শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন । অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮) । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অনন্যা ও বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। সুদীর্ঘকাল ধরে এই পাহাড়ি জনপদ ছিল মূলধারার উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত এবং এক রক্তাক্ত ও সংঘাতময় অধ্যায়ের অংশ। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক, দূরদর্শী ও যুগান্তকারী ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটে এবং শান্তির নতুন সূর্য উদিত হয়। এই চুক্তির মূল চেতনাকে ধারণ করে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এক দশকে শেখ হাসিনা সরকারের বলিষ্ঠ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাতি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধিত হয়েছে।

বিগত এক দশকে শেখ হাসিনার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক রাষ্ট্রীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে নানামুখী সমন্বিত ও টেকসই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF)-এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে স্থাপিত ৪,০০০টি পাড়াকেন্দ্র প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার প্রায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানির মতো মৌলিক নাগরিক সেবা প্রদান করে এক নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে আবাসন, খাদ্য ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান পাহাড়ের পশ্চাদপদ নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মূলধারার শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করেছে।

ভৌগোলিক জটিলতার কারণে যেসব দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড পৌঁছানো অসম্ভব ছিল, সেখানে সরকার সৌরবিদ্যুতের (Solar Energy) আলো পৌঁছে দিয়ে অন্ধকার দূর করেছে। হাজার হাজার পরিবারের ঘরে সোলার হোম সিস্টেম ও দুর্গম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সোলার কমিউনিটি সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে পাহাড়ি জীবনে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (২য় পর্যায়) মাধ্যমে শত শত কিলোমিটার পাকা রাস্তা, কালভার্ট, সিঁড়ি ও পানি সেচ ব্যবস্থা নির্মাণের ফলে কৃষি বিপণন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। জুম চাষের সনাতন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পাহাড়ি ঢালে মিশ্র ফল চাষের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষকদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষা, ঐতিহ্যগত স্থানীয় প্রশাসনকে (সার্কেল চিফ, হেডম্যান ও কারবারী) শক্তিশালীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই জনপদকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সাফল্যের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো।

Table of Contents

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন । অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "পার্বত্য চট্টগ্রাম" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

১. ইউনিসেফ ও সরকারি অর্থায়নে সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন ও পাড়াকেন্দ্রের বিপ্লব

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মানোন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ (UNICEF)-এর যৌথ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প’ (৩য় পর্যায়) বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩২০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পটি পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।

৪,০০০ পাড়াকেন্দ্রের সামাজিক নেটওয়ার্ক:

এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডমার্ক অর্জন হলো প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ৪,০০০টি ‘পাড়াকেন্দ্র’ (Para Center) স্থাপন। এই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের ১,৬৫,৩৪৩টি সুবিধাভোগী পরিবারকে একই ছাতার নিচে শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিশুর পুষ্টি, সুপেয় পানি এবং উন্নত স্যানিটেশন বা পয়ঃব্যবস্থার মতো অতিপ্রয়োজনীয় মৌলিক সেবাগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রদান করা হচ্ছে।

দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:

এই বিশাল সামাজিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও স্থানীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩টি বড় আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্পূর্ণ মেরামত ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ৫,১০৯ জন পাড়াকর্মীকে মৌলিক পেশাদারিত্বের প্রশিক্ষণ, ৪,৩৪২ জন পাড়াকর্মীকে দক্ষতা নবায়নের লক্ষ্যে সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণ এবং ৪০৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ৩২,৮৪০ জন স্থানীয় কর্মীকে দীর্ঘমেয়াদি চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

২. পাহাড়ের তৃণমূল শিক্ষায় নতুন দিগন্ত ও শিশু বিকাশ

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এবং ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনতে শেখ হাসিনা সরকার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে।

শিশু বিকাশ ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা:

৩ থেকে ৫ বছর বয়সী পাহাড়ি শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে ৪,০০০টি পাড়াকেন্দ্রে ‘শিশু বিকাশ ও প্রাক-শিক্ষা কর্মসূচি’ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় ১,৭৩,১৬৫ জন শিশুকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ৪,০০০টি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আকর্ষণীয় ও আধুনিক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে এই প্রি-স্কুলগুলোতে ৫৪,০০০-এর বেশি শিশু অধ্যয়নরত এবং এই পাড়াকেন্দ্রগুলোর সফল দীক্ষা শেষে এ পর্যন্ত ২ লক্ষাধিক শিশু সফলভাবে মূলধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

অনগ্রসর নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি ও আবাসন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রতি বছর ১,০০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে খাদ্য, আবাসন, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হচ্ছে। এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোনো অর্থনৈতিক বাধা ছাড়াই মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। এই বিশেষ আবাসিক বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রকল্পসমূহ থেকে এ পর্যন্ত ১,১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সফলভাবে এস.এস.সি (SSC) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেছে।

৩. জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ন্ত্রণ

পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে একসময় সাধারণ ও প্রতিরোধযোগ্য রোগেই বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটত। বিগত এক দশকে পাড়াকেন্দ্র ও মোবাইল হেলথ টিমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

টিকাদান ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ:

পাহাড়ি এলাকায় প্রতিরোধযোগ্য বিভিন্ন সংক্রামক রোগের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা এবং রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia) প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকার সকল শিশু, বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোরী, মহিলা ও গর্ভবতী মায়েদের শতভাগ টিকাদানের আওতায় আনতে ব্যাপক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে।

ভিটামিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট বিতরণ:

পাড়াকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী ৯৪,৭২৪ জন অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে নিয়মিত ভিটামিন-মিনারেল সমৃদ্ধ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পাউডার সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা এবং কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিপুল পরিমাণ আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। প্রসূতি মায়েদের অন্ধত্ব ও অপুষ্টি দূরীকরণের লক্ষ্যে ১,২২,৪৩৫ জনকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং ৮১,৭১০ জন কিশোরীকে নিয়মিত কৃমিনাশক বড়ি প্রদান করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবার এই প্রাতিষ্ঠানিক মানোন্নয়নের জন্য ৫৩৪ জনকে ডিএনআই (DNI) প্রশিক্ষণ এবং ২,০৪৫ জনকে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য উদ্যোগ (MNHI) সংক্রান্ত বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

৪. নিরাপদ পানি ও উন্নত পয়ঃব্যবস্থা (Sanitation) উন্নয়ন

পাহাড়ের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সংকট হলো বিশুদ্ধ সুপেয় পানির অভাব। ঝর্ণা বা ছড়ার অনিরাপদ পানি ব্যবহারের ফলে অতীতে পাহাড়ি এলাকায় ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব লেগেই থাকত। এই সংকট দূরীকরণে সরকার ব্যাপক পরিকাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে।

সুপেয় পানির পরিকাঠামো:

প্রত্যন্ত ও খরাপ্রবণ পাহাড়ি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ নিরাপদ পানি উত্তোলনের জন্য ১২০টি নতুন গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং অকেজো নলকূপসমূহ সংস্কার করা হয়েছে। পানির উৎসগুলো দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখার জন্য ১,৩৫০ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে কেয়ারটেকার বা রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের হাতে প্রয়োজনীয় কারিগরি ‘টুলবক্স’ তুলে দেওয়া হয়েছে।

স্যানিটেশন ও হাইজিন ডিভাইস:

স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৫,৪২৩টি স্বল্পব্যয়ী ও আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা (Latrine) সরবরাহ ও স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন পাড়াকেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১,২০৫টি আধুনিক হ্যান্ড ওয়াশিং ডিভাইস (Hand Washing Device) স্থাপন করা হয়েছে। এই সফল সামাজিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সরকার ৪১৭.০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৮ থেকে ২০২১ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও যুগান্তকারী নতুন মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "পার্বত্য চট্টগ্রাম" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

 

৫. বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তর: সোলার হোম ও কমিউনিটি সিস্টেমের আলো

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম বড় ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ ছিল খাড়া পাহাড়, গভীর গিরিখাত এবং দুর্গম অরণ্য। এই ভূ-প্রাকৃতিক জটিলতার কারণে শত শত বছর ধরে যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের লাইন বা খুঁটি পৌঁছানো সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল, সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) আলো পৌঁছে দেওয়ার এক দূরদর্শী মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেন। মোট ৭,৬০৬.৩১ লক্ষ (১ম সংশোধিত) টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৫ থেকে জুন ২০১৯ মেয়াদে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।

পাহাড়ের অন্ধকার দূরীকরণ:

এই প্রকল্পের আওতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বান্দরবান জেলায় ২৩৬টি, রাঙামাটি জেলায় ১২০টি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় ১২০টি সহ মোট ৪৭৬টি ‘৬৫ ওয়াট পিক’ ক্ষমতার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার হোম সিস্টেম (Solar Home System) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্থাপন করা হয়। এই আধুনিক প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ৪৪০ জন স্থানীয় সুবিধাভোগীকে সোলার সিস্টেমের কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ ব্যবহারবিধির ওপর নিবিড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

সোলার লাইটিংয়ের ব্যাপক সম্প্রসারণ:

এর পরবর্তী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রকল্পের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে ২,৪৪৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাড়াগুলোতে এক বিশাল বিদ্যুৎ বিপ্লব ঘটানো হয়। এই সময়ে বান্দরবান জেলায় ২,১২৪টি, রাঙামাতি জেলায় ১,৭৫৩টি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় ১,৫৩৭টি সহ সর্বমোট ৫,৪১৪টি ‘৬৫ ওয়াট পিক’ ক্ষমতার সোলার হোম সিস্টেম সফলভাবে সরবরাহ ও স্থাপন করা হয়। একই সাথে ৩,৪০০ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা পাহাড়ি যুবকদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে।

সাজেক রুইলুই প্রকল্প ও শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন:

রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম ও বিখ্যাত পর্যটন অঞ্চল সাজেক ভ্যালির ‘রুইলুই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ পাহাড়ি শিশুদের আধুনিক মাল্টিমিডিয়া সমৃদ্ধ ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের (Multimedia Classroom) স্বপ্ন পূরণ করে সরকার। এর জন্য বিদ্যালয়টিতে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনায় ২৪টি ‘২৫০ ওয়াট পিক’ ক্ষমতার শক্তিশালী সোলার কমিউনিটি সিস্টেম (Solar Community System) স্থাপন করা হয়। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবে (RDPP) আরও ৫,০০০টি সোলার হোম সিস্টেম, ৫,৮৯০টি সোলার মোবাইল চার্জার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২ ওয়াট পিকের পরিবর্তে ৩২ ওয়াট পিকের ২,৩১৫টি শক্তিশালী সোলার কমিউনিটি সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স:

পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতীয় স্তরে তাঁদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল সমন্বয় কেন্দ্র হিসেবে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স’ (CHT Complex) নির্মাণ ও উদ্বোধন করেন। এটি সমতল ও পাহাড়ের জাতিগত মনস্তাত্ত্বিক সেতুবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক।

৬. পাহাড়ি অর্থনীতিতে মিশ্র ফল চাষের বৈপ্লবিক জোয়ার

সনাতন ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জুম চাষের ওপর থেকে একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে পাহাড়ি ঢালু জমির সঠিক ব্যবহার এবং স্থানীয় কৃষকদের স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যে সরকার কৃষি বিজ্ঞানের আধুনিক কলাকৌশল প্রবর্তন করে।

কৃষক ও উদ্যোক্তা তৈরি:

‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় মিশ্র ফল চাষ’ প্রকল্পের আওতায় জুলাই ২০১৫ হতে জুন ২০১৮ পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলার মোট ২,৪৬০টি প্রান্তিক পাহাড়ি পরিবারকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল মিশ্র ফলের চারা (যেমন: মাল্টা, কমলা, আম্রপালি আম, কাজুবাদাম ও ড্রাগন ফল) এবং প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সার প্রদান করা হয়।

কৃষি উপকরণ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ:

কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রতিজনকে অত্যাধুনিক কৃষি উপকরণ—১টি করে উন্নত মানের সিকেচার (Secateur/ডাল ছাঁটাইয়ের কাঁচি), ১টি হাসুয়া এবং ১টি প্রেসার স্প্রেয়ার মেশিন (Sprayer Machine) প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি, নির্বাচিত প্রত্যেক পাহাড়ি কৃষককে বিভিন্ন উন্নত জাতের উচ্চমূল্যের সবজি বীজ এবং পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় উদ্যান উন্নয়নের (Horticulture Development) ওপর বিশেষ ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এর ফলে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা দেশের অন্যতম প্রধান ফল উৎপাদনকারী অঞ্চলে রূপান্তরিত হয়।

৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়): অবকাঠামো ও কৃষি সেচের আধুনিকায়ন

পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং উৎপাদিত ফসল সহজে বড় বড় শহরের বাজারে বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে যোগাযোগ ও সেচ পরিকাঠামোর আধুনিকায়ন ছিল অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ অর্থায়নে জুলাই ২০১১ হতে জুন ২০১৯ মেয়াদে ৫১৫.১৮৪৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়)’ বাস্তবায়িত হয়।

যোগাযোগ ও পানি পরিকাঠামো নির্মাণ:

এই প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিগত ৫ বছরে পাহাড়ি খাড়া রাস্তাগুলোকে সুরক্ষিত করে ৮৪.৬২৮ কিলোমিটার টেকসই এইচবিবি (HBB) রাস্তা নির্মাণ করা হয়। পাহাড়ি ছড়া ও নদী থেকে পানি সংরক্ষণের জন্য ১৯টি বিশালাকার ওয়াটার ট্যাংক (Water Tank) এবং খরা মৌসুমে চাষাবাদের জন্য ৩৯,৮৮৮ মিটার (প্রায় ৪০ কিলোমিটার) দীর্ঘ আধুনিক সেচ নালা বা ক্যানেল নির্মাণ করা হয়। এছাড়া পানির অপচয় রোধে ২০৭ মিটার দীর্ঘ টেকসই প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ, ১৯টি জিএফএস (Gravity Flow System/মহাকর্ষীয় প্রবাহ পদ্ধতি) ও আইএফজি ব্যবস্থা এবং ৬টি প্রাকৃতিক ওয়াটারশেড (Watersehed/ক্ষুদ্র জলাধার) ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা হয়।

দুর্গম যোগাযোগে প্রকৌশলগত সমাধান:

পাহাড়ের গভীর গিরিখাত পারাপারের জন্য ৩০১.১৫ মিটার দীর্ঘ ফুটব্রিজ (Footbridge), ৫৭৪.৫০ মিটার কালভার্ট (Culvert) এবং পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনে ৪,০৩২.৯৫ মিটার ইউ-ড্রেন (U-Drain) নির্মাণ করা হয়। দুর্গম পাহাড় বেয়ে নিরাপদে ওঠানামার জন্য ১২,২৪০ মিটার (১২ কিলোমিটারের বেশি) দীর্ঘ আরসিসি সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়, যা পাহাড়ি নারীদের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব করে। কৃষকদের জন্য ১,৭৮১টি আধুনিক পাওয়ার টিলার ও পাওয়ার পাম্প সরবরাহ, ১০টি বড় পুকুর খনন এবং উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য ৯টি বৃহৎ ‘মার্কেট শেড’ বা আধুনিক পাহাড়ি বাজার স্থাপন করা হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির জন্য ১,৫০৭টি গভীর নলকূপ ও ১১৮টি রিংওয়েল স্থাপন করা হয়।

বৈশ্বিক দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:

পাহাড়ি এলাকার মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে ১৫৮টি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং সুবিধাভোগীদের সহায়তায় ৬০০টি ‘ভিলেজ ম্যাপিং ট্রেনিং’ (Village Mapping Training) পরিচালনা করা হয়। মূল্যবান উচ্চমূল্যের শস্য ও ফল উৎপাদনে পাহাড়িদের উৎসাহিত করতে ‘ম্যাট কম্পোনেন্ট’ (MAD Component)-এর আওতায় ২,৪৫৪টি নিবিড় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া, পাহাড়ের পানি ব্যবস্থাপনা ও মাটির ক্ষয় রোধের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ফিলিপাইন, নেপাল এবং গণচীনে সফল স্টাডি ট্যুর (Study Tour) পরিচালনা করা হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে "পার্বত্য চট্টগ্রাম" খাতে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দশ বছর (২০০৯-২০১৮)

৮. ইউএনডিপি (UNDP) ও সিএইচটিডিএফ (CHTDF) প্রকল্পের উন্নয়ন পরিক্রমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিবেশ কাটিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি এবং টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ‘প্রমোশন অফ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কনফিডেন্স বিল্ডিং ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস’ (UNDP-CHTDF) শীর্ষক একটি বৃহৎ ও ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ১,০৯৭.৬৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি অক্টোবর ২০০৩ হতে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়।

শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কার:

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় এই প্রকল্পের আওতায় ৪১টি জরাজীর্ণ বিদ্যালয় সম্পূর্ণ সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয় এবং সুবিধাবঞ্চিত দুর্গম এলাকায় ৪০টি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এছাড়া স্থানীয় পাহাড়ের শিক্ষার মান বাড়াতে ৬১টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের আওতায় আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং ১০৫টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয় উন্নয়ন পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

কৃষক মাঠ স্কুল (Farmer Field School):

পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করতে ৬,২৮০ জন প্রান্তিক চাষিকে আধুনিক চাষাবাদের ওপর নিবিড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে ‘কৃষক মাঠ স্কুল’ নির্বাচন করে সেগুলোর প্রদর্শনী প্লটের (Demonstration Plot) জন্য সরাসরি আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়। ২০১৩ সাল থেকে প্রতিটি কৃষক মাঠ স্কুল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ২৪,০০০ টাকা করে এককালীন অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের পরিবেশগত প্রভাব ও এর আধুনিকায়নের ওপর প্রথম বিজ্ঞানসম্মত গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ:

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ৪টি অত্যন্ত দুর্গম উপজেলায় প্রচলিত সরকারি স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি প্রত্যন্ত পাহাড়ি পাড়াগুলোতে ২৭০ জন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্থানীয় মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী (Community Health Worker) এবং সার্বক্ষণিক মোবাইল মেডিকেল টিমের (Mobile Medical Team) মাধ্যমে ১৪,০০০-এর বেশি মানুষকে উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়।

সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা ও কোল্ড চেইন রক্ষা:

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫৪টি পাড়ার সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার জন্য ৭,৫৯৬ জন প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষককে নিখুঁতভাবে নির্বাচন করে তাঁদের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী ১ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদি প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া, ৮টি উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় যেখানে গ্রিডের বিদ্যুৎ বা সোলার লাইটের সাধারণ ব্যবস্থা ছিল না, সেখানে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন ও ওষুধ সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য ১১টি বিশেষ ‘সোলার ফ্রিজ’ (Solar Fridge) স্থাপন করে এক অভিনব কোল্ড চেইন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়।

ব্যাপক চিকিৎসাসেবা ও মহামারী নিয়ন্ত্রণ:

কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং বিশেষায়িত মোবাইল মেডিকেল টিম যৌথভাবে পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে সর্বমোট ৫,৭৯,০৩৪ জন রোগীকে সাধারণ ও জটিল রোগের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। পাহাড়ি অঞ্চলের চিরকালীন আতঙ্ক ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত ১৭,৪NT২ জন রোগীকে জীবনরক্ষাকারী আধুনিক চিকিৎসা এবং ৯৪,২৯৬ জন রোগীকে ডায়রিয়াজনিত জটিলতার তাৎক্ষণিক সফল চিকিৎসা প্রদান করে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা হয়।

 

৯. সুশাসন, বিকেন্দ্রীকরণ ও ঐতিহ্যবাহী প্রথাবদ্ধ নেতৃত্বের ক্ষমতায়ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল স্থানীয় আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করা এবং পাহাড়ের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক শাসন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা। শেখ হাসিনা সরকার এই শর্তসমূহ পূরণে যুগান্তকারী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

জেলা পরিষদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর:

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ২৮টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস ও বিভাগকে (যেমন: প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি সম্প্রসারণ, যুব উন্নয়ন, সমাজসেবা ইত্যাদি) জেলা পরিষদের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে পাহাড়ের শাসনভার পাহাড়িদের হাতে অর্পিত হয়।

প্রথাবদ্ধ নেতৃত্বের রাষ্ট্রীয় সম্মানি ও মর্যাদা:

পার্বত্য অঞ্চলের শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও বিচারিক প্রধানদের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে সরকার বিশেষ মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করে। এই ব্যবস্থার আওতায় তিন পার্বত্য অঞ্চলের প্রথাগত আঞ্চলিক প্রধান বা ‘সার্কেল চিফ’ (রাজা)-দের মাসিক ১০,০০০ টাকা, মৌজা প্রধান বা ‘হেডম্যান’-দের মাসিক ১,০০০ টাকা এবং পাড়া বা গ্রাম প্রধান তথা ‘কারবারী’-দের মাসিক ৫০০ টাকা হারে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতা প্রদান শুরু হয়, যা স্থানীয় সুশাসন ও ঐতিহ্যগত বিচার ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করে।

টেকসই সামাজিক সেবা প্রকল্প (SID-CHT):

পূর্ববর্তী প্রকল্পের সাফল্যের পর, বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনডিপির যৌথ অর্থায়নে ২৪৯.৮৭ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘স্ট্রেনদ্যানিং ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট ইন সিএইচটি (SID-CHT)’ শীর্ষক নতুন প্রকল্প ফেব্রুয়ারি ২০১৭ হতে সেপ্টেম্বর ২০২১ মেয়াদের জন্য গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের প্রধান কাজ ছিল ১৫,৯৫৬ জন পাহাড়ি কৃষককে ইন্টিগ্রেটেড ফার্ম ম্যানেজমেন্ট (IFM) বা সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার আওতায় কৃষক মাঠ স্কুলের মাধ্যমে সর্বাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা।

১০. ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসন ও জলবায়ু কূটনীতি

শান্তি চুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে যেসব উপজাতীয় পরিবার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশি দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের সসম্মানে স্বদেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসিত করা ছিল শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম বড় মানবিক ও রাজনৈতিক সাফল্য।

শরণার্থীদের স্থায়ী পুনর্বাসন:

‘ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত বিশেষ টাস্কফোর্স’-এর মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁত ও সফল ব্যবস্থাপনায় সর্বমোট ১২,২২৩টি উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁদের নিজেদের জমিজমা ফেরত দেওয়াসহ ঘরবাড়ি নির্মাণ, নগদ আর্থিক অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদি রেশনের ব্যবস্থা করে মূলধারার সমাজের সাথে সম্পূর্ণ পুনর্বাসিত করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবিলা:

ভৌগোলিক গঠনের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবে পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকা পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক তহবিল ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ড’ (GCF)-এর আওতায় বিশেষ দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রশমন কর্মসূচি সফলভাবে গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১১. পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা

২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পার্বত্য অঞ্চলকে বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে শেখ হাসিনা সরকারের বেশ কিছু ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও পরিকল্পনা রয়েছে:

শতভাগ সোলার বিদ্যুৎ:

২০২১ সালের মধ্যে পার্বত্য এলাকার প্রতিটি দুর্গম ও প্রান্তিক বাড়িকে সোলার হোম সিস্টেমের আওতায় এনে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিতকরণ।

নদী ও লেক ড্রেজিং:

কাপ্তাই হ্রদ এবং পাহাড়ের প্রধান নদীগুলোর নাব্যতা বজায় রাখার জন্য বিশেষ ড্রেজিং (Dredging) প্রকল্প বাস্তবায়ন, যাতে মৎস্য উৎপাদন ও নৌযোগাযোগ বারো মাস সচল থাকে।

কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ:

পাহাড়ে উৎপাদিত প্রচুর পরিমাণ পচনশীল ফল ও সবজি (যেমন: আনারস, কমলা, আদা, হলুদ) সঠিক সংরক্ষণের জন্য তিন পার্বত্য জেলায় আধুনিক ‘কোল্ড স্টোরেজ’ বা হিমাগার স্থাপন।

ইউনিয়ন সংযোগ সড়ক:

তিন পার্বত্য জেলার মূল সদরের সাথে প্রতিটি দুর্গম ইউনিয়ন ও পাড়ার শতভাগ পাকা সংযোগ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন:

পাহাড়ি প্রকৃতির ক্ষতি না করে ইকো-ট্যুরিজমের (Eco-Tourism) ধারণা বজায় রেখে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য আধুনিক ও সুরক্ষিত পর্যটন অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের এই ১০ বছর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য মূলত একটি ‘রূপান্তরের দশক’ (Decade of Transformation)। সুদীর্ঘকালের রক্তক্ষয়ী সংঘাতময় পরিবেশ কাটিয়ে এই জনপদে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ পরিকাঠামোর আধুনিকায়নে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ৪,০০০ পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে পাহাড়ের দুর্গম প্রান্তের শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করা এবং হাজার হাজার সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে পাহাড়ের চিরকালীন অন্ধকার দূর করা ছিল সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতিরই শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সমন্বিত মেগা প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে যাতায়াত, বিপণন ও সেচ ব্যবস্থার যে আধুনিকায়ন করা হয়েছে, তা স্থানীয় অনগ্রসর ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষকদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করে তুলেছে। বিশেষ করে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী প্রথাবদ্ধ রাজকীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে (রাজা, হেডম্যান ও কারবারী) রাষ্ট্রীয় সম্মানি ও মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও মজবুত ও জনবান্ধব করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের এই সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপসমূহ কেবল পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানই উন্নত করেনি, বরং পাহাড় ও সমতলের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈষম্যের দেওয়াল ভেঙে এক দৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অর্জিত স্থায়িত্ব, অগ্রগতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সেই লক্ষ্য অর্জনে এক অবিচ্ছেদ্য ও শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

আরও দেখুন: