পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণ উৎসব মূলত এবং প্রধানত বাঙালির। এই উৎসবের মূল নিহিত রয়েছে বাঙালির হাজার বছরের কৃষি-সভ্যতা, ভূখণ্ড এবং ঐতিহ্যের গভীর শেকড়ে। তাই বৈশাখকে যাপন করার অধিকার প্রতিটি বাঙালির একান্ত নিজস্ব। এই উদযাপন কে কীভাবে করবেন, কতটুকু করবেন কিংবা আদৌ করবেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ওই ব্যক্তির। তাঁর উদযাপনের ভঙ্গি সঠিক কি না, তা বিচার করার জন্য কারও হাতে কোনো তথাকথিত ধর্মীয় বা নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন নেই।
আপনি যদি নিজেকে বাঙালি মনে করেন, তবে এই উৎসব আপনার। এই উৎসবে আপনার অংশগ্রহণের ধরনটি হবে আপনার নিজের রুচি ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। বাঙালির এই বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সৌন্দর্যই হলো এর বৈচিত্র্য। এমনকি আপনার পাশের বাঙালি কীভাবে বৈশাখ পালন করছেন, সেটি নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। বরং তাঁকে তাঁর মতো করে এই দিনটি যাপন করতে দেওয়াই হলো প্রকৃত সাংস্কৃতিক সৌজন্য।
আমাদের সবার মনে রাখা দরকার, পহেলা বৈশাখসহ সকল উৎসব সমাজের সব স্তরের মানুষ চিরকাল একইভাবে পালন করেনি। উদযাপন কেমন হবে, তা নির্ভর করে স্থান, কাল, আর্থিক সামর্থ্য, শিক্ষা, রুচি ও অনুষঙ্গের ওপর। আপনার আর্থিক সামর্থ্য, বন্ধুবান্ধব এবং আয়োজনের সক্ষমতা যেমন—আর যেটিকে আপনি যথার্থ উদযাপন মনে করেন, সেটিই আপনার জন্য পহেলা বৈশাখের সত্যিকারের উদযাপন। আপনার অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি আপনার উদযাপনের ধরনও বদলে যেতে পারে। এর সাথে আমি কীভাবে পালন করলাম, তা মেলানোর প্রয়োজন নেই। প্রতিটি আয়োজনের মধ্যে কয়েকটি সুর ‘কমন’ বা সাধারণ থাকলেই হয়; সেগুলো হলো—আনন্দ, বন্ধুত্ব, অসাম্প্রদায়িকতা ও সহমর্মিতার সুর।
কেউ বৈচিত্র্যের মধ্যেও মিল খুঁজে পায়, আবার কেউ সামান্য অমিলের সুযোগ নিয়ে বৈরিতার সূচনা করে। আপনি ঠিক করবেন—আপনি বন্ধুত্বের রাস্তা খুঁজবেন নাকি শত্রুতার।
কারও ধর্ম, মাজহাব বা ফেরকার নীতি-নৈতিকতা যদি এই উৎসব পালনে বাধা দেয়, তবে এই উৎসব তাঁর জন্য নয়। তিনি এই উৎসবকে ‘মুনকার’ মনে করবেন বা অস্বীকার করবেন এবং এটি থেকে দূরে থাকবেন। এই উৎসব নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা—কোনোটিই আপনার করার প্রয়োজন নেই, এমনকি সেই অধিকারও আপনার নেই। আমি জানি, ‘ফেরকা পরস্ত’ লোকজনের এরপরও মুখ চুলকাবে; তাঁদের বলব—অ্যালার্জির ওষুধ খান অথবা চুলকানির মলম মাখুন।
বাংলাদেশে বসবাসরত এমন কোনো নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা অন্য কোনো সাংস্কৃতিক বলয়ের মানুষ যাঁদের এটি পছন্দ নয়, তাঁরাও দূরে থাকুন। জাতিগতভাবে আপনি যদি নিজেকে পাকিস্তানি বা পাকিস্তানপন্থি মনে করেন, তবে এই বৈশাখ উদযাপন আপনার অনুষ্ঠান নয়। আপনারাও নিজেদের জন্য অন্য ‘ফেরকা পরস্ত’ লোকজনের মতো আমল করুন।

তবে আপনি যদি বিহারি হন, তবে আপনার জন্য এর বিকল্প উৎসব হিসেবে আছে ‘জুড় শীতল’ (Jur Sital) বা মৈথিলী নববর্ষ। আপনি চাইলে সেটি পালন করতে পারেন। আবার আপনি যদি পাঞ্জাবি হন, তবে আপনাদের জন্য ‘Vaisakhi’ বা ‘Baisakhi’ আছে। সেটি পালনের অধিকার আপনার অবশ্যই আছে। আপনারা আপনাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী উৎসব পালন করবেন। আমরা বাঙালিরা ঠিক করে দেব না যে আপনারা কীভাবে উৎসব পালন করবেন। ঠিক একইভাবে আমরাও আশা করি না যে, অন্য কেউ ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা করবে যে আমরা কীভাবে উৎসব পালন করব।

যাঁদের কোনো সুনির্দিষ্ট নৃতাত্ত্বিক বা ভৌগোলিক জাতিপরিচয় নেই, কিংবা যাঁরা নিজেদের জাতিপরিচয় নিয়ে গর্বিত নন, তাঁদের জন্য এই বৈশাখী উৎসবের কোনো প্রয়োজন নেই। যাঁদের শেকড় এই বাংলার মাটির সাথে যুক্ত নয়, বৈশাখ তাঁদের জন্য অন্য আর দশটি সাধারণ দিনের মতোই। সুতরাং, যাঁদের পরিচয়ের সাথে বৈশাখের কোনো ঐতিহাসিক বা আবেগীয় যোগসূত্র নেই, এই উৎসব নিয়ে তাঁদের অনাবশ্যক উত্তেজনা প্রদর্শন কিংবা কোনো মতামত দেওয়ার দরকার নেই। এমনকি প্রশংসারও প্রয়োজন নেই।

যাঁরা ‘ফেরকা পরস্ত’, “ধর্মবাজ” বা “ধর্ম-প্রদর্শক”—তথা সবকিছুর মধ্যে ধর্ম খুঁজে বেড়ান, তাঁরা নিশ্চিত জানবেন এটি ধর্মের কোনো অনুষ্ঠান নয়। ধর্মের সাথে এর দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এর সাথে আপনাদের ধর্মের সম্পর্ক খোঁজা নিরর্থক। এটি বাঙালিদের একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার—ঠিক যেমন মিসরের “শাম এল-নেসিম”, ইরাক ও সিরিয়ার “আকিস্তু”, ইরান, আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তানের “ইয়ালদা রাত”, তুরস্কের “হিড্রেলেজ”, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার “গ্যালুনগান”, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজস্তানের “নওরোজ বা জালালি নববর্ষ” কিংবা মালদ্বীপের “হুনু পহেলা”।
এসব অনুষ্ঠান বিষয়ে আপনাদের মতামত কেউ আশা করে না। এসব অনুষ্ঠানের দিনে আপনারা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকাই শ্রেয়। যা আপনাদের নয়, তার মধ্যে অযথা মাথা ঘামিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করবেন কেন?
পহেলা বৈশাখ বাঙালি হিসেবে আমাদের একটি জীবন্ত উত্তরাধিকার। আমরা বাঙালিরা যাঁর যেমন ইচ্ছে, যাঁর যেমন সামর্থ্য এবং যাঁর যেমন পারিপার্শ্বিকতা—তেমন করেই এটি পালন করব। এতে কোনো অবাঙালির বিচলিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
যারা এইসব ভেবে এই উৎসবকে নিজের মনে করতে পারছেন না, তারা ওই দিন ছুটি কাটান। বাসায় যা ভালো লাগে করুন।
আরও দেখুন:
