স্কটিশ পিবারচ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের কথা ভাবলেই আমাদের কানে ভেসে আসে গ্রেট হাইল্যান্ড ব্যাগপাইপের তীব্র ও চড়া সুর। তবে এই বাদ্যযন্ত্রটির খোলসের ভেতরেই লুকিয়ে আছে স্কটিশ সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রাচীন, ধ্রুপদী এবং তাত্ত্বিক একটি ধারা, যাকে ঐতিহ্যের ভাষায় বলা হয় ‘পিবারচ’ (Piobaireachd)। গ্যালিক ভাষায় এর আক্ষরিক অর্থ ব্যাগপাইপ বাজানোর শিল্প হলেও, স্কটল্যান্ডের সুরজগতে একে অত্যন্ত সম্মানের সাথে ‘বিগ মিউজিক’ বা মহৎ সঙ্গীত বলা হয়। সাধারণ স্কটিশ লোকগীতি বা নাচের দ্রুতগতির সুরের চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। পিবারচ হলো ব্যাগপাইপের একক পরিবেশনার এমন এক ধ্রুপদী রূপ, যা স্কটল্যান্ডের ইতিহাস, যুদ্ধ, শোক এবং ক্ল্যান বা গোত্রীয় আভিজাত্যকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুরের সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

এই বিশেষ সাঙ্গীতিক ধারার গভীরে প্রবেশ করলে স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ড অঞ্চলের প্রাচীন সমাজব্যবস্থার এক নিখুঁত ছবি চোখে পড়ে। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত হাইল্যান্ডের প্রতিটি বড় গোত্র বা ক্ল্যানের নিজস্ব ব্যাগপাইপ বাদক থাকতেন, যাঁদের সমাজে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হতো। পিবারচ মূলত কোনো সাধারণ বিনোদনের গান ছিল না। কোনো যুদ্ধজয়ের বীরগাথা বর্ণনা করতে, কোনো মহান নেতার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করতে (যাকে বলা হতো ল্যামেন্ট), কিংবা কোনো দুর্গের ভেতরের আনুষ্ঠানিকতায় এই গম্ভীর সুর বাজানো হতো। এর একেকটি সুর পরিবেশন করতে প্রায় দশ থেকে বিশ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে, যা শ্রোতাকে এক ধরণের অপার্থিব, ধীর এবং ধ্যানমগ্ন আবহাওয়ায় নিয়ে যায়।

কারিগরি এবং সুরের গঠনের দিক থেকে পিবারচ অত্যন্ত সুসংহত এবং জটিল একটি গণিত মেনে চলে। এই সঙ্গীতের পুরো কাঠামোটি একটি থিম এবং তার নানাবিধ সাঙ্গীতিক পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হয়। পরিবেশনার একদম শুরুতে বাদক অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট ছন্দ বা তাল ছাড়া মূল সুরটি বাজান, যাকে বলা হয় ‘উর্লার’ বা মাটির সুর। এই প্রথম পর্বটি শোনার সময় মনে হয় যেন পাহাড়ি কুয়াশার বুক চিরে এক প্রাচীন হাহাকার ভেসে আসছে। এরপর সুরটি ধীরে ধীরে জটিল হতে শুরু করে। বাদক মূল সুরের নোটগুলোর মাঝখানে আঙুলের নিখুঁত কসরতে অত্যন্ত দ্রুত কিছু অলঙ্করণ বা গিটকিরি যোগ করেন, যাকে এই ঘরানায় বলা হয় ‘গ্রাসিং’। এরপর সুরটি ধাপে ধাপে আরও দ্রুতগতির এবং জটিল বিন্যাসে প্রবেশ করে, যার চূড়ান্ত পর্বকে বলা হয় ‘ক্রাউনলুয়াথ’। এই পর্বে এসে সুরের গতি আর আঙুলের গতি এক অবিশ্বাস্য জ্যামিতিক রূপ নেয় এবং সবশেষে সুরটি আবার তার শুরুর সেই শান্ত ও ধীরগতির ‘উর্লার’ বা মাটির সুরে ফিরে এসে শেষ হয়।

পিবারচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং হিউম্যান দিকটি হলো এর প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্কটল্যান্ডে এই সুর শেখানোর জন্য কোনো লিখিত স্বরলিপি বা নোটেশনের অস্তিত্ব ছিল না। এর বদলে ওস্তাদ বা পাইপ-মেজররা শিষ্যদের এই জটিল সুর শেখাতেন ‘ক্যানটাক’ (Canntaireachd) নামের এক অনন্য মৌখিক অক্ষরের মাধ্যমে। এটি মূলত এক ধরণের সাঙ্গীতিক ভাষা, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু সিলেবল বা উচ্চারণ দিয়ে ব্যাগপাইপের নোট এবং তার জটিল অলঙ্করণগুলোকে মুখে গেয়ে শোনানো হতো। শিষ্যরা বছরের পর বছর ধরে গুরুর মুখ থেকে সেই অদ্ভুত ধ্বনি শুনে শুনে পুরো বিশ মিনিটের সুর হুবহু নিজের স্মৃতিতে গেঁথে নিতেন। ওস্তাদের ফুসফুসের দম আর শিষ্যের কানের একাগ্রতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই পিবারচ টিকে ছিল।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঐতিহাসিক কুলোডেনের যুদ্ধের পর যখন ব্রিটিশ রাজশক্তি স্কটিশ হাইল্যান্ডের সংস্কৃতি, পোশাক এবং পাইপ বাজানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তখন পিবারচ প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল। তবে পরবর্তীকালে স্কটিশ সুর সংগ্রাহকদের একাগ্রতা এবং মৌখিক ঐতিহ্যকে লিখিত রূপ দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রাচীন ধারাটি রক্ষা পায়। আধুনিক যুগে এসে সারা বিশ্বে যখন স্কটিশ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে, তখন পাইপারদের কাছে পিবারচ বাজাতে পারাটা এক চূড়ান্ত যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হয়। এটি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের সুর নয়, এটি আসলে হাইল্যান্ডের মেঘাচ্ছন্ন পাহাড়, পাইন বন আর খ্যাপাটে বাতাসের সাথে মানুষের আত্মার কথোপকথনের এক অবিনশ্বর জীবন্ত দলিল।

আরও দেখুন: