ভারতিয় শাস্ত্রিয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বিশ্বের সমৃদ্ধতম এবং প্রাচীনতম শিল্পকলাগুলোর মধ্যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত অন্যতম। এটি কেবল কতগুলো সুরের সমষ্টি নয়, বরং হাজার বছরের সাধনা, দর্শন এবং বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। ভারত সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র ভূখণ্ড, যেখানে একই সাথে দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অথচ অবিশ্বাস্য রকমের সমৃদ্ধ সংগীতধারা যুগ যুগ ধরে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। এই দুটি ধারা তাদের গায়কী, বাদনশৈলী এবং তাত্ত্বিক কাঠামোতে আলাদা হলেও এদের আধ্যাত্মিক মূল এবং সুরের উৎস কিন্তু একই—সেই অনাদি ‘নাদ’ বা ব্রহ্মাণ্ডের শব্দ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই প্রধান দুটি ধারা হলো:

১) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা হিন্দুস্থানি সিস্টেম

এটি মূলত উত্তর ভারতীয় ধারা হিসেবে পরিচিত। এই রীতির বিবর্তনে প্রাচীন বৈদিক সামগানের আদি ঐতিহ্যের সাথে পারস্য, মধ্য এশিয়া এবং মুঘল সংস্কৃতির এক অপূর্ব শিল্পতাত্ত্বিক মেলবন্ধন ঘটেছে। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে এই ধারার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, বিশেষ করে আমির খসরুর মতো গুণী শিল্পীদের হাত ধরে এটি নতুন রূপ পায়।

ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই রীতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মুঘল সম্রাটদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই সংগীত ধারাটি মন্দির থেকে রাজদরবারে উঠে আসে। এতে যুক্ত হয় নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র ও অলংকরণ।

হিন্দুস্থানি সংগীতে ‘ঘরানা’ প্রথা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। গালিয়র, কিরানা, আগ্রা বা পাটিয়ালা ঘরানার গায়কী একেকটি স্বতন্ত্র দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে শিল্পীর নিজস্ব ‘ইম্প্রোভাইজেশন’ বা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী কৌশলের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। আমাদের দেশের আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুল সংগীতের সুরের মূল কাঠামো এই রীতির ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে।

 

২) দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত বা কার্নাটিক সিস্টেম

এটি দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ধারা। এই ধারাটি হিন্দুস্থানি সংগীতের তুলনায় অনেক বেশি প্রাচীন নিয়মনিষ্ঠ এবং অপরিবর্তিত। এতে বহিরাগত সংস্কৃতির প্রভাব নেই বললেই চলে, ফলে এটি প্রাচীন ভারতীয় সংগীতের বিশুদ্ধতম রূপটি বহন করে চলেছে। মূলত দক্ষিণ ভারতের চারটি রাজ্য—তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটকে এই সংগীত চর্চিত হয়।

দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটকী সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি পারিবারিক শিক্ষা, দৈনন্দিন জীবনচর্চা এবং ধর্মীয় আচারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওখানকার প্রায় প্রতিটি শিক্ষিত পরিবারে শিশুদের শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাথমিক পাঠ দেওয়া একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক রীতি। কর্ণাটকী সংগীতে ‘কৃতি’ বা পূর্বনির্ধারিত গীতিনাট্যধর্মী রচনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ত্যাগরাজা, মুথুস্বামী দীক্ষিত এবং শ্যামা শাস্ত্রীর মতো ‘ত্রয়ী’ সাধকদের সৃষ্টি আজও এই ধারার প্রাণভোমরা হয়ে আছে।

 

 

 

ভারতিয় শাস্ত্রিয় সঙ্গীত

 

 

হিন্দুস্থানি বনাম কর্ণাটকী: প্রধান পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যহিন্দুস্থানি সঙ্গীত (উত্তর ভারতীয়)কর্ণাটকী সঙ্গীত (দক্ষিণ ভারতীয়)
প্রভাবপারস্য ও মুঘল সংস্কৃতির সংমিশ্রণ রয়েছে।সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাচীন ধারা বজায় রেখেছে।
রাগ বিন্যাসরাগের সময়কাল (সকাল, দুপুর, রাত) গুরুত্বপূর্ণ।রাগের সময়ের চেয়ে তাত্ত্বিক কাঠামো বেশি প্রাধান্য পায়।
বাদ্যযন্ত্রসেতার, সরোদ, তবলা, হারমোনিয়াম প্রধান।বীণা, বেহালা (ভায়োলিন), মৃদঙ্গম প্রধান।
ভাষাহিন্দি, উর্দু, ব্রজবুলি ও বাংলা ভাষার প্রাধান্য।প্রধানত তেলুগু, তামিল, কন্নড় ও সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ।

দুটি ব্যবস্থাই স্বতন্ত্র এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের এই “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের পরবর্তী সকল আলোচনা এবং পাঠ মূলত হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত রীতিকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে।

 

সূচি:

Leave a Comment