বেশ কিছুদিন ধরে এই আয়োজনের সাংগঠনিক কাজে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকায় এবং সময়ের অভাবে আপডেট দিতে না পারায় আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে প্রতিযোগীদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে পুরো বিষয়টির একটি সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরছি। এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণদের মেধা বিশ্বমঞ্চে প্রমাণের এক অনন্য সুযোগ।
হ্যাকাথন ২০১২ – আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনা
হ্যাকাথন আসলে কী?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, হ্যাকাথন (Hackathon) জিনিসটা কী? সহজ কথায়, এটি একটি নিবিড় সমস্যা সমাধানের প্রতিযোগিতা (Problem Solving Competition)। এর মূল অস্ত্র হলো ‘লজিক্যাল সলিউশন’ এবং ‘তথ্য প্রযুক্তি’।
তবে সাধারণ প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার সাথে এর একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। এখানে কেবল গাণিতিক বা থিওরিটিক্যাল সমস্যার সমাধান করা হয় না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোর ডিজিটাল সমাধান বের করা হয়।
- হ্যাকিং (Hacking): এখানে হ্যাকিং মানে অশুভ কিছু নয়; বরং কোনো সমস্যার গভীরে ঢুকে তার মূল কারণ (Root Cause) খুঁজে বের করা এবং সেটির একটি কার্যকর ‘সলিউশন’ তৈরি করা।
- ম্যারাথন (Marathon): যেহেতু এই প্রতিযোগিতাটি টানা ৩৬ ঘণ্টা চলবে, তাই এর নামের সাথে ম্যারাথন শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হ্যাকাথন আয়োজিত হয়েছে। গত বছরের বিষয় ছিল ‘পানি সমস্যা’। সেই প্রতিযোগিতার অনেকগুলো সমাধান আজ সফল বাণিজ্যিক স্টার্টআপে রূপান্তরিত হয়েছে।
আয়োজক ও সহযোগিতায় কারা আছেন?
বিশ্বব্যাংকের সমন্বয়ে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশীদার হিসেবে যুক্ত আছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (A2I), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সরাসরি এই আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বখ্যাত ‘নকিয়া’ (Nokia) এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহ আমাদের সাথে আছে। ‘প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ’ এই পুরো আয়োজনে অগ্রণী সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করছে।
এবারের ফোকাস: স্যানিটেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হ্যাকাথন ২০১২-এর মূল প্রতিপাদ্য হলো স্যানিটেশন বা স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ও ব্যবস্থাপনা। বিষয়টি শুনতে অস্বস্তিকর মনে হলেও এটি একটি ভয়াবহ জাতীয় সমস্যা। স্যানিটেশন ব্যবস্থা মানসম্মত না হওয়ায় আমাদের দেশ প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা আমাদের জিডিপির প্রায় ৬.৩ শতাংশ।
কেবল এই একটি সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারলে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দুই অংকের (Double Digit) ঘরে প্রবেশ করতে পারতো। জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি একটি প্রধান শর্ত। তাই আমরা আমাদের তরুণদের আহ্বান করছি এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করতে।
হ্যাকাথন ডাইনামিকস—কখন, কোথায় এবং কীভাবে?
তথ্য প্রযুক্তি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বর্তমানে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। চটি সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সবকিছুকে সহজ করার ক্ষমতা রাখে এই প্রযুক্তি। আমাদের লক্ষ্য হলো, স্যানিটেশনের মতো একটি সেকেলে সমস্যাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আধুনিক ও কার্যকর সমাধান দেওয়া। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চাই যে, বাংলাদেশে একটি দক্ষ ‘টেক-জেনারেশন’ তৈরি হয়েছে।
১. সময়সূচী ও ভেন্যু
প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে ৩০শে নভেম্বর, ২০১২ সকাল ৯টায়। টানা ৩৬ ঘণ্টার এই লড়াই শেষ হবে ১লা ডিসেম্বর রাত ১০টায়।
- ভেন্যু: ঢাকা রূপসী বাংলা হোটেলের (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল) বলরুম।
- পরিবেশ: এখানে কাজের পরিবেশ হবে অত্যন্ত ঘরোয়া এবং সৃজনশীল। খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং দীর্ঘ কাজের ক্লান্তিতে যদি ঘুম পায়, তবে ফ্লোরের এক কোণায় ম্যাট বিছিয়ে ন্যাপ নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
- গ্লোবাল কানেক্টিভিটি: এই ৩৬ ঘণ্টা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশে চলা হ্যাকাথনের লাইভ ফিড আসতে থাকবে। অর্থাৎ আপনি ঢাকায় বসেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ডেভেলপারদের সাথে একাত্মবোধ করবেন।
২. মেন্টরশিপ ও প্রবলেম সোর্সিং
প্রতিযোগীদের ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করার পর প্রতিটি টিমকে একজন করে অভিজ্ঞ মেন্টর দেওয়া হবে। মেন্টরদের কাজ হবে আপনাকে সমস্যাটি বুঝতে এবং টেকনিক্যাল সমাধানে পৌঁছাতে গাইড করা।
- প্রবলেম স্টেটমেন্ট: স্যাম্পল প্রবলেম স্টেটমেন্ট ইতিমধ্যে আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ইভেন্টের সময় ‘প্রবলেম ওনার’ বা যারা সরাসরি এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, তাঁরা উপস্থিত থাকবেন। প্রতিযোগীরা সরাসরি তাঁদের প্রশ্ন করে সমস্যার গভীরে যেতে পারবেন।
- সমস্যা নির্বাচন: একই সমস্যা একাধিক গ্রুপ বেছে নিতে পারবে। এতে কার সমাধান বেশি কার্যকর, তা যাচাই করা সহজ হবে।
৩. সমাধান তৈরির প্রক্রিয়া
সমস্যা নির্বাচনের পর আপনার টিমের কাজ হবে নিচের তিনটি ধাপ অনুসরণ করা:
- লজিক্যাল সলিউশন: প্রথমে সমস্যাটির একটি যৌক্তিক ও কার্যকর সমাধান বের করা।
- প্রেজেন্টেশন: সমাধানটি কীভাবে কাজ করবে, তার একটি আকর্ষণীয় স্লাইড বা প্রেজেন্টেশন তৈরি করা।
- প্রোটোটাইপ: সবশেষে প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সেই লজিকের একটি কার্যকরী ‘প্রোটোটাইপ’ বা মডেল তৈরি করা।
৪. হার-জিতের মাপকাঠি (Evaluation)
মনে রাখবেন, হ্যাকাথনে কোডের চেয়ে কনসেপ্ট বা ধারণার গুরুত্ব বেশি।
- কার্যকারিতা: আপনার সমাধানটি কতটা বাস্তবমুখী এবং সহজে প্রয়োগযোগ্য, তা-ই হবে বিজয়ী হওয়ার প্রধান শর্ত।
- উপস্থাপনা: আপনার সমাধান খুব চমৎকার কিন্তু উপস্থাপন দুর্বল হলে পুরো পরিশ্রম বৃথা যেতে পারে। তাই বিচারকদের মন জয় করতে হলে প্রেজেন্টেশনে পারদর্শী হতে হবে।
- প্রোটোটাইপিং: এখানে পুরো সফটওয়্যার বানিয়ে শেষ করা মূল কাজ নয়; বরং লজিকটি যে কোডের মাধ্যমে কাজ করছে, সেটি প্রমাণ করতে পারাটাই যথেষ্ট।
উদ্যোক্তাদের জন্য স্বর্ণালী সুযোগ—বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক মঞ্চ
হ্যাকাথন কেবল একটি ৩৬ ঘণ্টার প্রতিযোগিতা নয়; এটি একজন স্বপ্নবাজ তরুণের জন্য সফল উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবেশদ্বার। এখানে অংশগ্রহণ করাটাই আপনার ক্যারিয়ারের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক।
১. কেমন টিম আমাদের প্রয়োজন?
আমরা কেবল একটি ‘টেকি’ বা শুধু কোডিং করতে জানা টিম খুঁজছি না। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি টিম যার মধ্যে সামাজিক বাস্তবতাবোধ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা—উভয়ের সমন্বয় আছে। কারণ স্যানিটেশন সমস্যাটির সমাধান করতে হলে আমাদের দেশের অবকাঠামো, সংস্কৃতি এবং মানুষের অভ্যাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। পাশাপাশি সেই ধারণাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং সুন্দরভাবে উপস্থাপনের ক্ষমতা থাকতে হবে।
২. বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারীদের জন্য পুরস্কার
- বৈশ্বিক ভ্রমণ: বিজয়ী টিমের জন্য থাকবে দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক হ্যাকাথন ইভেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ। বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভ্রমণে পূর্ণ সহায়তা করবে।
- বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন: আপনার টিম জিতুক বা হারুক—যদি আপনার ‘কনসেপ্ট’ প্রবলেম ওনারদের (যেমন স্থানীয় সরকার বা দাতা সংস্থা) পছন্দ হয়, তবে তাঁরা সেটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করবে।
৩. মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের হাতছানি
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি। ইভেন্টে অনেক বাণিজ্যিক কোম্পানি ও ভেনচার ক্যাপিটালিস্ট উপস্থিত থাকবেন। আপনার আইডিয়া বা প্রোটোটাইপ যদি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে হয়, তবে বিনিয়োগের পরিমাণ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একজন উদ্যোক্তা মানসিকতার তরুণের জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর হতে পারে না। এখান থেকেই আমরা বাংলাদেশের পরবর্তী বড় বড় টেক-স্টার্টআপের জন্ম দেখতে চাই।
৪. বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ
আপনারা যারা অংশগ্রহণে আগ্রহী, তারা নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে চোখ রাখুন:
ওয়েবসাইট: http://hackathonbd.com/
ফেসবুক পেজ: Sanitation Hackathon Bangladesh
বাংলাদেশে এ ধরণের আয়োজন এবারই প্রথম। এই সুযোগটি যাতে নিয়মিত আমরা পাই, তার জন্য এবারের ইভেন্টটিকে সফল করা আমাদের সবার দায়িত্ব। মনে রাখবেন, আপনার একটি ছোট কোড বা একটি সাধারণ আইডিয়া বদলে দিতে পারে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র।
তাহলে দেখা হচ্ছে ৩০শে নভেম্বর ২০১২, সকাল ৯টায় রূপসী বাংলা হোটেলের বলরুমে! প্রস্তুত তো আপনারা?
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
সভাপতি,
প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ
আরও দেখুন:
