রাগ শ্যাম কল্যাণ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ শ্যাম কল্যাণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত সুমধুর, গম্ভীর এবং আভিজাত্যপূর্ণ রাগ। এটি কল্যাণ ঠাটের একটি অতি পরিচিত রাগ, যা তার স্বকীয় স্বরবিন্যাসের জন্য সংগীত রসিকদের কাছে বিশেষ আদরণীয়।

রাগ শ্যাম কল্যাণ

রাগ শ্যাম কল্যাণ মূলত ‘কল্যাণ’ এবং ‘কামোদ’ বা ‘কেদার’ রাগের একটি চমৎকার সংমিশ্রণ বলে মনে করা হয়। এর নামের ‘শ্যাম’ অংশটি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও প্রেমের ইঙ্গিত দেয়। এটি একটি প্রাচীন রাগ এবং মধ্যযুগীয় সংগীত গ্রন্থগুলোতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রাগটি মূলত সন্ধ্যার শুরুতে পরিবেশন করা হয়, যখন দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের স্নিগ্ধতা নেমে আসে।

শ্যাম কল্যাণের প্রধান বিশেষত্ব হলো এতে দুটি মধ্যমের (শুদ্ধ ও তীব্র) ব্যবহার। এই রাগের আরোহে তীব্র মধ্যম এবং অবরোহে শুদ্ধ মধ্যম অত্যন্ত কৌশলে প্রয়োগ করা হয়। এর চলন কিছুটা বক্র প্রকৃতির। আরোহে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা)-এর সংগতি এই রাগকে এক আলাদা গাম্ভীর্য দান করে। এটি মূলত ‘শান্ত’ ও ‘শৃঙ্গার’ রসের রাগ।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
  • আরোহ: সা রে মা(তীব্র) পা, নি ধা সা।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা, মা(তীব্র) পা গা মা(শুদ্ধ) রে, সা।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (পা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং ভক্তিপ্রধান।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • শুদ্ধ কল্যাণ: শুদ্ধ কল্যাণের আরোহে শ্যাম কল্যাণের মিল থাকলেও, শুদ্ধ কল্যাণের অবরোহে গান্ধার ও ধৈবতের প্রয়োগ অনেক বেশি স্পষ্ট।
  • কামোদ: কামোদ রাগেও ‘রে পা’ সংগতি থাকে, তবে কামোদে শুদ্ধ মধ্যমের ব্যবহার শ্যাম কল্যাণের চেয়ে ভিন্নভাবে (মা রে পা) হয়।
  • কেদার: কেদারের সাথে এর মিল হলো দুটি মধ্যমের ব্যবহার, তবে কেদারে শুদ্ধ মধ্যম বাদী স্বর এবং এর চলন সম্পূর্ণ আলাদা।
  • হামীর: হামীর রাগেও তীব্র মধ্যম ও ধৈবতের প্রাধান্য থাকে, কিন্তু এর চলন অনেক বেশি চঞ্চল এবং আরোহে ‘রে’ স্বরটি ভিন্নভাবে প্রযুক্ত হয়।

রাগ শ্যাম কল্যাণ তার সূক্ষ্ম স্বরবিন্যাস এবং দুটি মধ্যমের জাদুকরী ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত। এই রাগে যখন তীব্র মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়া হয় এবং অবরোহে শুদ্ধ মধ্যমের মিড় লাগানো হয়, তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি তৈরি হয়। এটি গায়কের জন্য যেমন পরীক্ষা, শ্রোতার জন্য তেমনি এক আধ্যাত্মিক ভ্রমণ। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভাণ্ডারে শ্যাম কল্যাণ একটি ধ্রুবতারা যা সন্ধ্যার আকাশকে সুরের মূর্ছনায় ভরিয়ে দেয়।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. রাগ পরিচয় (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (৩য় ও ৪র্থ ভাগ) – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. সংগীত বিশারদ – বসন্ত।

৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।

৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann.

আরও দেখুন: