১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা এবং এর পরপরই তাঁর গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিজস্ব নথিতেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
নিচে তথ্য ও প্রমাণসহ এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো:
১. স্বাধীনতার ঘোষণা: সময় ও মাধ্যম
২৫ শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা যখন ঢাকার রাস্তায় তাণ্ডব শুরু করে, তখন বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে স্বাধীনতার চূড়ান্ত বার্তা পাঠান।
বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত মূল বার্তাটি ছিল:
“This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.”
২. গ্রেফতারের নেপথ্যে ‘অপারেশন বিগ বার্ড’
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার জন্য বিশেষ কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করে, যার কোড নেম ছিল ‘অপারেশন বিগ বার্ড’। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর থার্ড কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এই অভিযানে অংশ নেয়।
- গ্রেফতারের সময়: ২৬ শে মার্চ রাত ১টা ৩০ মিনিটে (২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত) তাঁকে ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।
- গ্রেফতারের কারণ: পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া। তাদের গোপন নথিতে তাঁকে “বিদ্রোহের প্রধান উস্কানিদাতা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৩. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাক্ষ্য
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা যে কেবল মৌখিক ছিল না, তা ২৬ শে মার্চ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে প্রমাণিত হয়।
- বিবিসি (BBC): ২৬ শে মার্চ সকালেই বিবিসি ঘোষণা করে যে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন ঘোষণা করেছেন।
- এনওয়াইটি (The New York Times): ২৭ শে মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে ‘পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
- ডর ডন (The Dawn): করাচি থেকে প্রকাশিত তৎকালীন ‘ডন’ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয় এবং সেখানে তাঁকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।
৪. পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের জবানবন্দি ও দলিল
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লেখা বই এবং সাক্ষাৎকার থেকেও এই ঘোষণার সত্যতা পাওয়া যায়।
- সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’: জেনারেল নিয়াজির জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তাঁর বইতে লিখেছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের ঘোষণাটি ওয়্যারলেসে পরিষ্কার শুনতে পেয়েছিলেন।
- টিক্কা খানের সাক্ষাৎকার: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল টিক্কা খান পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন যে, শেখ মুজিব তাঁর বাড়ি থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং সে অপরাধেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
৫. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ (CIA) ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথি
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত ‘Foreign Relations of the United States’ সিরিজের নথিপত্রে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের অনেকগুলো টেলিগ্রাম পাওয়া যায়।
- ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেলের বার্তা: ২৬ শে মার্চ সকালে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে একটি জরুরি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, রেডিওর একটি গোপন ফ্রিকোয়েন্সি থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনা গেছে।
- সিআইএ স্পেশাল রিপোর্ট: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন শুরু করার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুজিব একটি বার্তা প্রচার করেন যেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৬. ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ও ফরেন অফিসের প্রতিবেদন
ব্রিটিশ সরকারের ডি-ক্লাসিফাইড (উন্মুক্ত) নথিপত্রে দেখা যায়, লন্ডন ভিত্তিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলো বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছিল।
- সাউথ এশিয়া ডিপার্টমেন্টের মেমো: ২৬ শে মার্চ বিকেলে ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের একটি নথিতে বলা হয়, শেখ মুজিব সম্ভবত তাঁর গ্রেফতারের ঠিক আগে একটি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই ঘোষণাটিকে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে চিহ্নিত করে।
৭. ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (R&AW) ও বিএসএফ-এর তথ্য
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার প্রমাণ ছিল।
- ওয়্যারলেস ইন্টারসেপ্ট: বিএসএফ (Border Security Force)-এর তৎকালীন ডিজি কে এফ রুস্তমজী তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখে গেছেন যে, ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরেই ভারতীয় সিগন্যাল ইউনিটগুলো একটি বার্তা পায় যেখানে শেখ মুজিব বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বার্তার সত্যতা যাচাই করে দ্রুত দিল্লিকে অবহিত করে।
৮. পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ISI/MI) এর নিজস্ব প্রতিবেদন
হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে (যেটি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত হয়েছিল) পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা ও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য রয়েছে।
- বিদ্রোহের প্রমাণ: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা (MI) বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন নথিপত্র এবং ওয়্যারলেস বার্তার ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট তৈরি করে। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের এক অখণ্ডতা বিনষ্টকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়, যার প্রধান ভিত্তি ছিল তাঁর ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা।
৯. স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence)
১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে, সেখানেও আইনগতভাবে উল্লেখ করা হয় যে:
“যেহেতু বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন…”

পরিশেষে বলা যায়, যারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, তাদের উচিত ইতিহাসের এই অকাট্য দালিলিক প্রমাণগুলোর মুখোমুখি হওয়া। সত্য এই যে, এই তথ্য-উপাত্তগুলো তাদের অজানা নয়; বরং রাজনৈতিক হীনস্বার্থে এবং জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানোর লক্ষ্যেই তারা এমন অপপ্রচার চালিয়ে থাকেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক নথিপত্র ও ইতিহাসের সত্যের কাছে এই ধরনের অপকৌশল বরাবরই পরাজিত হয়েছে।
