আমাদের লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডারে ‘ভাটিয়ালি’ কেবল একটি গানের ধারা নয়; এটি আসলে বাংলার নদী আর মানুষের আত্মার এক পরম আকুতি। এই গানের প্রধান জাদুটাই হলো এর সুরের দীর্ঘ টান আর ধীর লয়। নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে যখন মাঝিমাল্লাদের নৌকা নদীর ভাটির টানে ভেসে যেত, তখন তাঁদের আর আলদা করে বৈঠা বাইতে হতো না। মনের সুখে, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে অলস অবসরে তাঁরা গলা ছেড়ে লম্বা টানে গান ধরতেন। কালক্রমে মাঝিদের সেই মনের আনন্দের গানই আজকের বিশ্বখ্যাত ‘ভাটিয়ালি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। আমাদের বাংলাদেশের বিশেষ করে ময়মনসিংহ এবং সিলেট অঞ্চলের নদীবহুল এলাকায় এই গানের চল সবচেয়ে বেশি।

ভাটিয়ালি
ভাটিয়ালির অন্দরমহল: প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা
ভাটিয়ালি মূলত একজন শিল্পীর একক কণ্ঠে গাওয়ার গান। এই গানের মূল থিম বা বিষয়বস্তু হলো প্রেম এবং পরম ঈশ্বর। এর একদিকে যেমন আছে রক্ত-মাংসের মানুষের লৌকিক প্রেম-বিরহ, অন্যদিকে তেমনি আছে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক দেহতত্ত্ব ও সুফি চেতনা।
বিষয় আর গায়েনভেদে ভাটিয়ালির অনেক ধরণ বা শ্রেণীবিভাগ আছে। এক সময় আমাদের বাংলাদেশে ভাটিয়ালি গানের অন্তত পাঁচটি আলাদা আলাদা ধাঁচ বা ঘরানা প্রচলিত ছিল। তবে দুঃখের বিষয়, সময়ের বিবর্তনে এই ধাঁচগুলোর সব ক’টি এখন আর তেমন একটা চর্চা হয় না। বর্তমানে আমরা সচরাচর যে ‘মুর্শিদি’ বা ‘বিচ্ছেদী’ গান শুনি, এগুলো কিন্তু আদতে এই ভাটিয়ালি সুরেরই একেকটা রূপ। এমনকি আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য—বিশেষ করে ‘গাজীর গান’-এর বিভিন্ন পর্বেও ভাটিয়ালির চমৎকার ব্যবহার চোখে পড়ে।

প্রাচীন ইতিহাস ও সুরের প্রয়োগ
অনেক সময় বাংলা লোকগানের কোনো বিশেষ চরণের সুর কেমন হবে, তা বোঝাতেও ‘ভাটিয়ালি’ শব্দটির প্রয়োগ করা হয়। যেমন আমাদের পালাগান বা পাঁচালির বন্দনা অংশে দেখা যায়—প্রথম লাইনটি গাওয়া হয় ‘উজান’ সুরে আর দ্বিতীয় লাইনটি গাওয়া হয় ‘ভাইটাল’ বা ভাটিয়ালি সুরে। একটা উদাহরণ দিলে সহজে বুঝতে পারবেন:
“পুবেতে বন্দনা করলাম পুবের ভানুশ্বর। একদিকে উদয়রে ভানু চৌদিকে পশর…”

আমাদের লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন আঞ্চলিক গানেও এই ভাটিয়ালি সুরের একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীন বাংলাতেও ‘ভাটিয়ালি রাগ’-এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। মধ্যযুগের বিখ্যাত ‘সেখশুভোদয়া’ গ্রন্থে থাকা ভাদু গানগুলো এই ভাটিয়াল রাগেই গাওয়া হতো। এমনকি বড়ু চণ্ডীদাসের অমর সৃষ্টি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এও স্পষ্ট করে ভাটিয়ালি গানের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, আমাদের নদী আর সুরের এই মিতালী শত শত বছরের পুরনো।
আরও দেখুন:
