মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ১০টি বিশেষ উদ্যোগ । সরকারে দরকার সিরিজ

বাংলাদেশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তুলতে এবং ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক রূপান্তরের কাজ শুরু করে।

২০১৪ সালে পুনরায় সরকার গঠনের পর দেশের সব মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্তি, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়গুলোকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, নারীদের ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা বর্তমানে দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ১০টি বিশেষ উদ্যোগ

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা'র ১০টি বিশেষ উদ্যোগ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ১০টি বিশেষ উদ্যোগ

 

কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবকালে বিশ্বজনীন নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারের নিরন্তর প্রচেষ্টায় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪%, যা এই মুহূর্তে এশিয়ায় সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২,০৬৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে—এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।” বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দশটি বিশেষ উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। এই উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ ও ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

 

উদ্যোগ-১ : আমার বাড়ি আমার খামার ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক

দারিদ্র্য নিরসন ও টেকসই উন্নয়ন: গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্প (সাবেক ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প) বর্তমানে একটি সফল মডেলে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি বাড়ীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলে নিজস্ব পুঁজি গঠন, উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সঞ্চয় অনুদান প্রদান, ক্ষুদ্র বিনিয়োগে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই জীবিকায়ন নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল ভিশন।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ঐতিহাসিক যাত্রা: এই প্রকল্পের টেকসই রূপ দিতে এবং সঞ্চয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষায় ২০১৪ সালের ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন’ পাস করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১ জুলাই ২০১৬ থেকে ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক’ তার আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। মাঠ পর্যায়ের সমবায় সমিতিগুলোর তহবিল, সদস্যদের সঞ্চয় ও প্রকল্পের সম্পদ এই বিশেষায়িত ব্যাংকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৪৯% অংশের মালিক স্বয়ং প্রকল্পের উপকারভোগী গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ এবং বাকি ৫১% শেয়ারের মালিক সরকার।

আর্থিক ও সামাজিক সাফল্য (২০২০-২১): এই সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলের ফলে প্রকল্পভুক্ত পরিবারগুলোর নিজস্ব পুঁজি গঠনের পাশাপাশি বার্ষিক আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পভুক্ত এলাকাগুলোতে নিম্ন আয়ের বা অতি-দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা পূর্বের ১৫% থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩%-এ নেমে এসেছে। দেশব্যাপী লক্ষাধিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতির মাধ্যমে কোটি মানুষ সরাসরি এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুফল পাচ্ছেন।

 

আশ্রয়ণ প্রকল্প
আশ্রয়ণ প্রকল্প

 

উদ্যোগ-২ : আশ্রয়ণ প্রকল্প

ছিন্নমূল ও ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসন: ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সমাজের প্রকৃত ভূমিহীন-গৃহহীন ছিন্নমূল অসহায় পরিবারগুলোকে স্থায়ী পুনর্বাসন করা ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর প্রধান লক্ষ্য। এটি কেবল বাসস্থান নিশ্চিত করে না, বরং মানুষের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।

ঐতিহাসিক পটভূমি: ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের পুনর্বাসনে তৎকালীন নোয়াখালীর (বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার) চর পোড়াগাছায় ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন। সেই একই দূরদর্শী দৃষ্টান্ত সামনে রেখে, ১৯৯৭ সালের মে মাসে কক্সবাজার ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে গৃহহীন হওয়া পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ গড়ে তোলেন।

সশস্ত্র বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ রূপায়ণ: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সমন্বয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের অধীনে ব্যারাকে পুনর্বাসন ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের জটিল ও দূরূহ কাজটি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী (সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী) অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করে আসছে।

ঋণ, প্রশিক্ষণ ও স্বাবলম্বীতা: পুনর্বাসিত দরিদ্র পরিবারগুলোকে কেবল ঘর দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয় না। পুনর্বাসিত নারী ও পুরুষদের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক কাজের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের সমবায় সমিতির অন্তর্ভুক্ত করে সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি
শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি

 

উদ্যোগ-৩: ডিজিটাল বাংলাদেশ

ভোগান্তিহীন ও স্বচ্ছ উপায়ে দোরগোড়ায় সেবা: জনগণের দোরগোড়ায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক রাষ্ট্রীয় সেবা (e-Services) পৌঁছে দেওয়াই এই রূপকল্পের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা এবং কোনো ধরনের ভোগান্তি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতি ছাড়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে, স্বল্পতম সময়ে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জনগণের কাছে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।

অবকাঠামো ও ইন্টারনেট সেবা: এই উদ্যোগের আওতায় দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ও ফোর-জি (4G) প্রযুক্তির বিস্তার ঘটিয়ে মোবাইল এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা দিতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে ‘ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার’ (UDC)।

তথ্য বাতায়ন ও জাতীয় হেল্পলাইন: সরকারি যাবতীয় তথ্য, ফরম এবং সেবাকে একক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম পোর্টাল ‘জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ (bangladesh.gov.bd) চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩৩৩ (জাতীয় তথ্য ও সেবা), ৯৯৯ (জরুরি সেবা) এবং ১০৫ (জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা)-এর মতো টোল-ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইনের মাধ্যমে নাগরিক সেবা ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

 

শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি
শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি

 

উদ্যোগ-৪: শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি

শিক্ষার প্রসারে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং তাঁরই নির্দেশে ১৯৭৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে একযোগে ৩৬,১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থাভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নিশ্চিত করতে ‘শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি’র বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও জেন্ডার সমতা: এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো স্কুলগামী শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে আনা, ঝরে পড়া রোধ করা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (PMEST) গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ছাত্রীদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনাবেতনে অধ্যয়নের সুযোগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ উপবৃত্তি এবং স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি প্রদান করা হচ্ছে।

ডিজিটাল ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা: প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে আইটি-নির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। এর আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ স্থাপন এবং শ্রেণিকক্ষসমূহে মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

বই উৎসব ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন: ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ১ জানুয়ারি প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক ‘বই উৎসব’ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে দেশের শিক্ষার হার তৎকালীন সময়ে ৭৪.৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন “বিশেষ এলাকায় উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক বিশেষ কর্মসূচির আওতায় সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি, বাইসাইকেল ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান বাবদ বড় অংকের অনুদান সরাসরি বিতরণ করা হচ্ছে।

 

২০১৯২০ অর্থবছরের বাজেট
২০১৯২০ অর্থবছরের বাজেট

 

উদ্যোগ-৫: নারীর ক্ষমতায়ন

অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারিত্ব: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য দূর করে জাতীয় জীবনের মূল ধারায় নারীর সমান অধিকার ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে।

আইনি ও নীতিগত সুরক্ষা: নারীর সার্বিক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং তাদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা রোধে সরকার যুগান্তকারী আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’, ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’, ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা-২০১৩’, অপরাধী শনাক্তকরণে সহায়ক ‘ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন-২০১৪’ এবং ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’।

পল্লী মাতৃস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ক্ষুদ্রঋণ: গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করতে দেশব্যাপী ১২,৯৫৬টি ‘পল্লী মাতৃস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ (RMC)-এর মাধ্যমে কার্যক্রম চালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ মায়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মা ও শিশুর যত্নসহ প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হচ্ছে।

মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও জেন্ডার বাজেট: কর্মজীবী নারীদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস থেকে বাড়িয়ে সফলভাবে ৬ মাসে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া, রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরে ও জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সম-অধিকার ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে ‘জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেট’ (লিঙ্গ সংবেদনশীল বাজেট) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে আসছে।

 

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ
ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ

 

 

উদ্যোগ-৬: ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ

আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতি: জাতীয় প্রবৃদ্ধি (GDP) অর্জন, দ্রুত শিল্পায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দেশের আর্থ-সামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আলো জ্বালানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে এই কর্মসূচি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

উৎপাদন সক্ষমতা ও শতভাগ বিদ্যুতায়ন (২০২১ প্রেক্ষাপট): ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় একটি নজিরবিহীন ও বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫,০০০ মেগাওয়াটের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গ্রিড ও অফ-গ্রিড (পার্বত্য ও চরাঞ্চল) উভয় পদ্ধতি সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার: প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির (গ্যাস ও কয়লা) পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার আওতায় অফ-গ্রিড চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় ৬০ লক্ষাধিক ‘সোলার হোম সিস্টেম’ (সৌরবিদ্যুৎ) স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে উইন্ডমিল (বায়ুবিদ্যুৎ) এবং বিভিন্ন খামারে বায়োগ্যাস প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্রিন এনার্জি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে।

পরমাণু বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ: দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে পাবনার রূপপুরে মেগা প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ (Rooppur Nuclear Power Plant)-এর নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’ (Nuclear Club)-এ যুক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে।

 

শিশু মৃত্যুর হার
শিশু মৃত্যুর হার

 

উদ্যোগ-৭ : কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বৈপ্লবিক মডেল: গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উদ্ভাবনী মডেলটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে এবং জাতিসংঘ কর্তৃক এটি একটি অনুকরণীয় জনস্বাস্থ্য মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

সমন্বিত চিকিৎসাসেবা ও রেফারেল সিস্টেম: এই ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে সন্তানসম্ভবা মায়েদের প্রসবপূর্ব (ANC) ও প্রসবোত্তর (PNC) যত্ন, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি বিতরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়াও নবদম্পতি ও গর্ভবতী মায়েদের নিবন্ধন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন এবং মা ও শিশুর জন্য পুষ্টি (Micro-nutrient) বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করা হয়। কোনো রোগীর জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে উন্নততর চিকিৎসার জন্য তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘রেফারেল সিস্টেম’ (Referral System) চালু করা হয়েছে।

তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও বিনামূল্যে ওষুধ: গ্রামের মানুষের হাতের নাগালে স্বাস্থ্যসেবা দিতে দেশব্যাপী প্রায় ১৪,০০০ (তৎকালীন সচল ১৩,৮৬১টি) কমিউনিটি ক্লিনিক সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় গড়ে প্রতি ৬,০০০ মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে কাজ করছে, যেখান থেকে গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে প্রায় ৩০টি ভিন্ন ভিন্ন লাইফ সেভিং ও জরুরি ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সূচক উন্নয়ন: এই উদ্যোগের সাথে বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম সচেতনতাকে যুক্ত করা হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণা ও সেবা নিশ্চিত করছে। এই নিবিড় স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কের সুফল হিসেবে দেশের মাতৃমৃত্যুর অনুপাত প্রতি লক্ষে ১৯৪ থেকে ১৬৯-এ হ্রাস পেয়েছে, শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৮ বছরে উন্নীত হয়েছে।

 

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট

 

উদ্যোগ-৮: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শনের আলোকে পরিচালিত সরকারের সকল অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্যই হলো দারিদ্র্য বিমোচন। ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’ (Inclusive Growth) অর্জনের নীতি-কৌশল গ্রহণ করে। এর ফলে বিগত এক দশকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি ক্রমাগতভাবে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে।

দারিদ্র্য হ্রাসের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES) অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ৩১.৫% থেকে হ্রাস পেয়ে ২৪.৩%-এ নেমে আসে। একই সময়ে অতি-দারিদ্র্যের হার ১৭.৬% থেকে কমে দাঁড়ায় ১২.৯%-এ। এই ধারাবাহিকতায়, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG): বাংলাদেশ অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২০’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০.৫% এবং অতি-দারিদ্র্যের হার ১০.৫%-এ নেমে এসেছে।

বৈষম্য নিরসন ও কৌশলগত প্রজ্ঞা: স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের (LDC Graduation) ট্রানজিশন পিরিয়ডে পুঁজি গঠনের কারণে সচরাচর ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাজের মূল স্রোতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে তাঁর অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বিভিন্ন স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) না থাকলে দেশে দারিদ্র্যের হার অন্তত ১.৫% বেশি হতো।

বাজাট বরাদ্দ ও সমতা নিশ্চিতকরণ: ২০০৯ সাল থেকে সরকার ধারাবাহিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করে আসছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমে প্রায় ৯৫,৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা ছিল মোট বাজেটের ১৬.৮৩% এবং জিডিপির (GDP) ৩.০১%। এই কর্মসূচিতে কেবল নগদ অর্থ বা খাদ্য সহায়তাই দেওয়া হয় না, বরং ভাতাভোগীদের কর্মবিমুখতা এড়াতে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ‘কর্মসৃজন’ (Employment Generation) কর্মসূচিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক সমতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা নীতি-কৌশল (NSSS): সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডের কার্যকর সমন্বয়, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ২০১৫ সালে ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা নীতি-কৌশল’ (National Social Security Strategy – NSSS) প্রণয়ন করে। এই নীতি-কৌশলের মূল ভিত্তি হলো মানুষের জন্ম থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নির্দিষ্ট ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় ‘জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’ (Life-Cycle Based Social Security) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই জীবনচক্রভিত্তিক মডেলটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্যের হার অতিরিক্ত আরও ৪.৭% কমানো সম্ভব। এই লক্ষ্যেই সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিকে ডিজিটালাইজড করে সরাসরি ‘জিটুপি’ (G2P – Government to Person) পদ্ধতিতে উপকারভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দিচ্ছে।

 

বিনিয়োগ বিকাশ
বিনিয়োগ বিকাশ

 

উদ্যোগ-৯: বিনিয়োগ বিকাশ

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও যুগান্তকারী নীতি: ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে বাংলাদেশ এক বিপুল সম্ভাবনার দেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণ করেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য আইনি সংস্কার, নীতিসহায়তা ও ব্যবসা সহজীকরণ সূচক (Ease of Doing Business) উন্নয়নে বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

মেগা অবকাঠামো ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত: বিদ্যুৎ, আইসিটি এবং যোগাযোগ খাতের অভূতপূর্ব উন্নয়নে বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম মেগা প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (মেত্রোরেল), ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ এবং দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা বন্দরসহ ছোট-বড় অসংখ্য পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের প্রথম ২টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU—প্রতিটি দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন) স্থাপন কার্যক্রম ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন: দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর ও মহাসড়কসমূহকে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক’ (এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণ করা হয়েছে। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে গত এক দশকে ৩৩০ কি.মি. নতুন রেললাইন নির্মাণ এবং ১,১৩৫ কি.মি. রেললাইন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে এবং আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহণ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে।

অত্যাধুনিক সমুদ্রবন্দর ও সুনীল অর্থনীতি: দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং মংলা সমুদ্রবন্দরকে অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যের ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EZ): পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA)-এর অধীনে ইতোমধ্যে ১৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং আরও ১৫টি নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সফলভাবে তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) ঐতিহাসিক মাইলফলক: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সুফল হিসেবে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার অতিক্রম করে। দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে তা ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিডা (BIDA)-এর সাম্প্রতিক ডেটা অনুযায়ী বর্তমানে বার্ষিক এফডিআই (FDI) প্রবাহ সর্বোচ্চ ৩৮৯ কোটি মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

পরিবেশ সুরক্ষা
পরিবেশ সুরক্ষা

 

 

উদ্যোগ-১০: পরিবেশ সুরক্ষা

টেকসই পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ: প্রতিবেশ (Ecosystem) ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উদ্ভিজ্জ জরিপ (Plant Survey) এবং টেকসই বনজ সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতা: বিজ্ঞানভিত্তিক ও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু সহনশীল পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। এর আওতায় মোট বনভূমির পরিমাণ সম্প্রসারণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী (Green Belt) নির্মাণ, জীববৈচিত্র্য শনাক্তকরণ, সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশদূষণ রোধের কার্যক্রমকে গতিশীল করা হয়েছে।

বনভূমি ও বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যান: বন অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালের মাত্র শতকরা ৭–৮ ভাগ থেকে সরকারের কার্যকর নীতিমালার ফলে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বনভূমির বিস্তার দেশের মোট আয়তনের ১৫.৫৮%-এ উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সামাজিক বনায়ন, সড়ক ও বাঁধের পার্শ্ববর্তী বনায়ন এবং গৃহস্থালি বৃক্ষরাজির অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে দেশের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২২.৩৭% এলাকা সফলভাবে বৃক্ষাচ্ছাদনে (Tree Coverage) আবৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নেতৃত্ব: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দূরদর্শী ও অগ্রণী ভূমিকার জন্য ২০১৫ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিবেশগত সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ (Champions of the Earth) পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’ (BCCTF) গঠন করে বিশ্বমঞ্চে অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ১০টি বিশেষ উদ্যোগ একদিকে যেমন এদেশের সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো সরাসরি নিশ্চিত করছে; অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে সরকারি সেবাসমূহকে সম্পূর্ণ সহজ ও আধুনিক করে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যুগান্তকারী সম্প্রসারণ এবং নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য দূরীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি, মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব সেবার ফলে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের মধ্য দিয়ে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের হার দ্রুত হ্রাসে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। উপরন্তু, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রতিবেশ সংরক্ষণ এই প্রতিটি উদ্যোগে বিশেষ প্রাধান্য পাওয়ায় তা জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ (SDG) ২০৩০ অর্জনে বাংলাদেশকে বহুলাংশে এগিয়ে রাখছে। ২০২১ সালের মধ্যে একটি মর্যাদাপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে উত্তীর্ণের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে এই ১০টি বিশেষ উদ্যোগ বর্তমানে চালকের ভূমিকা পালন করছে।

আরও দেখুন: