ধ্রুপদে দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাচীনতম ধারা ধ্রুপদের মধ্যে দরভাঙ্গা ঘরানা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন্ত পরম্পরা। বিহারের দরভাঙ্গা রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘরানার বিকাশ ঘটে, এবং এটি ধ্রুপদের চারটি প্রধান বাণী—গওহার, খণ্ডার, নওহার ও ডাগরবাণীর ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষত, অনেক সংগীতবিশারদ মনে করেন যে দরভাঙ্গা ঘরানার শৈলী গওহার বাণীর প্রভাব বহন করে, যেখানে লয়, বোল এবং শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয় দুই ভ্রাতা পণ্ডিত রাধা কৃষ্ণ এবং কার্তারাম-কে, যাঁরা দরভাঙ্গার নবাবের দরবারে সভাগায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের গায়নশৈলী ধ্রুপদের ঐতিহ্যকে এক নতুন শক্তিশালী রূপ দেয় এবং একটি স্বতন্ত্র ঘরানার ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁদের শিক্ষার মাধ্যমে এই ধারাটি পরবর্তী প্রজন্মে বিস্তার লাভ করে এবং “মল্লিক পরিবার” এই ঘরানার প্রধান ধারক হিসেবে পরিচিত হয়।

দরভাঙ্গা ঘরানার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর লয়কেন্দ্রিকতা এবং শক্তিশালী বোল প্রয়োগ। ডাগরবাণীর মতো ধীর ও ধ্যানমগ্ন আলাপের পরিবর্তে এখানে আলাপ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু বন্দিশ বা বাণীর অংশে লয়ের জটিলতা, বোলের বৈচিত্র্য এবং তালের ওপর গভীর দখল বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। এই ঘরানার শিল্পীরা “বোল-বান্ত”, “বোল-তান” এবং বিভিন্ন লয়কারির মাধ্যমে রাগকে এক গতিশীল ও প্রাণবন্ত রূপ দেন।

এই ধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাখোয়াজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ধ্রুপদের সঙ্গে পাখোয়াজের সংলাপ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং গায়ক ও পাখোয়াজবাদকের মধ্যে এক ধরনের ছন্দময় কথোপকথন তৈরি হয়। এই সংলাপের মাধ্যমে সংগীত একটি নাটকীয় ও জীবন্ত অভিব্যক্তি লাভ করে, যা দরভাঙ্গা ঘরানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

দরভাঙ্গা ঘরানার গায়নশৈলীতে শক্তি, স্পষ্টতা এবং উচ্চারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি শব্দ ও বোল পরিষ্কারভাবে উচ্চারিত হয়, এবং রাগের প্রকাশে এক ধরনের দৃঢ়তা ও উজ্জ্বলতা লক্ষ্য করা যায়। এই কারণে এই ঘরানার সংগীত অনেক সময় অধিক বহির্মুখী (outward-looking) বলে মনে হয়, যা ডাগরবাণীর অন্তর্মুখী ধ্যানধারার সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে।

এই ঘরানার উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন রাম চতুর মল্লিক, বিদুর মল্লিক, অভয় নারায়ণ মল্লিক এবং প্রেম কুমার মল্লিক। তাঁরা প্রত্যেকে এই ঘরানার বৈশিষ্ট্যকে সংরক্ষণ ও প্রসারিত করেছেন এবং আধুনিক যুগেও দরভাঙ্গা ঘরানাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।

ধ্রুপদের অন্যান্য প্রধান ঘরানার সঙ্গে তুলনা করলে দরভাঙ্গা ঘরানার স্বতন্ত্রতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, ডাগর ঘরানা যেখানে ধীর, ধ্যানমগ্ন ও স্বরকেন্দ্রিক, সেখানে দরভাঙ্গা ঘরানা বেশি লয়প্রধান ও শক্তিশালী; তলোয়ান্ডি ঘরানা যেখানে দ্রুত সমাপ্তি ও জটিলতায় গুরুত্ব দেয়, সেখানে দরভাঙ্গা ঘরানা বোল ও তালনির্ভর বিকাশে আলাদা পরিচয় তৈরি করে; আর বেতিয়া ঘরানা যেখানে বিভিন্ন বাণীর মিশ্রণ দেখা যায়, সেখানে দরভাঙ্গা একটি সুসংহত ও নির্দিষ্ট শৈলী বজায় রাখে।