ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাদের আগ্রহ আছে, তারা নিশ্চয়ই স্বাধীন ভারতের অত্যন্ত আলোচিত “হিন্দু কোড বিল [Hindu Code Bill]”-এর কথা শুনেছেন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরপরই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ক্যাবিনেট হিন্দু সমাজ সংস্কারের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই সংস্কারের বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে—১৯৪১ সালে ব্রিটিশ আমলেই স্যার বি. এন. রাও-এর নেতৃত্বে গঠিত ‘রাও কমিটি’র মাধ্যমে, যাদের দায়িত্ব ছিল হিন্দু আইনের একটি অভিন্ন খসড়া তৈরি করা। স্বাধীন ভারতে সেই অসমাপ্ত কাজেরই দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় ড. বি. আর. আম্বেদকরের কাঁধে।
বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা, নারীদের তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের আইনি অধিকার দেওয়া, পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমান উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং ভিন্ন জাতের মধ্যে বিয়েকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো এই বিলে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে চলে আসা সনাতনী কুসংস্কার, ধর্মের নামে নারীদের অধিকারহরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক অনাচার বন্ধ করাই ছিল এই বিলের মূল উদ্দেশ্য।
বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত, ইতিহাস, আইন ও সমাজবিজ্ঞানে সুপণ্ডিত এবং ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী ড. বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন এই বিলের প্রধান রূপকার। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর পূর্ণ সমর্থনে তিনি দীর্ঘ খেটে বিলটি প্রস্তুত করে সংসদে উত্থাপন করেন।
কিন্তু বিলটি উত্থাপনের পরপরই পুরো ভারতজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। যথারীতি মৌলবাদী হিন্দু সংগঠনগুলো এর বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে আসে। আরএসএস (RSS), হিন্দু মহাসভা এবং স্বামী করপাত্রী মহারাজের মতো হিন্দুত্ববাদী নেতারা একজোট হয়ে দেশজুড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেন। তাদের যুক্তি ছিল— হিন্দু সমাজের আইন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বেদ ও মনুস্মৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; কোনো সাধারণ মানুষের এই বিষয়ে নতুন আইন করার অধিকার নেই। রক্ষণশীলরা প্রচার করতে থাকে যে, মেয়েদের সম্পত্তির ভাগ দিলে ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে এবং তালাক প্রথা চালু হলে হিন্দু বিবাহ আর ‘জন্ম-জন্মান্তরের পবিত্র বন্ধন’ থাকবে না।
সংসদের ভেতরেও শুরু হয় তুমুল ঝড়। নেহরুর নিজ ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ও হিন্দু মহাসভার তৎকালীন শীর্ষ নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (যিনি পরবর্তীতে আজকের বিজেপির পূর্বসূরি ‘ভারতীয় জনসংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন) এই বিলের ঘোর বিরোধিতা করেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলেন, এই বিল হিন্দু সমাজের চিরন্তন পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেবে। এমনকি খোদ ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং কংগ্রেসের লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলও এই বিলের তীব্র বিরোধী ছিলেন। রাজেন্দ্র প্রসাদ তো একপর্যায়ে নেহরুকে কড়া চিঠি দিয়ে বিলে স্বাক্ষর না করার সরাসরি হুমকি দিয়ে বসেন!
এর বিপরীতে নারী অধিকারকর্মীরাও সরব ছিলেন। অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স (AIWC)-এর মতো সংগঠনগুলো এই বিলের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। রাজকুমারী অমৃত কৌর, হংসা মেহতা এবং দুর্গাবাঈ দেশমুখের মতো প্রগতিশীল নারীনেত্রীরা আম্বেদকরের এই বিলটিকে হিন্দু নারীদের মুক্তির সনদ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর পক্ষে প্রচার চালান।
ড. আম্বেদকর সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ক্ষুরধার যুক্তিতে রক্ষণশীলদের জবাব দেন। তিনি বলেন,
“হিন্দুধর্মের সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত সংঘাত নেই। কিন্তু সমস্যা হলো শাস্ত্রের মনগড়া ও সুবিধাবাদী ব্যাখ্যা নিয়ে। যুগে যুগে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধামতো শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে সমাজের নানা বৈষম্য ও কুকর্মের বৈধতা দিয়েছে। একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন আইনি কাঠামো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করলে এই সামাজিক অনাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।”
এই যুক্তিতে বিরোধীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আম্বেদকর ও তাঁর সরকারকে ‘নাস্তিক’, ‘ধর্মবিরোধী’ এবং ‘সেকুলারাইটিস’ নামক কাল্পনিক রোগে আক্রান্ত বলে প্রচার করা হয়। যারা সরাসরি মৌলবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা পেতেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঘোর রক্ষণশীল ছিলেন, তারা একটু ভিন্নভাবে সমালোচনা শুরু করেন। তাদের যুক্তি ছিল— শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য আইন বানানো কতটা যৌক্তিক? একাধিক বিয়ে করা যদি হিন্দুদের জন্য অবৈধ হয়, তবে মুসলমানদের জন্য তা বৈধ থাকবে কেন? সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ধর্মীয় আইনে হাত দেওয়া হলেও সরকার কি মুসলিম বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ভয় পায়? (এই প্রশ্নটিই মূলত আজকের ভারতের ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বা ইউসিসি বিতর্কের আদি রূপ)। নেহরু ও আম্বেদকরের যুক্তি ছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজকে সংস্কারের মাধ্যমেই দেশের মূল ভিত্তি আগে মজবুত করতে হবে, সংখ্যালঘুদের সংস্কারের জন্য তাদের আরও কিছুটা সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রস্তুতির প্রয়োজন।
চতুর্মুখী চাপে এবং আসন্ন প্রথম সাধারণ নির্বাচনের (১৯৫১-৫২) কথা ভেবে কংগ্রেসের অনেক নেতা ঘাবড়ে যান। দলের ভেতরে বিদ্রোহ সামাল দিতে নেহরু বাধ্য হয়ে বিলটি পাসের প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে ধীর করে দেন।
এই আপস মানতে পারেননি নীতিবান ড. আম্বেদকর। ক্ষোভে, অভিমানে এবং হতাশায় ১৯৫১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আইনমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন যে, নারী ও দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নেহরু সরকারের এই আপসকামী মনোভাব তাকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।
বছরখানেক পরেই শুরু হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ওই ‘হিন্দু কোড বিল’। হিন্দুত্ববাদীরা এই নির্বাচনকে ধর্মরক্ষার যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করে। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের ফুলপুর আসনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বিরুদ্ধে তারা প্রার্থী করে সে সময়ের বিখ্যাত সাধু প্রভু দত্ত ব্রহ্মচারীকে। মজার বিষয় হলো, প্রভু দত্ত ব্রহ্মচারী নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছিলেন ‘মৌনব্রত’ (না কথা বলার শপথ) পালন করে! তিনি মুখে কিছু না বলে লিফলেট বিলি করতেন, যার মূল কথাই ছিল—
‘নেহরুকে ভোট দেওয়া মানে হিন্দু ধর্মকে ধ্বংস করা’।
হিন্দুবাদী নেতার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, আবেগপূর্ণ প্রচারণা এবং কংগ্রেসের ভেতরের কোন্দল দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন নেহরুর হার হয়তো অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু নির্বাচনের ময়দানে নেহরু এক ইঞ্চিও ছাড় দেননি। তিনি প্রতিটি জনসভায় বুক ফুলিয়ে হিন্দু কোড বিলের পক্ষে কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এই সামাজিক সংস্কার তারা করবেই।
লম্ফঝম্প আর ধর্মের দোহাই যতই থাকুক, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে জওহরলাল নেহরুকেই জয়যুক্ত করে। প্রভু দত্ত ব্রহ্মচারী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে।
নেহরু তাঁর কথা রেখেছিলেন। তবে এবার তিনি ড. আম্বেদকরের সেই বিশাল ও জটিল বিলটিকে কৌশলগত কারণে চারটি ছোট ও সুনির্দিষ্ট আইনে ভাগ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে— হিন্দু বিবাহ আইন, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, হিন্দু দত্তক ও ভরণপোষণ আইন এবং হিন্দু নাবালক ও অভিভাবকত্ব আইন— সংসদে সফলভাবে পাস হয়। সমাজ সংস্কারের এক নতুন যুগে প্রবেশ করে ভারত।
আজ বহু বছর পার হয়ে গেছে। উত্তাল সেই দিনগুলো এখন শুধুই ইতিহাস। আধুনিক ভারত আজ ড. আম্বেদকরকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তিনি আজ দলিত ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ হিসেবে পূজিত। এমনকি আজকের চরম ডানপন্থী বিজেপি সরকারও তাঁর এই সামাজিক সংস্কারকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখে। কিন্তু নির্মম সত্যটি হলো, জীবিতাবস্থায় এই মহান মানুষটিকে ‘দেশদ্রোহী’, ‘নাস্তিক’ আর ‘হিন্দু-বিদ্বেষী’র মতো বিষাক্ত গালি শুনে এবং বুকভরা অভিমান নিয়েই রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
সমসাময়িক এই ইতিহাস থেকে আজকের দিনের রাজনীতিকদের অনেক কিছু শেখার আছে। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা নেওয়া উচিত আমাদের সাধারণ জনগণের। আমাদের মনে রাখতে হবে— ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা ঐতিহ্যের নামে সমাজে সাময়িক উন্মাদনা যত প্রবলই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতারই জয় হয়। অন্ধ আবেগে গা ভাসিয়ে ভুল পথে হাঁটলে তাকে হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য ধর্মরক্ষা বা বিশাল জয় বলে মনে হতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজের জন্য এক চরম পরাজয় হয়েই দেখা দেয়।
আও পড়ুন:




