রাগ সাভানী কল্যাণ । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ সাভানী কল্যাণ (Savani Kalyan) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত বিরল এবং জটিল ‘সংকীর্ণ’ বা মিশ্র প্রকৃতির রাগ। এটি প্রধানত দুটি ভিন্ন মেজাজের রাগের সংমিশ্রণে তৈরি, যা উচ্চতর স্তরের শিল্পীদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। নিচে এই রাগের বিস্তারিত ও প্রামাণ্য বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:

রাগ সাভানী কল্যাণ

সাভানী কল্যাণ রাগটি মূলত রাগ সাভানী এবং রাগ কল্যাণ-এর একটি নিপুণ মিশ্রণ। ‘সাভানী’ শব্দটি বর্ষাকালের সাথে সম্পর্কিত (শ্রাবণ থেকে সাভানী), তাই অনেক ক্ষেত্রে এতে বর্ষার রাগের ছোঁয়া পাওয়া যায়। তবে কল্যাণ ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এটি সন্ধ্যার রাগ হিসেবেই সমাদৃত। এই রাগটি খুব বেশি প্রচলিত নয়, তবে জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠে এই রাগের বিশেষ প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়।

এই রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর বক্র চলন। এতে সাভানী রাগের ‘সা-রে-পা’ বা ‘মা-রে-পা’ অঙ্গের সাথে কল্যাণের তীব্র মধ্যম ও ধৈবতের কাজগুলো মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই রাগে শুদ্ধ ও তীব্র—উভয় মধ্যমই অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে ব্যবহৃত হয়। সাভানী কল্যাণ গাওয়ার সময় লক্ষ্য রাখা হয় যেন তা কোনোভাবেই ‘শ্যাম কল্যাণ’ বা ‘কামোদ’-এর মতো না হয়ে যায়। এটি একটি গম্ভীর ও বীর রস প্রধান রাগ।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কল্যাণ।
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৫ স্বর, অবরোহে ৭ স্বর)।
  • আরোহ: সা রে পা, মা(তীব্র) ধা নি সা।
  • অবরোহ: সা নি ধা পা, মা(তীব্র) পা, মা(শুদ্ধ) রে, সা।
  • বাদী স্বর: পঞ্চম (পা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গা) এবং মধ্যম (মা) বর্জিত (তবে চলনে অল্প স্পর্শ থাকতে পারে)।
  • ব্যবহৃত স্বর: ষড়জ (সা), শুদ্ধ ঋষভ (রে), শুদ্ধ গান্ধার (গা), শুদ্ধ মধ্যম (মা), তীব্র মধ্যম (মা/ক্ষা), পঞ্চম (পা), শুদ্ধ ধৈবত (ধা) এবং শুদ্ধ নিষাদ (নি)।
  • সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, ওজস্বী এবং কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির মিশ্রণ।

 

সম্পর্কিত বা সদৃশ রাগ

  • শ্যাম কল্যাণ: শ্যাম কল্যাণেও দুটি মধ্যম ও ‘রে-পা’ সংগতি থাকে, তবে সাভানী কল্যাণের চলন অনেক বেশি বক্র।
  • কামোদ: কামোদের সাথে এর মিল হলো ‘রে-পা’ এবং ‘মা-রে-পা’ সংগতি, কিন্তু কামোদে তীব্র মধ্যম এভাবে ব্যবহৃত হয় না।
  • ভূপালী: আরোহে কিছু কিছু অংশে ভূপালীর স্বরবিন্যাসের ছায়া পাওয়া গেলেও তীব্র মধ্যমের প্রয়োগ একে কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়।
  • সাভানী: এই রাগের মূল ভিত্তি হলো সাভানী, যার সাথে কল্যাণ অঙ্গ মিশিয়ে একে একটি নতুন রূপ দান করা হয়েছে।

রাগ সাভানী কল্যাণ হলো সুরের এক অনন্য স্থাপত্য। এটি গায়কের সৃজনশীলতা ও রাগের ব্যাকরণগত দক্ষতার এক কঠিন পরীক্ষা। কল্যাণের গাম্ভীর্য এবং সাভানী রাগের সজীবতা মিলে এই রাগে এক অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি হয়। যদিও এটি সচরাচর শোনা যায় না, তবুও বিদগ্ধ সংগীত সমাজে সাভানী কল্যাণ তার জটিল সৌন্দর্য ও রাজকীয় মেজাজের জন্য চিরকাল এক বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. রাগ পরিচয় (চতুর্থ খণ্ড) – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।

২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা – ভি. এন. ভাতখণ্ডে।

৩. অভিনব গীতাঞ্জলি (পঞ্চম খণ্ড) – পণ্ডিত রামাশ্রয় ঝা।

৪. ভারতীয় সংগীতের অভিধান – বিমলাকান্ত রায় চৌধুরী।

৫. The Ragas of North India – Walter Kaufmann (সাভানী ও কল্যাণের সংমিশ্রণ অংশ)।

আরও দেখুন: