সঙ্গীতের রস | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

সংগীতের কারিগরি দিকগুলো যদি হয় তার শরীর, তবে ‘রস’ (Rasa/Aesthetics) হলো তার প্রাণ। শুধু সংগীত নয়, দৃশ্যকলা থেকে শুরু করে নৃত্য বা নাটক—পারফর্মিং আর্টের প্রতিটি শাখায় এই রসের রাজত্ব। রস হলো সেই অলৌকিক অনুভূতি, যা একটি শিল্পকর্মকে নিছক বিনোদনের ঊর্ধ্বে নিয়ে হৃদয়ে গেঁথে দেয়।

 

সঙ্গীতের রস

 

সংগীতের রস

ভারতমুনি তার ‘নাট্যশাস্ত্রে’ মানুষের অন্তরের এই সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে নবরস বা নয়টি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন:

১. শৃঙ্গার রস (Shringara): প্রেম, রোমান্টিকতা ও সৌন্দর্যের আধার। (যেমন: রাগ ইমন, খামাজ)

২. করুণ রস (Karuna): শোক, বিরহ ও বিষণ্ণতা। (যেমন: রাগ জৌনপুরী, আশাবরী)

৩. শান্ত রস (Shanta): গভীর প্রশান্তি, ধ্যান ও মোক্ষ। (যেমন: রাগ মালকোষ, ভৈরব)

৪. বীর রস (Vira): তেজ, সাহস ও আত্মপ্রত্যয়। (যেমন: রাগ আদানা, হামীর)

৫. হাস্য রস (Hasya): আনন্দ, কৌতুক ও উল্লাস। (যেমন: রাগ দেশ, বাহার-এর কিছু অংশ)

৬. রুদ্র রস (Raudra): ক্রোধ ও তীব্র তেজ। (সাধারণত ধ্রুপদ বা রুদ্রবীণার বাদনে স্পষ্ট হয়)

৭. ভয়ানক রস (Bhayanak): আতঙ্ক বা ভয়ের পরিবেশ। (অস্বাভাবিক বা তীব্র স্বরপ্রয়োগে সৃষ্ট)

৮. বীভৎস রস (Bhibatsa): ঘৃণা বা জুগুপ্সা। (শাস্ত্রীয় সংগীতে এর প্রয়োগ খুব বিরল)

৯. অদ্ভুত রস (Adbhuta): বিস্ময় ও অলৌকিকতা। (অপ্রত্যাশিত স্বরবিন্যাস বা তানের কাজ)

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 সঙ্গীতের রস | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রসের মিশ্রণ বিবর্তন

মৌলিক রস হয়তো নয়টি, কিন্তু জীবন ও শিল্পের অভিজ্ঞতায় এরা একে অপরের সাথে মিশে তৈরি করে অসংখ্য উপ-রস। ঠিক যেমন RGB বা CMYK রঙের প্রাথমিক বিন্দুগুলো থেকে তৈরি হয় পৃথিবীর কোটি কোটি বর্ণচ্ছটা। একটি রাগের ভেতরেও সময়ের সাথে সাথে রসের পরিবর্তন হতে পারে। ভোরের ভৈরব যে প্রশান্তি (শান্ত রস) দেয়, বিকেলের ভীমপলাসী হয়তো সেই মনেই প্রেমের ব্যাকুলতা (শৃঙ্গার রস) জাগিয়ে তোলে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 সঙ্গীতের রস | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগ: রসের এক শাব্দিক বাহন

রস একটি বিমূর্ত অনুভূতি। একে প্রকাশ করার জন্য চাই একটি শাব্দিক (Acoustic) মাধ্যম বা শরীর। সেই শরীরের নামই হলো রাগ। প্রাচীন ভারতীয় কল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি রাগের এক একটি মানবিক রূপ আছে। পুরুষ রাগগুলো হলো গান্ধর্ব এবং নারী রাগগুলো হলো রাগিণী বা অপ্সরা।

মজার ব্যাপার হলো, শিল্পের এই ‘নয়’ সংখ্যার প্রভাব কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রিক পুরাণেও আমরা কলাদেবীর ৯ জন বোন বা ‘Muses’-এর কথা পাই, যারা মানুষের সৃজনশীলতার ৯টি ভিন্ন ভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ করেন:

  1. Calliope: মহাকাব্য (Epic Poetry)
  2. Clio: ইতিহাস (History)
  3. Erato: প্রেমগীতি (Love Poetry)
  4. Euterpe: সংগীত (Music)
  5. Melpomene: ট্র্যাজেডি বা বিরহগাঁথা (Tragedy)
  6. Polyhymnia: স্তোত্র বা পবিত্র গীতি (Hymns)
  7. Terpsichore: নৃত্য (Dance)
  8. Thalia: হাস্যরস (Comedy)
  9. Urania: জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy)

 

ব্যক্তিগত উপলব্ধি শিল্পবোধ

রস যদিও তাত্ত্বিকভাবে নির্দিষ্ট, কিন্তু এর চূড়ান্ত রূপায়ন ঘটে শ্রোতার মনে। একই রাগ শুনে একজনের মনে প্রেমের উদয় হতে পারে, অন্যজনের মনে জাগতে পারে বৈরাগ্য। এই পার্থক্যের মূলে রয়েছে ওই মানুষের শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা এবং সংগীতের প্রতি তার নিজস্ব রুচি বা ‘সংস্কার’।

শিল্পী যখন সুরের মাধ্যমে রস পরিবেশন করেন, তখন তিনি কেবল নোট বাজান না, তিনি আসলে শ্রোতার মনের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলেন। তাই শাস্ত্রীয় সংগীত শোনা মানে কেবল সুর শোনা নয়, বরং নিজের ভেতরে থাকা নয়টি রসের মহাসাগরে ডুব দেওয়া।

 

সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:

Leave a Comment