিকী সেখানে ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম—এক যাযাবর, গৃহহীন ‘মালং’ বা দরবেশ। ১৯২৮ সালে ভারতের আম্বালায় জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা কবির আসল নাম ছিল মুহম্মদ আখতার। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি অমৃতসর থেকে পাকিস্তানের লাহোরে চলে আসেন। তরুণ বয়সে তাঁর সুদর্শন চেহারা, গহীন চোখ আর অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর কণ্ঠের কারণে লাহোরের সাহিত্যিক মহলে তিনি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই সময় তাঁর একেকটি কবিতা শোনার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত।
সাগর সিদ্দিকী
সাগর সিদ্দিকীর গজলের সাথেও পরিচয় হয়েছিল মেহেদি হাসান খান সাহেবের গাওয়া “চেরাগ এ তুর” গজলটি শুনে। আনাদের জন্যও গজলটি অনুবাদ করে দিলাম:
charāġh-e-tūr jalāo baḌā añdherā hai /
zarā naqāb uThāo baḌā añdherā haiবাংলা: তূর পর্বতের সেই ঐশ্বরিক প্রদীপটি জ্বালো, চারদিকে বড্ড অন্ধকার! /
তোমার মুখের পর্দাটি অন্তত একটু তোলো, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
abhī to sub.h ke māthe kā rang kaalā hai /
abhī fareb na khaao baḌā añdherā haiবাংলা: ভোরের কপালে এখনও কালচে রঙের ছায়া (ভোর হলেও আলো ফোটেনি) /
এখনই ধোঁকা খেয়ো না, চারদিকে এখনও বড্ড অন্ধকার!
vo jin ke hote haiñ ḳhurshīd āstīnoñ meñ /
unheñ kahīñ se bulāo baḌā añdherā haiবাংলা: যাদের আস্তিনের (হাতার) ভেতরে জ্বলজ্বলে সূর্য লুকিয়ে থাকে (যারা আলোর দিশারী) /
তাদের যেকোনো স্থান থেকে ডেকে নিয়ে এসো, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
mujhe tumhārī nigāhoñ pe e’timād nahīñ /
mire qarīb na aao baḌā añdherā haiবাংলা: তোমার ওই চোখের চাউনির ওপর আমার আর কোনো ভরসা নেই /
আমার আর কাছে এসো না, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
farāz-e-‘arsh se TuuTā huā koī taara /
kahīñ se DhūñD ke laao baḌā añdherā haiবাংলা: আরশের (পরম উচ্চতা) ওপর থেকে ভেঙে পড়া কোনো উজ্জ্বল তারা /
কোথাও থেকে খুঁজে নিয়ে এসো, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
basīratoñ pe ujāloñ kā ḳhauf taarī hai /
mujhe yaqīn dilāo baḌā añdherā haiবাংলা: মানুষের অন্তর্দৃষ্টির ওপর এখন আলোর ভয় চেপে বসেছে (মানুষ সত্য দেখতে ভয় পাচ্ছে) /
তুমি অন্তত আমাকে বিশ্বাস করাও যে চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
jise zabān-e-ḳhirad meñ sharāb kahte haiñ /
vo raushnī sī pilāo baḌā añdherā haiবাংলা: বুদ্ধিমান ও জ্ঞানীদের ভাষায় যে জিনিসকে ‘মদ’ বা সুধা বলা হয় /
সেই তরল আলোর সুধা আমাকে কিছুটা পান করাও, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!
ba-nām-e-zohra-jabīnān-e-ḳhitta-e-firdaus /
kisī kiran ko jagāo baḌā añdherā haiবাংলা: স্বর্গের সেই উজ্জ্বল কপাল বা রূপবতী হুরদের নামে হলেও /
আলোর কোনো একটি কিরণ বা রশ্মিকে জাগিয়ে তোলো, চারদিকে বড্ড অন্ধকার!

নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে এই তীব্র জনপ্রিয়তা টেকেনি। এক গভীর মানসিক আঘাত, একাকিত্ব আর তীব্র উদাসীনতা তাঁকে ঠেলে দেয় এক অন্ধকার জগতের দিকে। সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন এবং লাহোরের ফুটপাতকে বানিয়ে নেন নিজের স্থায়ী ঠিকানা। তাঁর পরনে থাকত ছেঁড়া ধূলিধূসরিত পোশাক, উষ্কখুষ্ক চুল, আর পায়ে থাকত না কোনো জুতো। শীতের রাতে তীব্র কুয়াশার মধ্যে লাহোরের দাতা দরবার কিংবা ফুটপাতে শুধু একটা চাদর মুড়ি দিয়ে তিনি শুয়ে থাকতেন। মানুষ তাঁকে পাগল ভাবত, কিন্তু সেই পাগলামির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অতি সংবেদনশীল দার্শনিক মন।
সাগরের কবিতা লেখার ধরন ছিল অলৌকিক। তাঁর কোনো খাতা বা কলম ছিল না। তিনি রাস্তার পাশে বসে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজের টুকরো, সিগারেটের খালি প্যাকেট কিংবা চায়ের দোকানের পচা কাগজের ওপর কয়লা বা ভাঙা পেনসিল দিয়ে কালজয়ী সব শের লিখতেন। সেই শেরগুলোর সাহিত্যমূল্য এত বেশি ছিল যে, সমসাময়িক অনেক নামী-দামী কবি তাঁর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে, কখনো বা এক কাপ চা কিংবা এক টুকরো রুটির বিনিময়ে সেই কবিতাগুলো কিনে নিজেদের নামে প্রকাশ করতেন। সাগর সিদ্দিকী জানতেন তাঁর সৃষ্টি চুরি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু জাগতিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকা এই দরবেশের তাতে কিছুই যেত আসত না।

তাঁর জীবনের শেষদিকের দিনগুলো ছিল আরও বেদনাবিধুর। তীব্র একাকিত্ব আর যন্ত্রণা ভুলে থাকার জন্য তিনি মরফিনের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত এক বিশ্বস্ত রাস্তার কুকুরই ছিল তাঁর একমাত্র সঙ্গী, যে তাঁর তীব্র শীতের রাতে গা ঘেঁষে বসে উষ্ণতা দিত। ১৯৭৪ সালের ১৯ জুলাই, মাত্র ৪৬ বছর বয়সে লাহোরের এক রাস্তার ফুটপাতে এই মহান কবির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মৃত্যুর পর তাঁর পকেট থেকে পাওয়া যায় তাঁর জীবনের শেষ শের, যেখানে লেখা ছিল যে মানুষ তাঁকে মৃত ভেবে কাঁদছে, সেই মানুষই তাঁকে বেঁচে থাকতে এক ফোঁটা জল দেয়নি।
আজ সাগর সিদ্দিকী লাহোরের মিয়ানি সাহেব কবরস্থানে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন। বেঁচে থাকতে যিনি এক টুকরো ছাদ পাননি, মৃত্যুর পর তাঁর কবরের ওপর আজ এক চমৎকার মাজার তৈরি হয়েছে। উর্দু সাহিত্য আজ তাঁকে মীর তকী মীর-এর পর সবচেয়ে বড় ‘বেদনার কবি’ (Shair-e-Gham) বলে স্বীকার করে। রাজপ্রাসাদের কবিরা যেখানে হারিয়ে গেছেন, ফুটপাতের এই রাজা সাগর সিদ্দিকী তাঁর ভাঙা কলমে লেখা প্রতিটি ছত্রে আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।
আসুন দেখা যাক তার কিছু সৃষ্টি:
১.
اردو: چراغِ طور بجھا دو کہ چاند نکلے گا نقاب رخ سے اٹھا دو کہ چاند نکلے گا Roman: Chiragh-e-toor bujha do ke chand niklega / Naqab rukh se utha do ke chand niklega বাংলা : তূর পর্বতের ঐশ্বরিক আলো নিভিয়ে দাও, কারণ এখন আসল চাঁদ উঠবে! / তোমার মুখ থেকে পর্দা সরিয়ে নাও, দেখবে আকাশেরই পূর্ণিমার চাঁদ লজ্জা পাবে!
২.
اردو: بکے جو ہم تو خریدار بن کے آ گئے وہ جنہیں ہم اپنی محبت کا راز کہتے تھے Roman: Bike jo hum to khareedaar ban ke aa gaye woh / Jinhein hum apni mohabbat ka raaz kehte the বাংলা : আমি যখন নিলামে উঠলাম (বিক্রি হতে গেলাম), তখন তারাই ক্রেতা হয়ে সামনে এলো— / যাদেরকে একসময় আমি আমার ভালোবাসার পরম বিশ্বাসী ভাবতাম!
৩.
اردو: ہم نے تاریخ کے چہرے پہ سدا رنگ بھرا وقت نے ہم کو سدا خاک اڑانے کو دیا Roman: Hum ne tareekh ke chehre pe sada rang bhara / Waqt ne hum ko sada khaak udaane ko diya বাংলা : আমি ইতিহাসের মুখে সারাজীবন সুন্দর রঙ মেখে সাজিয়েছি! / আর সময় (নিয়তি) চিরকাল আমাকে শুধু ধুলো ওড়ানোর একাকীত্ব উপহার দিয়েছে।
৪.
اردو: سجدے کیے ہیں ہم نے چٹانوں کی اوٹ میں پتھر بنا دیا ہے ہمیں بندگی نے آج Roman: Sajde kiye hain hum ne chataanon ki oat mein / Patthar bana diya hai humein bandagee ne aaj বাংলা : পাহাড়ের আড়ালে পাথরে মাথা ঠুকে আমি আজীবন সিজদা করেছি! / প্রভুর প্রতি এই অন্ধ ভক্তি আর আত্মসমর্পণ আজ আমাকেও একখণ্ড পাথর বানিয়ে ছেড়েছে।
৫.
اردو: یہ دورِ بے حسی ہے یہاں ہر کوئی اکیلا ہے کوئی کسی کا نہیں ہے یہاں سب کا تماشہ ہے Roman: Yeh daur-e-be-hisi hai yahan har koi akela hai / Koi kisi ka nahin hai yahan sab ka tamasha hai বাংলা : এটি এক চরম অসংবেদনশীল ও নিষ্ঠুর যুগ, এখানে সবাই বড্ড একা! / এখানে কেউ আসলে কারও নয়, প্রত্যেকে কেবল অন্যের জীবনের তামাশা দেখতে ব্যস্ত।
৬.
اردو: چراغِ رہ گزر ہوں میں نہ کوئی ہم سفر میرا نہ کوئی میرا گھر بار ہے نہ کوئی در میرا Roman: Chiragh-e-rahguzar hoon main na koi hum-safar mera / Na koi mera ghar-baar hai na koi dar mera বাংলা : আমি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এক অবহেলিত প্রদীপ, আমার কোনো সহযাত্রী নেই! / না আছে আমার কোনো ঘরবাড়ি, আর না আছে মাথা গোঁজার কোনো আপন দুয়ার। (সাগর সিদ্দিকীর জীবনের সবচেয়ে নিখুঁত প্রতিচ্ছবি এই শের)
৭.
اردو: درد کی رات کٹ گئی لیکن صبح کا نور بجھ گیا جیسے Roman: Dard ki raat kat gayi lekin / Subh ka noor bujh gaya jaise বাংলা : ব্যথার রাত তো কোনোমতে কেটে গেল ঠিকই, কিন্তু / মনে হচ্ছে ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবনের সমস্ত আলো যেন চিরতরে নিভে গেল!
৮.
اردو: وہ چاندنی کا بدن ہو یا دھوپ کا چہرہ سدا رہے گا جہاں میں مِرا نشاں تنہا Roman: Woh chaandni ka بدن ہو یا دھوپ کا چہرہ /固定 سدا رہے گا جہاں میں مِرا نشاں تنہا বাংলা : তা স্নিগ্ধ চাঁদের আলোর শরীর হোক কিংবা সূর্যের প্রখর রোদ— / এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আমার এই একাকীত্বের অস্তিত্ব চিরকাল একা হয়েই রয়ে যাবে!
৯.
اردو: کوئی سمجھے تو ایک بات کہوں عشق توفیق ہے گناہ نہیں
Roman: Koi samjhe to ek baat kahoon / Ishq taufiq hai gunaah nahin
বাংলা : যদি কেউ বোঝার ক্ষমতা রাখে তবে একটি কথা বলি— / ভালোবাসা বা প্রেম হলো স্রষ্টার দেওয়া এক পরম উপহার (তৌফিক), এটি কোনো পাপ নয়!
১০.
اردو: دنیا نے مجھ کو چھوڑ دیا تنہا چھوڑ دیا میں نے بھی تو دنیا کو ٹھکرا دیا تھا
Roman: Duniya ne mujh ko chhod diya tanha chhod diya / Main ne bhi to duniya ko thukra diya tha
বাংলা: দুনিয়া আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, একা ফেলে চলে গেছে তো কী হয়েছে? / আমিও তো এই স্বার্থপর দুনিয়াকে অনেক আগেই তুচ্ছ করে লাথি মেরেছিলাম!
আরও দেখুন
