রাগ হেম কল্যাণ (বা ক্ষেম কল্যাণ, রাগ খেম কল্যাণ) । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যে কল্যাণ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত প্রবীণ, অপ্রচলিত ও পরম আভিজাত্যপূর্ণ ওস্তাদী রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ হেম কল্যাণ’ (বা প্রথাগত গ্রন্থে ‘ক্ষেম কল্যাণ’) এক অনন্য ও গম্ভীর স্থান অধিকার করে আছে।

সূর্্যাস্তের পর সান্ধ্যকালীন মেহফিলে তানপুরার গম্ভীর গুঞ্জনে কল্যাণ অঙ্গের পরিচিত আলো-আঁধারির মাঝে যখন হেম কল্যাণের প্রশান্ত ও বক্র স্বরপ্রক্ষেপণ ভেসে আসে, তখন তা আসরে এক নিবিড় আধ্যাত্মিক ধ্যায়নমগ্নতা ছড়িয়ে দেয়। এটি মূলত খেয়াল, ধ্রুপদ ও সেতার-সুরবাহারের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটি রাগ।

ইতিহাস ও বিকল্প নামকরণ (Alternate Names)

সঙ্গীতশাস্ত্রে ও প্রবীণ ঘরানাপন্থী ওস্তাদদের মাঝে এই রাগের নাম এবং ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে কয়েকটি রূপভেদ প্রচলিত রয়েছে:

১. ক্ষেম কল্যাণ (Khem Kalyan): প্রাচীন সংস্কৃত সঙ্গীত গ্রন্থমালা এবং উনিশ-বিশ শতকের সঙ্গীত পণ্ডিতদের (যেমন—পণ্ডিত ভাতখণ্ডে ও রামপুর-সহসওয়ান/সেলা সেনিয়া ঐতিহ্য) পাণ্ডুলিপিতে এই রাগটিকে ‘ক্ষেম কল্যাণ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। সংস্কৃত ‘ক্ষেম’ (মঙ্গল বা কল্যাণ) শব্দটির আঞ্চলিক ও প্রাকৃত উচ্চারণে কালক্রমে এটি ‘হেম কল্যাণ’ নামে বহুল পরিচিতি পায়।

২. হেম (Hem): ধ্রুপদিয়া ও প্রাচীন বীণকারদের প্রথায় সংক্ষেপে একে অনেক সময় কেবল ‘হেম’ বলেও ডাকা হতো।

৩. রাগ হেমন্তের সাথে পার্থক্য: সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রায়শই প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় রাগ ‘হেম কল্যাণ’-এর সাথে আধুনিক সৃষ্টি ‘রাগ হেমন্ত’ (Hemant)-কে গুলিয়ে ফেলেন। ‘হেমন্ত’ রাগটি মূলত বিংশ শতাব্দীতে উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব দ্বারা সৃষ্ট বিলাসখানি-তোড়ী ও অন্যান্য অঙ্গের একটি মিশ্র রূপ; অন্যদিকে ‘হেম কল্যাণ’ হলো কল্যাণ ঠাটের অতি প্রাচীন ও প্রথাগত অপ্রচলিত শাখা রাগ।

রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো

  • ঠাট: কল্যাণ ঠাট।
  • জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (বা ঔড়ব-সম্পূর্ণ — আরোহণে নিখাদ ও পঞ্চম বর্জিত/আল্পত্ব)।
  • বাদী স্বর: G (শুদ্ধ গান্ধার)।
  • সমবাদী স্বর: D (শুদ্ধ ধৈবত)।
  • ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (R), শুদ্ধ গান্ধার (G), তীব্র মধ্যম (M'), শুদ্ধ পঞ্চম (P – অবরোহণে আল্পত্ব বা বক্র প্রয়োগ), শুদ্ধ ধৈবত (D) এবং অবরোহে সূক্ষ্ম শুদ্ধ নিখাদ (N – বেশিরভাগ রূপায়ণে বর্জিত বা অতি অলঙ্কারিক)।
  • সময়: সান্ধ্যকাল ও রাত্রির ১ম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা)।
  • প্রকৃতি ও রস: শান্ত, প্রমিত, সুগভীর ও রাজকীয় মাধুর্যপূর্ণ।

আরোহণ:

S R G M' D S'

(বা রূপভেদে: S R G D S')

অবরোহণ:

S' D P M' G R S

(বা রূপভেদে: S' D M' G R S)

প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):

S R G, M' D, P M' G R S

গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য

রাগ হেম কল্যাণের সঠিক রূপ ফুটিয়ে তোলা একজন সুরসাধকের জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম সাঙ্গীতিক দক্ষতার পরীক্ষা:

১. পঞ্চম ও নিখাদের বর্জন/আল্পত্ব: মূল ইমনের মতো এতে আরোহণে সরাসরি ষড়্‌জ ও পঞ্চমের ওপর জোর দেওয়া হয় না। বিশেষ করে আরোহণে নিখাদ (N) সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে। অবরোহে নামার সময় পঞ্চমের হালকা বক্র স্পর্শ নেওয়া হয় (S' D P M' G R S)।

২. ‘G’ এবং ‘D’-র প্রাধান্য: রাগের মূল ব্যক্তিত্ব দাঁড়িয়ে থাকে শুদ্ধ গান্ধার (G) এবং শুদ্ধ ধৈবতের (D) সুন্দর ভারসাম্যের ওপর। S R G টানার পর সরাসরি M' D বা D S'-এ রূপান্তর এর বৈচিত্র্যময় আভিজাত্য প্রকাশ করে।

৩. ঘরানাদারি চর্চা: মাইহার ঘরানা (পণ্ডিত রবিশঙ্কর, পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়) এবং ইমদাদখানি/ইটাওয়া ঘরানায় (ওস্তাদ সেতারখাঁ, ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ) সেতার ও সুরবাহারে এই রাগের ঐতিহ্যবাহী আলাপ ও গৎ দেখা যায়। এছাড়াও গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানার খেয়াল বন্দিশে রাগ ক্ষেম কল্যাণ/হেম কল্যাণের প্রয়োগ মেলে।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ ইমন / কল্যাণ: কল্যাণ পরিবারের মূল আশ্রয় রাগ।
  • রাগ শুদ্ধ কল্যাণ: আরোহণে ঔড়ব এবং অবরোহণে সম্পূর্ণ কল্যাণ অঙ্গযুক্ত প্রখ্যাত সান্ধ্যকালীন রাগ।
  • রাগ পুরিয়া কল্যাণ: পুরিয়া ও কল্যাণ অঙ্গের গভীর ওস্তাদী মেলবন্ধন।
  • রাগ কামোদ: উভয় মধ্যমযুক্ত কল্যাণ অঙ্গের বক্র গতিসম্পন্ন রাগ।

 

অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 6 রাগ হেম কল্যাণ (বা ক্ষেম কল্যাণ, রাগ খেম কল্যাণ) । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

রাগ হেম কল্যাণ (বা ক্ষেম কল্যাণ) হলো হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতের সেই অনবদ্য ধ্রুপদী রত্ন, যা চপল অলঙ্কারের জটিলতা ছাড়িয়ে সুরের বিশুদ্ধ ভাবকে আশ্রয় করে রূপ লাভ করে। রাত্রির প্রারম্ভে তানপুরা ও সেতারের সজল তান স্পর্শে যখন হেম কল্যাণের S R G, M' D, P M' G R S-র সুগভীর তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে আসরকে এক নিবিড়, শান্ত ও রাজকীয় সুরলোকে উন্নীত করে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।
৩. Ragas of North Indian Music — অ্যালাইন ড্যানিয়েলু (Alain Daniélou)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — কল্যাণ ঠাটের অপ্রচলিত ও প্রবীণ রাগ বিশ্লেষণ।

আরও দেখুন: