যদি কখনো কোনো অলস নিস্তব্ধ দুপুরে তাঁর ‘ফাসানা-ই-জোশ’-এর জরাজীর্ণ চরিত্রগুলোর মুখোমুখি হন, কিংবা সমাজের অন্ধ সংস্কার ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর সানিত ব্যঙ্গাত্মক সংলাপগুলো পড়েন—তবে আপনি অনুধাবন করতে পারবেন বিশ শতকের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে কেমন করে একজন লেখক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের নড়বড়ে দেয়ালগুলোকে নাড়া দিয়েছিলেন। বিধাতা সুলতান হায়দার জোশকে আয়ু দিয়েছিলেন প্রায় ৬৭ বছর (১৮৮৬ – ১৯৫৩)। সেই সাড়ে ছয় দশকের জীবনে তিনি খুব বেশি হট্টগোল বা বিজ্ঞাপন করেননি; কিন্তু নিরবে-নিভৃতে উর্দু আফসানার গায়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সংস্কারের যে বীজ বুনে গিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে পুরো উপমহাদেশীয় কথাসাহিত্যের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
প্রেমচন্দ বা মান্টোর উদ্দাম বাস্তবতাবাদ যখন বাংলা ও উর্দু সাহিত্যকে কাঁপিয়ে দিতে শুরু করেনি, ঠিক সেই প্রাক-প্রগতিশীল যুগে যে ক’জন হাতে গোনা তরুণ আফসানাকে সস্তা রোমান্স ও অলৌকিক কিসসা-কাহিনীর খোলস থেকে বের করে নিরেট সামাজিক দায়িত্বের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, সুলতান হায়দার জোশ ছিলেন তাঁদের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী। সমাজপতি ও মোল্লাতন্ত্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলার অনন্য এক পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি।
আজ উর্দু সাহিত্যের এই নিভৃতচারী সংস্কারক ও রূপকারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর সাহিত্যিক ঋণের কথা স্মরণ করে আমাদের এই নিবেদন।
সুলতান হায়দার জোশ
“Humari tehrir tab tak be-maani hai jab tak yeh humare samaj ki buraiyon ko nanga na kare… Adab sirf dil behlane ka khilona nahi, yeh toh qaum ko uske tareek kone dikhane ka ek charag hai.”
উর্দু আফসানার সামাজিক সংস্কারমূলক ধারার এই আদি পুরুষের প্রাঞ্জল কথার বাংলা ভাবান্তর করলে দাঁড়ায়—
“আমাদের লেখালেখি ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থহীন, যতক্ষণ না তা সমাজের ভেতরের অন্ধতা ও কুসংস্কারকে সবার সামনে উন্মোচিত করে… সাহিত্য কেবল মন ভোলানোর কোনো সস্তা খেলনা নয়; সাহিত্য হলো জাতিকে তার নিজের ভেতরের অন্ধকার গলিপথগুলো চিনিয়ে দেওয়ার এক অবিনাশী প্রদীপ।”
আজ থেকে একশত বছর আগে, যখন সমাজে প্রথা ও ধর্মীয় কুসংস্কারের রাজত্ব ছিল চরম চূড়ায়, তখন সাহিত্যকে সমাজ-শোধনের মশাল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন সুলতান হায়দার জোশ। কোনো রকম অতিরিক্ত আড়ম্বর বা গালভরা বুলি ছাড়া, অতি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অসংগতিগুলোকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর লেখার ক্যানভাসে।
জোশের ছেলেবেলা ও আলিগড় চেতনা
১৮৮৬ সালে উত্তরপ্রদেশের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে সুলতান হায়দার জোশের জন্ম। তৎকালীন সমাজ যখন একপাশে প্রাচীন মধ্যযুগীয় অন্ধতা আর অন্যপাশে পশ্চিমা আধুনিকতার অভিঘাতে দুলছিল, ঠিক সেই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে জোশের বেড়ে ওঠা।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন আলিগড় এম.এ.ও কলেজে (পরবর্তীতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়)। স্যার সৈয়দ আহমেদের আলিগড় আন্দোলন ও আধুনিক শিক্ষার বাতাবরণ তরুণ জোশের মনোজগতে এক বিরাট তোলপাড় সৃষ্টি করে। তিনি উপলব্ধি করেন, শিক্ষা ও মানসিক সংস্কার ছাড়া কোনো জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। আলিগড়ের এই যুক্তিবাদী ও সংস্কারমুখী দর্শনই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যজীবনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
সামাজিক সংস্কার ও নারী মুক্তির সংগ্রাম
সুলতান হায়দার জোশ সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন এমন এক সময়ে যখন উর্দু গদ্যে রূপকথা, কাল্পনিক প্রেম আর আভিজাত্যের বর্ণনা ছিল প্রধান বিষয়বস্তু। কিন্তু জোশ সেই রূপকথার মায়াজাল ছিন্ন করে সোজা নজর দিলেন তৎকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের অন্তরমহলে।
তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন:
- কুসংস্কারের নামে নারীদের চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি করে রাখার মানসিকতা।
- অশিক্ষা, যৌথ পরিবারের জটিলতা এবং মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়ার প্রথা।
- ধর্মীয় ব্যবসায়ী ও সমাজপতিদের ভণ্ডামি এবং ভণ্ড দরবেশদের অন্ধ অনুসরণ।
জোশ তাঁর গল্পগুলোতে দেখালেন, ধর্ম বা সামাজিক প্রথার অজুহাতে কীভাবে একজন মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে রাখা হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং সমাজে মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার পক্ষে তাঁর কলম ছিল চিরকাল সোচ্চার।
জোশের গল্প: ‘ফাসানা-ই-জোশ’ ও ক্ষয়িষ্ণু সমাজের প্রতিচ্ছবি
‘ফাসানা-ই-জোশ’ (Fasāna-e-Josh):
এই সংকলনের গল্পগুলোতে জোশ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ অথচ মার্জিত রসিকতার সাথে সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। এতে রয়েছে ভণ্ড মোল্লাদের ছদ্মবেশী রূপ, যৌতুক প্রথার নির্মমতা এবং অবরুদ্ধ নারী জীবনের হাহাকার। গল্পের প্রতিটি চরিত্রের সংলাপে তিনি তৎকালীন সমাজের কৃত্রিম আভিজাত্যকে মৃদু চাবুক মেরেছেন।
‘ভাবী’ (Bhabhi) ও সামাজিক বাস্তবতা:
ব্যঙ্গাত্মক রম্য ও গল্পরীতি:
প্রগতিশীল আন্দোলনের সোপান ও উত্তরাধিকার
পরবর্তীকালে ১৯৩০-এর দশকে প্রগতিশীল লেখক সংঘ (Progressive Writers’ Movement) যে সুনির্দিষ্ট ও তীব্র সামাজিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিল, তার গোড়াপত্তন কিন্তু সুলতান হায়দার জোশের মতো লেখকদের হাতেই হয়েছিল। তিনি হয়তো পরবর্তী যুগের লেখকদের মতো এত উগ্র বা রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার ছিলেন না, কিন্তু সমাজের ঘুণে ধরা কাঠামোর ওপর প্রথম আঘাতটা কিন্তু তিনিই হেনেছিলেন।
প্রেমচন্দ যে বাস্তবতাবাদের চর্চা করে মহীরুহ হয়েছিলেন, তার ঠিক আগের ধাপে দাঁড়িয়ে জোশ ছিলেন সেই উর্বর মাটির কাণ্ডারী—যিনি উর্দু আফসানায় বাস্তবতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
১৯৫৩ সালে এই নিরহংকার ও প্রজ্ঞাবান সাহিত্যিক চিরতরে বিদায় নেন। মৃত্যুর পর মিডিয়া বা সাহিত্যিক আড্ডায় তাঁকে নিয়ে হয়তো কোনো বিপুল কোলাহল তৈরি হয়নি, কিন্তু ইতিহাস জানে—উর্দু ছোটগল্পকে সমাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মূল ঋণটি সুলতান হায়দার জোশের কাছেই জমা আছে।
জোশের প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়
আজ সুলতান হায়দার জোশের প্রয়াণের এত বছর পরও আমাদের সমাজ থেকে কুসংস্কার, ধর্মীয় অন্ধতা আর নারী নির্যাতনের মতো ব্যাধিগুলো পুরোপুরি মুছে যায়নি। ফলে জোশের সেই একশত বছর আগের লেখাগুলো আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক এবং এক জীবন্ত আয়না সমতুল্য।
