আমাদের সংগীত মূলত একটি শ্রবণনির্ভর শিল্প। আমরা সুরকে শুনি, অনুভব করি, মনে রাখি। কিন্তু কোনো সুরকে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করা, অন্য শিল্পীর কাছে পৌঁছে দেওয়া বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে দেওয়ার জন্য সেটিকে লিখিত আকারে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন হয়। সংগীতে সুর, মাত্রা, ছন্দ ও তালের বিন্যাসকে নির্দিষ্ট প্রতীক ও চিহ্নের সাহায্যে কাগজে-কলমে প্রকাশ করার পদ্ধতিকেই বলা হয় স্বরলিপি (Notation)। সহজভাবে বলতে গেলে, স্বরলিপি হলো সুরের লিখিত ডকুমেন্ট—যার মাধ্যমে আমরা কোনো সুরকে সংরক্ষণ করি, যেন আগামীতে পাঠের মাধ্যমে সুরের অবয়বটা আবারো তৈরি করা যায়।

স্বরলিপি পড়ার পদ্ধতি
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে স্বরলিপি পদ্ধতির প্রকারভেদ
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে স্বরলিপি পদ্ধতি মূলত দুই প্রকার। সর্বাধিক প্রচলিত হলো ভাতখণ্ডে পদ্ধতি, যা সহজ ও বৈজ্ঞানিক হওয়ায় সর্বত্র ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়টি পালুস্কর পদ্ধতি, যা তালের সূক্ষ্ম গাণিতিক বিন্যাস প্রকাশের জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও কিছুটা জটিল। এই দুই পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমেই হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত মৌখিক ঐতিহ্য থেকে লিখিত রূপে সংরক্ষিত হওয়ার স্থায়ী ভিত্তি পায়।
১. পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে পদ্ধতি (V.N. Bhatkhande System)
এটি বর্তমানে ভারতের সর্বাধিক ব্যবহৃত স্বরলিপি পদ্ধতি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করা।
এর বিশেষত্ব ও উদাহরণ:
কোমল স্বর: স্বরের নিচে একটি আড়াআড়ি রেখা বা হসন্ত ব্যবহার করা হয়। যেমন: <u>রে</u> <u>গা</u> <u>ধা</u> <u>নি</u> (অথবা আপনার নোটেশন অনুযায়ী ঋ গ ধ ন)।
তীব্র স্বর: তীব্র মধ্যম বোঝাতে স্বরের উপরে খাড়া রেখা দেওয়া হয়। যেমন: মা’ (অথবা হ্ম)।
সপ্তক চিহ্ন: মন্দ্র সপ্তক (নিচু) হলে স্বরের নিচে বিন্দু (যেমন: নি.) এবং তারা সপ্তক (উঁচু) হলে স্বরের উপরে বিন্দু (যেমন: সা’) দেওয়া হয়।
তাল ও মাত্রা: তালের ‘সম’ বোঝাতে ‘X’ এবং ‘খালি’ বোঝাতে ‘০’ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
মিড় (Glissando): দুটি স্বরের উপরে একটি বক্ররেখা বা ধনুক আকৃতির চিহ্ন দেওয়া হয়। যেমন: (পা রে)। এর অর্থ ‘পা’ থেকে ‘রে’ স্বর পর্যন্ত গড়িয়ে আসা।
লেআউট:
| স্বর বা চিহ্নের অবস্থান | উদাহরণ (বাংলা হরফে) | টেকনিক্যাল নোট | |
| শুদ্ধ স্বর | কোনো চিহ্ন ছাড়াই সাধারণ স্বর | সা রে গা মা | স্বাভাবিক গলার স্বর |
| কোমল স্বর | স্বরের নিচে আড়াআড়ি দাগ | <u>রে</u> <u>গা</u> <u>ধা</u> <u>নি</u> | অথবা: ঋ গ ধ ন |
| তীব্র স্বর | স্বরের উপরে খাড়া রেখা | মা’ বা ম্ট | কেবল ‘মা’ তীব্র হয় (হ্ম) |
| মন্দ্র সপ্তক | স্বরের নিচে বিন্দু | নি़ ধা़ পা़ | উদারা বা নিচু পর্দা |
| তারা সপ্তক | স্বরের উপরে বিন্দু | সা̇ রে̇ গা̇ | উচ্চ বা চড়া পর্দা |
| সম (১ম মাত্রা) | বিভাগের উপরে X চিহ্ন | X | তালের শুরুর জোর |
| খালি | বিভাগের উপরে ০ চিহ্ন | ০ | যেখানে তালি পড়ে না |
| মিড় | স্বরগুলোর উপরে ধনুক | (পা রে) | স্বরকে টেনে গড়িয়ে আনা |
১. উঁচু বা তারা সপ্তক: সঁ (মাথায় টিপ বা বিন্দু)
২. নিচু বা মন্দ্র সপ্তক: স़ (নিচে বিন্দু)
৩. কোমল স্বর: <u>রে</u> (নিচে আন্ডারলাইন বা হসন্ত)
৪. তীব্র স্বর: ম’ (মাথায় খাড়া দাড়ি বা রেফ-এর মতো)
সহজভাবে বুঝতে চাইলে:
- উঁচু স্বর (তারা): স্বরের উপরে একটি বিন্দু থাকে। (যেমন: স̇)
- নিচু স্বর (মন্দ্র): স্বরের নিচে একটি বিন্দু থাকে। (যেমন: স़)
- কোমল স্বর: স্বরের নিচে একটি আড়াআড়ি দাগ থাকে। (যেমন: <u>রে</u> বা ঋ)
- তীব্র স্বর: স্বরের উপরে একটি খাড়া দাড়ি থাকে। (যেমন: ম’ বা হ্ম)
২. পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পালুস্কর পদ্ধতি (V.D. Paluskar System)
এই পদ্ধতিটি ভাতখণ্ডে পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং গাণিতিক। এটি প্রধানত ‘গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়’ সংশ্লিষ্ট ঘরানাগুলোতে ব্যবহৃত হয়।
এর বিশেষত্ব ও উদাহরণ:
স্বর চিহ্ন: এখানে কোমল স্বরের নিচে কোনো রেখা থাকে না, বরং শুদ্ধ স্বরগুলোকে সাধারণ রাখা হয় এবং বিকৃত স্বর বোঝাতে ভিন্ন সংকেত ব্যবহার করা হয়।
মাত্রার সূক্ষ্মতা: পালুস্কর পদ্ধতিতে ১/২ মাত্রা, ১/৪ মাত্রা বা ১/৮ মাত্রার জন্য পৃথক পৃথক চিহ্ন আছে।
যেমন: একটি স্বরের নিচে ‘০’ চিহ্ন থাকলে তার মান ১/২ মাত্রা।
স্বরের নিচে ‘∪’ (চন্দ্রবিন্দু আকৃতির) চিহ্ন থাকলে তা ১/৪ মাত্রা।
তাল চিহ্ন: এই পদ্ধতিতে ‘সম’ বা ‘খালি’র জন্য X বা ০ ব্যবহার করা হয় না। বরং তালের প্রতিটি বিভাগের শুরুতে মাত্রার সংখ্যা (১, ২, ৩…) লেখা হয়। সম বোঝাতে সাধারণত ‘১’ লেখা হয়।
কেন এটি কঠিন? এটি পড়তে হলে গাণিতিক হিসাব মাথায় রাখতে হয়, তাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ভাতখণ্ডে পদ্ধতির মতো জনপ্রিয় হতে পারেনি।
৩. আকারমাত্রিক স্বরলিপি পদ্ধতি (Akarmatrik Notation)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই পদ্ধতিটি মূলত বাংলা গানে (রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি) ব্যবহৃত হলেও এর সরলতার জন্য শাস্ত্রীয় সংগীতেও অনেক সময় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এর বিশেষত্ব ও উদাহরণ:
- আকার চিহ্ন (।): এই পদ্ধতিতে ১ মাত্রা বোঝাতে স্বরের পরে একটি দাড়ি বা ‘আ’ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। যেমন: সা –।
- কোমল ও তীব্র স্বর: স্বরের নিচে হসন্ত (সা্) দিয়ে কোমল এবং স্বরের মাথায় ঋজু রেখা (সাঁ) দিয়ে তীব্র স্বর বোঝানো হয় (রবীন্দ্রসংগীতে এর প্রয়োগ কিছুটা ভিন্ন)।
- সপ্তক চিহ্ন: মন্দ্র সপ্তকের জন্য স্বরের নিচে হসন্ত এবং তারা সপ্তকের জন্য স্বরের উপরে রেফ দেওয়া হয়। যেমন: র্স (তারা সপ্তক)।
- বন্ধন: একাধিক স্বর এক মাত্রায় থাকলে তাদের নিচে বক্ররেখা দেওয়া হয়।
৪. স্টাফ নোটেশন (Staff Notation – পাশ্চাত্য পদ্ধতি)
আধুনিক কালে অনেক উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী বিশ্বজনীন পরিচিতির জন্য পশ্চিমা স্টাফ নোটেশন ব্যবহার করেন।
- এখানে পাঁচটি সমান্তরাল রেখার (Staff) ওপর ‘ক্লেফ’ (Clef) বসিয়ে স্বরলিপি লেখা হয়।
- ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘সা’ কে পশ্চিমা ‘C’ বা ‘C#’ স্কেলের সাথে তুলনা করে ‘কি সিগনেচার’ (Key Signature) ঠিক করা হয়।
- সুবিধা: এটি ব্যবহার করলে একজন অভারতীয় বা পশ্চিমা সংগীতশিল্পীও ভারতীয় রাগের কাঠামো বুঝতে পারেন।
স্বরলিপি পদ্ধতির একটি তুলনামূলক ছক
| বৈশিষ্ট্য | ভাতখণ্ডে পদ্ধতি | পালুস্কর পদ্ধতি | আকারমাত্রিক পদ্ধতি |
| কোমল স্বর | নিচে রেখা (<u>গা</u>) | চিহ্নের ভিন্নতা | স্বরের সাথে সংকেত (গ) |
| তীব্র স্বর | উপরে খাড়া রেখা (হ্ম) | উপরে ভিন্ন চিহ্ন | মাথার ওপর রেফ বা চিহ্ন |
| মন্দ্র সপ্তক | নিচে বিন্দু (সা.) | মাথার ওপর চিহ্ন | নিচে হসন্ত (সা্) |
| তারা সপ্তক | উপরে বিন্দু (সা’) | মাথার ওপর চিহ্ন | উপরে রেফ (র্সা) |
| সম/১ম মাত্রা | X চিহ্ন | ১ (সংখ্যা) | আলাদা কোনো চিহ্ন নেই |
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে স্বরলিপি কেবল একটি গাইড। ওস্তাদরা বলতেন, “স্বরলিপি দেখে গান শেখা মানে বই পড়ে রান্না শেখা।” অর্থাৎ ম্যাপে রাস্তা দেখা যায় কিন্তু সেই রাস্তার চড়াই-উতরাই অনুভব করা যায় না। ভাতখণ্ডে পদ্ধতি আমাদের আধুনিক সংগীত শিক্ষার মেরুদণ্ড, তবে সূক্ষ্ম শ্রুতি এবং রাগের প্রাণ বুঝতে হলে এখনো গুরু-শিষ্য পরম্পরায় শ্রবণ ও অভ্যাসের বিকল্প নেই।

স্বরের রূপ: শুদ্ধ ও কোমল স্বর চেনার কৌশল
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে ১২টি স্বর ব্যবহৃত হয় (৭টি শুদ্ধ ও ৫টি বিকৃত)। স্বরলিপিতে এগুলো চেনার সহজ কৌশল নিচে দেওয়া হলো:
- শুদ্ধ স্বর (Natural Notes): সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি। ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে শুদ্ধ স্বরের সাথে কোনো বাড়তি চিহ্ন থাকে না (যেমন: সা রে গা)।
- কোমল স্বর (Flat Notes): রে, গা, ধা, নি—এই চারটি স্বর শুদ্ধের চেয়ে এক ধাপ নিচে নামলে কোমল হয়। ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে স্বরের নিচে একটি আড়াআড়ি রেখা বা হসন্ত দিয়ে এটি বোঝানো হয় (যেমন: ঋ গ ধ ন)। আপনার ব্যবহৃত নোটেশনে এগুলোকে ঋ, গ, ধ, ন হিসেবেও দেখা যায়।
- তীব্র বা কড়ি স্বর (Sharp Note): কেবল ‘মা’ স্বরটি শুদ্ধের চেয়ে এক ধাপ উঁচুতে গেলে তীব্র হয়। ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে স্বরের ওপরে একটি খাড়া রেখা দিয়ে এটি বোঝানো হয় (যেমন: হ্ম)।
সংক্ষিপ্ত রূপ ও ইংরেজি প্রতীক
ষড়জ (সা) = S, ঋষভ (রে) = R, গান্ধার (গা) = G, মধ্যম (মা) = M, পঞ্চম (পা) = P, ধৈবত (ধা) = D, এবং নিষাদ (নি) = N। বিকৃত স্বর বোঝাতে ইংরেজি ছোট হাতের অক্ষর (r, g, m, d, n) বা চিহ্নের সাহায্য নেওয়া হয়।

সপ্তক বা অকটেভ (Octave) চেনার উপায়
সংগীতে সাধারণত তিনটি প্রধান সপ্তক ব্যবহৃত হয়:
১. উদারা (মন্দ্র সপ্তক): স্বাভাবিকের চেয়ে নিচু স্বর। ভাতখণ্ডে পদ্ধতিতে স্বরের নিচে একটি বিন্দু দেওয়া হয় (যেমন: ন্ সঁ)। আপনার ব্যবহৃত নোটেশনে এটি ন# বা স# হিসেবেও থাকতে পারে।
২. মুদারা (মধ্য সপ্তক): স্বাভাবিক গলার স্বর। এতে স্বরের সাথে কোনো অতিরিক্ত চিহ্ন থাকে না (যেমন: স র গ)।
৩. তারা (উচ্চ সপ্তক): স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু স্বর। স্বরের ওপরে একটি বিন্দু বা রেফ দিয়ে তা নির্দেশ করা হয় (যেমন: র্স র্র র্গ)। আপনার ব্যবহৃত নোটেশনে এটি স* হিসেবেও দেখা যায়।
তাল ও মাত্রার চিহ্ন
স্বরলিপিতে তালের গঠন বোঝানোর জন্যও বিভিন্ন চিহ্ন ব্যবহৃত হয়:
সম (তালের প্রথম মাত্রা): ‘X’ বা ‘১’ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
খালি: ‘০’ চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়।
তালি: ২, ৩, ৪ ইত্যাদি সংখ্যা দিয়ে তালের অন্যান্য তালি বা বিভাগ চিহ্নিত করা হয়।
স্বরলিপি শেখার গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা
স্বরলিপি সংগীতের একটি গাইড ম্যাপ হিসেবে কাজ করে। কোনো নতুন বন্দিশ বা খেয়াল শেখার সময় এটি সুরের মূল কাঠামো মনে রাখতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে যে, স্বরলিপি কেবল সুরের কঙ্কাল বা কাঠামো নির্দেশ করে। সংগীতের সূক্ষ্ম অলংকার যেমন—মীড়, গমক, কান বা গিটকিরি—এসব কেবল লিখে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। তাই সংগীত শেখার ক্ষেত্রে শোনা, অনুকরণ করা এবং নিয়মিত রিয়াজ করা সবসময়ই অপরিহার্য।
নিচের লিংকগুলো আপনাকে আরও ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করবে:
আরও দেখুন:
