লেখক পরিচিতি: এস্টাবলিশমেন্টের ভেতরের মানুষ থেকে কট্টর সমালোচক
হুসাইন হাক্কানি কেবল একজন গবেষক বা সাংবাদিক নন; তিনি পাকিস্তানের রাজনীতির অন্দরমহল খুব কাছ থেকে দেখা একজন ব্যক্তি। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্রজীবনে ইসলামিক ইউথ উইং (ইসলামী জমিয়তে তালাবা)-এর সাথে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’-এর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন এবং নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানের বেসামরিক রাজনীতিতে একজন ক্ষমতাশালী উপদেষ্টা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ এবং বেনজীর ভূট্টো—উভয়েরই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও প্রচার উপদেষ্টা ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ভুল নীতিগুলোর ওপর তাঁর বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে। হাক্কানি যখন দেখলেন—পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর (জিএইচকিউ) রাওয়ালপিন্ডি কীভাবে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ রক্ষায় ধর্মীয় চরমপন্থাকে প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের অস্ত্র বানিয়েছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধ্বংস করছে, তখন তিনি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
২০০৫ সালে এই বইটি প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি সামরিক অভিজাতদের ‘দ্বৈত নীতি’ বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করে দেন। ২০১১ সালের বিখ্যাত ‘মেমোগেট’ কেলেঙ্কারির পর সামরিক বাহিনীর সাথে তাঁর বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
অধ্যায়ভিত্তিক বিস্তারিত পর্যালোচনা
অধ্যায় ১: কায়েদে আজমের পাকিস্তান ও পরিচয়সংকটের গোড়াপত্তন (Origins of the Alliance)
বইয়ের শুরুতেই হাক্কানি প্রশ্ন তুলেছেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয় নিয়ে। ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও রাষ্ট্রটির সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে কোনো জাতীয় ঐকমত্য ছিল না। ভারতের কাছ থেকে ‘অস্তিত্বের হুমকি’ (Existential Threat) অনুধাবনের ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অভিজাতরা জাতীয় সংহতি বজায় রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে ‘ইসলাম’-কে আদর্শিক আঠা হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
এই অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে, কীভাবে শুরুতেই অসামারিক ও সামরিক আমলারা ধর্মীয় দলগুলোকে রাজনীতিতে জায়গা করে দেয়, যা কায়েদে আজম জিন্নাহর প্রাথমিক ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ছিল।
অধ্যায় ২: প্রারম্ভিক সামরিক শাসন ও ধর্মীয় কার্ডের ব্যবহার (1947–1958)
দ্বিতীয় অধ্যায়ে হাক্কানি ১৯৫০-এর দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্লেষণ করেছেন। সিভিলিয়ান শাসন দুর্বল হওয়ার সাথে সাথে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করে।
১৯৫৩ সালের লাহোরে কাদিয়ানী-বিরোধী দাঙ্গার সময় সামরিক বাহিনী কীভাবে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বেসামরিক প্রশাসনের ওপর প্রভাব ফেলে, তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে এতে।
এই অধ্যায়ে উঠে এসেছে—রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কীভাবে তৎকালীন জেনারেল ও আমলারা জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মীয় দলগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করেছিল।
অধ্যায় ৩: আইয়ুব খানের সময়কাল ও কথিত আধুনিকায়ন (1958–1969)
সাধারণভাবে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে একজন ওয়েস্টার্নাইজড বা সেক্যুলার সামরিক শাসক মনে করা হলেও, হাক্কানি দেখিয়েছেন আইয়ুব খান মূলত কীভাবে নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে ধর্মের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছিলেন।
এই অধ্যায়ে দেখানো হয়, ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় রেডিও ও সামরিক প্রচারণায় কীভাবে ‘জিহাদী চেতনা’ ও ‘ইসলাম বনাম কুফর’-এর বয়ান তৈরি করা হয়। সামরিক বাহিনী নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ধর্মীয় আবেগকে হাতিয়ার বানায়।
অধ্যায় ৪: ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান সংকট ও চরমপন্থার সামরিকায়ন (The 1971 War)
বইটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অধ্যায় এটি। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক রায়কে দমিত করতে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থাকে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তা হাক্কানি সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর গণহত্যা পরিচালনার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে ‘রাজাকার’, ‘আল-বদর’ ও ‘আল-শামস’-এর মতো আধাসামরিক বাহিনী গড়ে তোলে। হাক্কানি প্রমাণ করেছেন—এই অধ্যায়টি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক বাহিনী এবং চরমপন্থী মোল্লাদের যৌথ অপারেশনের সবচেয়ে নারকীয় বাস্তবায়ন।
অধ্যায় ৫: জুলফিকার আলী ভূট্টো ও সেক্যুলার রাজনীতির তোষণনীতি (The Bhutto Era: Appeasing the Mullahs)
১৯৭১-এর পরাজয়ের পর একক ক্ষমতার অধিকারী হন পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো। একজন সংস্কৃতিমনা ও ধর্মনিরপেক্ষ জনপ্রিয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও ভূট্টো কীভাবে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে ইসলামপন্থীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, হাক্কানি তা নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
১৯৭৪ সালে সংবিধান সংশোধন করে আহমদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা করা, রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা এবং মদ নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্তগুলো ছিল ইসলামপন্থীদের তোষণ করার ভূট্টোর প্রয়াস। কিন্তু এই তোষণনীতি তাঁকে বাঁচাতে পারেনি, বরং সামরিক বাহিনীর হাতে তাঁর পতনের পথ সুগম করেছিল।
অধ্যায় ৬: জেনারেল জিয়া-উল-হক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামীকরণ (Zia-ul-Haq: The Apex of Islamization)
- সামরিক বাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের জন্য ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’ পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেন।
- সিভিল সার্ভিসের পদোন্নতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির ক্ষেত্রে হেফজ ও ধর্মীয় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন।
- আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের সময় আমেরিকার অর্থায়ন ও অস্ত্র সহায়তায় হাজার হাজার মাদ্রাসা গড়ে তুলে বিশ্বব্যাপী জিহাদী নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।এই অধ্যায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জিয়া-উল-হকের আমলেই ‘মসজিদ ও সামরিকতন্ত্র’ কেবল যৌথ মিত্র ছিল না, বরং সামরিক বাহিনী নিজেই একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
অধ্যায় ৭: নব্বইয়ের দশকের ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ ও কৌশলগত গভীরতা (The Post-Zia Era & Kashmir/Afghan Jihad)
জিয়া-উল-হকের মৃত্যুর পর বেনজীর ভূট্টো ও নওয়াজ শরীফ চারবার ক্ষমতায় এলেও প্রকৃত ক্ষমতা ছিল সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ (ISI)-এর হাতে। হাক্কানি দেখিয়েছেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী তাদের ‘কৌশলগত গভীরতা’ (Strategic Depth) নীতির অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে তালেবান সৃষ্টি করে এবং ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধ চালানোর জন্য লস্কর-এ-তৈয়্যবা ও জৈশ-ই-মুহাম্মদের মতো চরমপন্থী সংগঠনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দেয়। বেসামরিক প্রধানমন্ত্রীরা যখনই ভারতের সাথে শান্তি আলোচনা করতে চেয়েছেন, সামরিক-মোল্লা অক্ষ তখনই তা নস্যাৎ করে দিয়েছে।
অধ্যায় ৮: ৯/১১, পারভেজ মুশাররফ ও দ্বৈত নীতির চূড়ান্ত রূপ (Musharraf Era & The U.S. Factor)
আমেরিকায় ৯/১১ হামলার পর জেনারেল পারভেজ মুশাররফ একদিকে নিজেকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ‘প্রবুদ্ধ মডারেশন’ (Enlightened Moderation)-এর রূপকার এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের প্রধান মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন, অন্যদিকে গোপনে আফগান তালেবান ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে টিকিয়ে রাখেন। হাক্কানি এই অধ্যায়ে উন্মোচন করেছেন ওয়াশিংটনের কৌশলগত অন্ধত্বকে। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে কোটি কোটি ডলারের সামরিক অনুদান দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছে, অথচ সেই অর্থ ও প্রযুক্তির একটি বড় অংশ যে তাদেরই শত্রু চরমপন্থীদের লালনে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বইটিতে সপ্রমাণিত।
অধ্যায় ৯: উপসংহার ও মুক্তির উপায় (Conclusion: Dismantling the Nexus)
বইয়ের শেষভাগে হাক্কানি উপসংহারে টেনেছেন যে, পাকিস্তান যদি এই সামরিক-ধর্মীয় মেলবন্ধন থেকে বের হয়ে আসতে না পারে, তবে এটি একটি চরম ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তিনি সুপারিশ করেন—পাকিস্তানকে তার প্রতিবেশীদের (বিশেষ করে ভারত ও আফগানিস্তান) শত্রু ভাবার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে, সামরিক বাজেট কমিয়ে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে ধর্মীয় চরমপন্থাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে বেসামরিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বইটির মূল চারটি স্তম্ভ
- সামরিক-ইসলামপন্থী অক্ষ: সামরিক বাহিনী ক্ষমতা ধরে রাখতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধর্মকে এবং বৈদেশিক নীতিতে চরমপন্থাকে হাতিয়ার বানিয়েছে।
- জাতীয় পরিচয়ের সংকট: ভারতের সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়কে মূল পুঁজি করে একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার বদলে আদর্শিক ও সামরিক রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: স্নায়যুদ্ধ থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাসীনতা ও সামরিক সাহায্য পাকিস্তানের এই অনৈতিক অক্ষকে দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করেছে।
- বেসামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা: বেসামরিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে বিভিন্ন সময় সামরিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সাথে আপস করেছে, ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারেনি।


