আধুনিক পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা তৈরির সামাজিক আন্দোলন । পেশা পরামর্শ সভা

আমরা বর্তমানে মানব ইতিহাসের এমন এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি, যা হঠাৎ করে গভীরভাবে ভাবতে বসলে সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তায় ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সভ্যতার ইতিহাসে পরিবর্তনের চাকা সবসময়ই ঘুরেছে, কিন্তু বর্তমানের এই ঘূর্ণন গতি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। গত শতকে (বিংশ শতাব্দী) বিশ্বব্যাপী মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, কর্মসংস্থান, সমাজকাঠামো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে যতখানি পরিবর্তন বা বিবর্তন হয়েছিল, বিস্ময়করভাবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিবর্তন হয়ে গেছে গত মাত্র ১০ বছরে।

আর এই অবিশ্বাস্য ও ঝোড়ো পরিবর্তনের মূলে যে একক শক্তিটি কাজ করছে, তা হলো—প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ। বিশেষ করে তথ্য ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এই রূপান্তরকে কয়েক হাজার গুণ ত্বরান্বিত করেছে। মানুষ এখন কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমেই তার অস্তিত্ব সংজ্ঞায়িত করছে।

  • ভার্চুয়াল বনাম বাস্তব রাষ্ট্র: এক সময় রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ছিল নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠী। কিন্তু আজ সেই সংজ্ঞা ডিজিটাল জগতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুক যদি আজ একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র হতো, তবে কেবল এর সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে এটি পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হতো। বর্তমান প্রবণতা বলছে, আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে এটি জনসংখ্যার দিক থেকে চীন বা ভারতকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভার্চুয়াল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
  • তথ্যের বিস্ফোরণ (Information Explosion): সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগল-এর একটি পরিসংখ্যান আমাদের চোখ কপালে তুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালের শেষ দিকে যে পরিমাণ নতুন তথ্য ইন্টারনেটে যুক্ত হয়েছে বা হবে, মানব সভ্যতার বিগত ৫০০ বছরের ইতিহাসে (লিখন পদ্ধতি বা মুদ্রণ যন্ত্রের উদ্ভাবনের পর থেকে) সেই পরিমাণ তথ্য তৈরি হয়নি। অর্থাৎ, আমরা তথ্যের এক অতল মহাসমুদ্রে বাস করছি।
  • তথ্য যখন মানুষকে খোঁজে: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও তথ্যের এই প্রবাহ লক্ষণীয়। বর্তমানে একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে একজন পাঠক এক মাসে যে পরিমাণ তথ্য পান, গত শতকের শুরুতে আধুনিক বিশ্বের একজন সচেতন মানুষ তাঁর পুরো জীবনেও সেই পরিমাণ তথ্য পেতেন না। আগে মানুষকে তথ্যের পেছনে ছুটতে হতো, লাইব্রেরিতে বা জ্ঞানী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো। কিন্তু এখনকার প্রবণতা হলো—মানুষ তথ্য খুঁজতে যেটুকু সময় দেয়, তথ্য তার চেয়ে বেশি সময় ধরে মানুষকে খুঁজে বেড়ায় (অ্যালগরিদম বা সোশ্যাল মিডিয়া ফিডের মাধ্যমে)।

১. টিকে থাকার লড়াই: অস্তিত্ব বনাম স্থবিরতা

এই দ্রুতগতির সময়কে কেউ হয়তো সভ্যতার উৎকর্ষের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করবেন, আবার কেউ একে চরম ‘অস্থিরতা’ বা ‘বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে দেখবেন। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, বাস্তবতা হলো—এই গতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া টিকে থাকার আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করবে, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া তাদের জন্য অনিবার্য।

বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন তথ্যের চাহিদা ও জোগান—উভয়ই জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। খবরের পরিধি যেমন বাড়ছে, তেমনি সেই খবর পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে এক বিশাল প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার চাপে প্রচার মাধ্যমগুলোও নিজেদের ক্রমাগত পরিবর্তন করছে।

  • মুদ্রণ শিল্পের অন্তিম যাত্রা?: প্রযুক্তির এই দৌড়ে এক সময়কার শক্তিশালী মাধ্যম ‘মুদ্রণ শিল্প’ (Print Media) আজ অস্তিত্ব সংকটে। মুদ্রণ যন্ত্রের হাত ধরে যে গণমাধ্যমের বিপ্লব ঘটেছিল, অনলাইন পোর্টাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার জোয়ারে তা এখন অনেকটাই ম্লান।
  • সিএনএন-এর সেই ঐতিহাসিক আলোচনা: মাত্র এক দশক আগে বিশ্বখ্যাত নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনএন (CNN) তাদের এক বিশেষ আয়োজনে বড় বড় সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছিল। তখন আলোচনার বিষয় ছিল—সংবাদপত্রের কল্যাণে মুদ্রণ শিল্প কীভাবে আরও বহুদূর যাবে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দেখুন, আজ সেই সিএনএন-কেই অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে এই বিষয়ে যে—“মুদ্রিত সংবাদপত্র কি আদেও আগামীতে বেঁচে থাকতে পারবে?” এই তীব্র প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেক শতাব্দী প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সংবাদ প্রতিষ্ঠান হারিয়ে গেছে। আবার অনেক নবীন প্রতিষ্ঠান, যারা প্রযুক্তির পাল ধরে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা প্রথাগত সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে প্রচারের তুঙ্গে পৌঁছে গেছে। এমনই এক চ্যালেঞ্জিং ও পরিবর্তনশীল সময়ে দৈনিক ‘বণিক বার্তা’ বাংলা ভাষায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিশেষায়িত খবর নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। পরিবর্তিত সময়ের এই ধাক্কা সামলে টিকে থাকার যে সাহসিকতা তাঁরা দেখিয়েছেন, তার জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানাই।

২. বণিক বার্তার স্বকীয়তা ও আমাদের প্রত্যাশা

দেশের বাজারে শত শত সংবাদপত্রের ভিড়ে নতুন একটি কাগজের জন্য জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। তবে বণিক বার্তার কিছু বিশেষ গুণ তাদের সাফল্যের পথে এগিয়ে নেবে বলে আমি মনে করি:

  • কঠিন কথা সহজ করে বলা: অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব বা ব্যবসার প্যাঁচালো ভাষা সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তোলার প্রত্যয়।
  • সুনির্দিষ্ট ফোকাস: রাজনীতি বা পরচর্চা নয়, বরং নিখাদ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাগ্রতা।
  • আধুনিক প্রযুক্তি: সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শক্তিশালী অবস্থান।
  • নবীন ও উদ্যমী বাহিনী: তরুণ প্রজন্মের মেধা ও শক্তির সঠিক প্রয়োগ।

একজন প্রযুক্তি পেশাদার হিসেবে আমি আশা করব—বণিক বার্তা কেবল খবর পরিবেশন করেই থেমে থাকবে না, বরং বাংলাদেশের ব্যবসার প্রাণ ‘উদ্যোক্তা’ ও ‘পেশাজীবীদের’ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি নির্ভর সেরা কর্মকৌশল এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁরা নিয়মিত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 আধুনিক পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা তৈরির সামাজিক আন্দোলন । পেশা পরামর্শ সভা

 

৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

ব্যবসা পরিচালনায় এবং তার প্রসারে যুগে যুগে ভোক্তারাই ছিল প্রধান নিয়ামক। কিন্তু বর্তমান সময়ে সমীকরণ বদলে গেছে। এখন সফলতার সমীকরণে ভোক্তার সাথে সমান গুরুত্ব নিয়ে যোগ হয়েছে ‘প্রযুক্তি’ এবং ‘প্রযুক্তি নির্ভর সেরা কর্মকৌশল’। বর্তমান সময়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) কোনো একক শিল্প নয়, বরং এটি অন্য সকল শিল্পের চালিকাশক্তি। তাই একজন প্রযুক্তি পেশাদার হিসেবে আমি আশা করব, দেশের নীতিনির্ধারকেরা এবং ‘বণিক বার্তা’র মতো বিশেষায়িত সংবাদ মাধ্যমগুলো এই প্রযুক্তি ও কৌশলগুলোর ওপর প্রয়োজনীয় আলোকপাত করবে।

আমাদের দেশে তথ্য-প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতের অবদান অনেক বেশি। হাজারো প্রতিকূলতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ খাতকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এখন আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যে, যদি রাষ্ট্র তার নীতিগত ও কাঠামোগত সহায়তা নিশ্চিত না করে, তবে এই অগ্রগতির ট্রেনটি লাইনচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

  • রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের নেতিবাচক উদাহরণ: আমাদের দেশের তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়নের ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তথ্য-প্রযুক্তি নীতিমালার বারবার পরিবর্তন, ইলেকট্রনিক লেনদেনে ধীরগতি এবং সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে অস্পষ্টতা—এগুলো রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প এই স্থবিরতায় কিছুটা গতি এনেছে, কিন্তু গ্লোবাল কম্পিটিশনের কাছে তা এখনও ‘অগতির গতি’র মতো।

৪. যে সকল নীতিগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি

তথ্য-প্রযুক্তি খাত থেকে প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল পেতে হলে কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমাদের নিচের বিষয়গুলোতে অত্যন্ত দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:

  • তথ্য প্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন: কেবল কাগজে-কলমে নীতিমালা থাকলে হবে না, সেটির প্রতিটি দফার বাস্তবায়ন মাঠ পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে।
  • নিরাপত্তা আইনের আধুনিকায়ন: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নিরাপত্তা আইনকে এমনভাবে সংশোধন করতে হবে যেন তা ব্যবহারকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে, কিন্তু উদ্যোক্তাদের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
  • হাই-স্পিড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা: ইন্টারনেট এখন মৌলিক অধিকারের মতো। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
  • ইলেকট্রনিক অর্থ লেনদেনের পূর্ণ স্বাধীনতা: অনলাইন বা ইলেকট্রনিক পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতা নিরসন করতে হবে। পেপ্যাল (PayPal)-এর মতো বৈশ্বিক পেমেন্ট সিস্টেমগুলো বাংলাদেশে সহজলভ্য করার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
  • মেধাস্বত্ব ও ট্যাক্স নীতিমালা: আমাদের অর্থনীতির উপযোগী করে মেধাস্বত্ব আইন (Intellectual Property Law) সংশোধন করতে হবে। এছাড়া উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল ট্যাক্স সুবিধা বা ট্যাক্স হলিডে নিশ্চিত করতে হবে।

এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজন উদ্যোক্তা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত হবেন, বিনিয়োগকারী তাঁর পুঁজি হারানোর অকারণ ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন এবং কর্মীরা পাবেন পেশাগত কাজের নিরাপত্তা। এখানে রাষ্ট্রের প্রধান ভূমিকা হওয়া উচিত ‘সহায়ক’ বা ‘Facilitator’ হিসেবে।

৫. আগামীর চ্যালেঞ্জ: পেশাজীবী তৈরির নতুন দর্শন

ব্যবসা বা প্রযুক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সেই ক্ষেত্রে কাজ করা ‘পেশাজীবী’। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ভিত্তিক অর্থনীতি জোরদার করতে আমাদের প্রথম এবং প্রধান যুদ্ধটি হবে ‘পেশাদার জনশক্তি’ তৈরির ক্ষেত্রে।

এখানে একটি বিস্ময়কর তথ্য আমাদের মনে রাখা দরকার—বিশ্বব্যাপী বর্তমানে এমন সব পেশাদার মানুষের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যে পেশাগুলো ৫ বছর আগেও পৃথিবীতে ছিল না।

  • পরিবর্তনশীল কর্মকৌশল: প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য গতির কারণে গড়ে প্রতি ৫ বছরে মানুষের কাজের কৌশল ও পদ্ধতি সম্পূর্ণ পাল্টে যাচ্ছে। আপনি যদি আজ থেকে ১০ বছর আগের ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা গ্রাফিক ডিজাইনের কথা ভাবেন, তবে দেখবেন আজকের পদ্ধতির সাথে তার কোনো মিল নেই।
  • অজানা ভবিষ্যতের প্রস্তুতি: বর্তমানে আমাদের সেই সব প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে যা এখনো আবিষ্কারই হয়নি! অর্থাৎ, আমাদের এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে হবে যারা কেবল মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী নয়, বরং যারা প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিখবে (Learning to Learn)।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০৪ সালে যে কাজগুলোকে আমরা স্রেফ শখের বিষয় মনে করতাম, ২০১০ সাল নাগাদ বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো সেই কাজে দক্ষদের জন্য সর্বোচ্চ বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই যে দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার, এখানে টিকে থাকার জন্য আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ফেলা এখন বাধ্যতামূলক।

 

বিশ্বব্যাপী প্রতি দুই বছরে নতুন কারিগরি তথ্যের পরিমাণ আগের সব তথ্যের দ্বিগুণ হচ্ছে। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী যখন চার বছরের অনার্স শেষ করছে, ততদিনে তার প্রথম বছরের শেখা অনেক কিছুই সেকেলে হয়ে যাচ্ছে।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 আধুনিক পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা তৈরির সামাজিক আন্দোলন । পেশা পরামর্শ সভা

 

৬. শিক্ষা ব্যবস্থার ‘এক্সপায়ারি ডেট’ ও আধুনিকায়নের সংকট

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে তথ্যের স্থায়িত্ব বা ‘শেলফ লাইফ’ অত্যন্ত কমে গেছে। গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি দুই বছরে বিশ্বে নতুন কারিগরি তথ্যের পরিমাণ তার আগের সকল তথ্যের চেয়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। এই গাণিতিক হিসাবটি আমাদের চিরাচরিত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়াবহ অশনি সংকেত।

  • শিক্ষার্থী যখন সিলেবাসের চেয়ে এগিয়ে: এই তথ্যের জোয়ারের ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও যদি একজন শিক্ষার্থী ৪ বছরের অনার্স কোর্সে ভর্তি হয়, তবে ৩য় বর্ষে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই সে উপলব্ধি করে যে তার প্রথম বর্ষে শেখা অনেক প্রযুক্তি বা তথ্য ইতিমধ্যে সেকেলে (Obsolete) হয়ে গেছে। অর্থাৎ, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার আগেই অর্জিত জ্ঞানের একটি বড় অংশ তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে।
  • আমাদের বাস্তব চিত্র: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট যেখানে এমন, সেখানে আমাদের দেশের মাধ্যমিক, কারিগরি এবং বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্ধাতা আমলের পাঠ্যক্রম দিয়ে তৈরি জনশক্তি বাজারের চাহিদার তুলনায় কতটা পিছিয়ে আছে, তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা যখন সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন তারা আবিষ্কার করে যে বাজারের বাস্তব চাহিদা আর তাদের ক্লাসরুমের শিক্ষার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বা ‘স্কিল গ্যাপ’ বিদ্যমান।

৭. কারিগরি শিক্ষার আমূল সংস্কার ও ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’ কোলাবরেশন

আমাদের দেশের কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা বর্তমানে অনেকাংশেই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি ইতিবাচক হলেও একটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে—পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো প্রায় পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি। একটি গতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া এখন সময়ের দাবি:

  • ছয় মাসের ‘রিভিউ সাইকেল’: শিক্ষা সংস্কারের জন্য কোনো স্থায়ী কমিশন বা ঢাউস কমিটি গঠন করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার সময় আমাদের নেই। বরং প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি উইং থাকা দরকার, যারা প্রতি অনূর্ধ্ব ৬ মাস অন্তর পাঠ্যক্রম পুনর্বিবেচনা করবে।
  • শিল্প-মুখী পাঠ্যক্রম (Industry-Driven Curriculum): যেসব দেশ কারিগরি শিক্ষায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে (যেমন—জার্মানি বা সিঙ্গাপুর), সেখানে পাঠ্যক্রমের সিংহভাগ নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট শিল্পের বা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার ভিত্তিতে। আমাদের দেশেও ‘ব্যবসায়ী-শিল্পপতি’ এবং ‘শিক্ষাবিদ’-দের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। শিক্ষাবিদরা কেবল নির্ধারণ করবেন শিল্পে ব্যবহৃত সেই আধুনিক প্রযুক্তিগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে কীভাবে সহজভাবে উপস্থাপন করা যায়।
  • বিশেষজ্ঞ বনাম পেশাজীবী: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে প্রচুর ‘বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ’ বা থিওরিটিক্যাল মাস্টার তৈরি করছে, কিন্তু তারা প্রকৃত ‘পেশাজীবী’ হয়ে উঠছে না। পেশাজীবী হওয়ার জন্য যে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও হ্যান্ডস-অন অভিজ্ঞতা দরকার, তা আমাদের একাডেমিক কাঠামোতে অনুপস্থিত।

৮. ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং: তৃণমূলের ডিজিটাল বিপ্লব

নতুন প্রযুক্তি ও পেশা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং একটি বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলের মেধাবী তরুণরা এই খাতে অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে।

  • সহজ প্রবেশাধিকার ও দক্ষতা উন্নয়ন: ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—খুব সাধারণ প্রশিক্ষণ এবং একটি ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে কাজ শুরু করা যায়। শুরুতে ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করলেও দক্ষতা বাড়ার সাথে সাথে আয়ের পরিমাণও দ্রুত বাড়তে থাকে। এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হতে পারে।
  • প্রচার ও প্রচারণার ভূমিকা: সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং বিশেষ করে ‘বণিক বার্তা’র মতো সংবাদপত্রের দায়িত্ব হলো এই ফ্রিল্যান্সিং সাফল্যের গল্পগুলো মানুষের সামনে নিয়ে আসা। একজন তরুণ যখন দেখবে তার পাশের বাড়ির ছেলেটি বিদেশি কোম্পানিতে ঘরে বসে কাজ করে আয় করছে, তখন সে নিজেও উৎসাহিত হবে। এটি সামাজিক রূপান্তরের একটি বড় মাধ্যম।

তবে মনে রাখতে হবে, কেবল সাধারণ কাজ (যেমন- ডাটা এন্ট্রি) নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের তরুণদের উচ্চতর দক্ষতা সম্পন্ন কাজ যেমন—সফটওয়্যার আর্কিটেকচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি এবং অ্যাডভান্সড ডেটা অ্যানালিটিক্স শিখতে হবে। এ জন্য সব ধরনের মেধাবীদের জন্য আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের দুয়ার উন্মুক্ত রাখতে হবে।

“উদ্যোক্তা তৈরির কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই; এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি হবু উদ্যোক্তাদের কারিগরি ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।”

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 3 আধুনিক পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা তৈরির সামাজিক আন্দোলন । পেশা পরামর্শ সভা

 

৯. নতুন উদ্যোক্তা তৈরি: ফর্মুলা বনাম নিরন্তর সাধনা

একটি দেশের অর্থনীতি কেবল দক্ষ পেশাজীবী দিয়ে চলে না, তার জন্য প্রয়োজন সাহসী ও উদ্ভাবনী ‘উদ্যোক্তা’। আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) উন্নয়ন মূলত এই নতুন উদ্যোক্তাদের ওপরই নির্ভরশীল। তবে উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি কোনো ম্যাজিক নয়।

  • ইনকিউবেশন ও গবেষণার গুরুত্ব: বিশ্বজুড়ে কোনো বিজনেজ স্কুল বা ইনকিউবেশন সেন্টার হলফ করে বলতে পারে না যে তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক সফল উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারবে। তবে তারা তাদের চেষ্টা থামিয়ে দেয় না। উদ্যোক্তা তৈরি অনেকটা গবেষণার মতো—এক হাজারটি উদ্যোগের মধ্যে হয়তো একটি সফল হয়ে পুরো বিশ্বের মানচিত্র বদলে দেয়। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির সকল কার্যক্রমকে কেবল নামমাত্র প্রকল্পের বদলে একটি ‘কালচার’ বা সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
  • আর্থিক সহায়তার ভুল ধারণা: আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ভুল হলো—আমরা মনে করি টাকা দিলেই উদ্যোক্তা তৈরি হয়। ফলে আমরা যা তৈরি করছি তার বেশিরভাগই হচ্ছে ‘ট্রেডার’ বা আমদানিকারক, যারা কেবল অন্যের পণ্য বা সেবা কেনা-বেচা করে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের প্রয়োজন সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তা (Creative Entrepreneur), যারা নিজস্ব উদ্ভাবন দিয়ে বাজারে নতুন ভ্যালু তৈরি করবে।

১০. উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের আধুনিক মডেল

হবু উদ্যোক্তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সক্ষমতা (Business Acumen) বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রশিক্ষণের মডেলটি হতে হবে সাধারণ প্রশিক্ষণের চেয়ে আলাদা:

  • সফলদের অভিজ্ঞতা বিনিময়: কারিগরি বিষয়গুলো সাধারণ প্রশিক্ষক শেখাতে পারলেও বাণিজ্যিক যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার কৌশল শেখাতে হবে সফল উদ্যোক্তাদের। যদি তাদের সশরীরে পাওয়া না যায়, তবে তাদের অভিজ্ঞতার নির্যাস, সফলতার কাহিনী এবং বিশেষ করে তাদের ব্যর্থতার কারণগুলো নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
  • সামাজিক আইকন ও গণমাধ্যম: তরুণদের মাঝে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ জাগাতে হলে এই পেশাকে সামাজিকভাবে গ্ল্যামারাস করতে হবে। সফল উদ্যোক্তাদের যখন জাতীয় টেলিভিশনে বা পত্রিকায় হিরো হিসেবে তুলে ধরা হবে, তখনই একজন কিশোর ক্রিকেটার বা নায়ক হওয়ার বদলে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। এক্ষেত্রে ‘বণিক বার্তা’র মতো বিশেষায়িত সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম।

১১. প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ ও ‘সেরা কর্মকৌশল’ (Best Practice)

যেকোনো প্রযুক্তির পেছনে বড় বিনিয়োগ তখনই সার্থক হয় যখন সেটি থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া যায়। অন্যথায়, এটি কেবল একটি মৃত বিনিয়োগ (Dead Investment)।

  • প্রযুক্তির সঠিক সিদ্ধান্ত: একজন উদ্যোক্তাকে শুধু প্রযুক্তি কিনলেই হবে না, তাকে বুঝতে হবে তার ব্যবসার জন্য কোন প্রযুক্তিটি সঠিক। অযথা দামী সফটওয়্যার না কিনে কীভাবে ওপেন সোর্স বা ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়, সেই তথ্যগুলো তাদের কাছে সহজলভ্য করতে হবে।
  • বেস্ট প্র্যাকটিসেস (Best Practices): বর্তমান বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করে ‘সেরা কর্মকৌশল’ বা Best Practice রপ্ত করতে। প্রযুক্তির বিনিয়োগ থেকে শতভাগ ফল পেতে হলে কর্মকৌশল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বে মানদণ্ড নির্ধারণকারী (যেমন- ISO, CMMI, Agile, Six Sigma) প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিজেরাই একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে।
  • প্রতিযোগিতার সক্ষমতা: আমাদের দেশে এ বিষয়ে জনসচেতনতা অত্যন্ত কম। যদি আমরা বিশ্ববাজারে পণ্য বা সেবা রপ্তানি করতে চাই, তবে আমাদের কেবল প্রযুক্তি থাকলে চলবে না, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপদ্ধতি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। এই ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা আগামীর ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে স্থবির থাকার কোনো সুযোগ নেই। তথ্য-প্রযুক্তির এই উত্তাল জোয়ারে হয় আমাদের ঢেউয়ের ওপর চড়ে সার্ফিং শিখতে হবে, নয়তো ঢেউয়ের তলায় তলিয়ে যেতে হবে। ‘বণিক বার্তা’র মতো সংবাদপত্রগুলো যদি ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী এবং প্রযুক্তির এই চারটি স্তম্ভকে একই সুতোয় বাঁধতে পারে, তবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

আমাদের আগত প্রজন্মের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মেধা পাচার (Brain Drain) বন্ধ হবে এবং দেশের মাটিতেই তারা বিশ্বমানের উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সচেতনতা এবং সেরা কর্মকৌশল অনুসরণের মাধ্যমেই রচিত হবে আমাদের আগামীর সমৃদ্ধি।

 

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেটর সেন্টার (বিআইআইসি)

 

আরও পড়ুন:

Leave a Comment