দেশের ও রাজনীতির গান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তন, আন্দোলন এবং দেশপ্রেমের ইতিহাস আর সংগীতের ইতিহাস এক ও অবিচ্ছেদ্য। দুই বাংলার ভৌগোলিক সীমানা আলাদা হলেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এবং স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশের ভাষা হিসেবে ‘গান’ সবসময়ই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও অবিভক্ত বাংলার স্বদেশী গান

বাঙালির দেশপ্রেমের গানের আদি উৎস মূলত ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ সময়। উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই গানগুলো ছিল স্বাধীনতার মন্ত্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’ দিয়ে যে চেতনার শুরু, তাকে পূর্ণতা দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং রজনীকান্ত সেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ বা ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ যেমন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তেমনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ বাঙালির মনে স্বদেশের শ্রেষ্ঠত্বের গৌরব জাগিয়ে তুলেছিল। এই সময়ের গানগুলোতে কেবল আবেগ ছিল না, ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান। কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহকপাট’ বা ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো গানগুলো বিপ্লবীদের ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার শক্তি যুগিয়েছিল। এই ধারার গানগুলোই পরবর্তীকালে দুই বাংলার রাজনৈতিক সংগীতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

পশ্চিমবঙ্গের গণসংগীত ও তেভাগা আন্দোলনের গান

দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সংগীতের এক নতুন ধারা বিকশিত হয়, যা ‘গণসংগীত’ নামে পরিচিত। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘তেভাগা আন্দোলন’ এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনে এই গানগুলো ছিল প্রধান হাতিয়ার। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA) এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। জ্যোতিরিঙ্গ মৈত্র, বিনয় রায় এবং বিশেষ করে সলিল চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’ বা ‘হেই সামালো ধান হো’র মতো গানগুলো শোষিত মানুষের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের সময় সাধারণ কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এই গানগুলো কেবল সুর থাকেনি, হয়ে উঠেছিল সংগ্রামের স্লোগান। পরবর্তীতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং ভূপেন হাজারিকার গানগুলোতেও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই এবং দুই বাংলার সম্প্রীতির সুর ধ্বনিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের এই ধারাটি আজও বামপন্থী এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও একাত্তরের গান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আর সংগীতের ইতিহাস সমান্তরালভাবে চলেছে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বাঁকেই গান ছিল অদম্য শক্তির উৎস। আব্দুল লতিফের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাঙালিকে তার আত্মপরিচয় চিনতে শিখিয়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রচারিত গানগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অক্সিজেনের মতো। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ বা ‘পুর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’র মতো গানগুলো অবরুদ্ধ দেশে সাধারণ মানুষের মনোবল ধরে রাখতে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। গোবিন্দ হালদার, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং আব্দুল জব্বারের মতো শিল্পীরা তাঁদের কণ্ঠের মাধ্যমে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের অদম্য সাহস যুগিয়েছিলেন। এই গানগুলো কেবল যুদ্ধের বর্ণনা নয়, বরং একটি জাতিরাষ্ট্র জন্মের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।

বঙ্গবন্ধু ও রাজনৈতিক সংগীতের কালজয়ী ধারা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ গান রচিত হয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গানগুলো কেবল ব্যক্তি-স্তুতি নয়, বরং তাঁর লড়াকু জীবন এবং ত্যাগের ইতিহাসকেই ধারণ করে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমর সৃষ্টি ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ একাত্তরে প্রতিটি বাঙালির রক্তে নাচন ধরিয়ে দিত। যুদ্ধের পরেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য কালজয়ী গান তৈরি হয়েছে, যেমন ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’। দেশি গীতিকারদের পাশাপাশি বিদেশি অনেক শিল্পী ও সুরকারও বঙ্গবন্ধুর মহিমা ও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে মুগ্ধ হয়ে গান রচনা করেছেন। এই গানগুলো আজও বাঙালির জাতীয় শোক দিবস কিংবা বিজয় দিবসে চেতনার মশাল হিসেবে কাজ করে।

কোন পথে গেল?

বাঙালির রাজনৈতিক লড়াই আর গান তো আসলে হাত ধরাধরি করে চলেছে চিরকাল। দুই বাংলার সাধারণ মানুষকে অধিকার সচেতন করতে একসময় গানের চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র ছিল না। এই গানগুলো ছিল জীবন্ত ইতিহাসের দলিল। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি মোড়ে গান ছিল আমাদের সাহসের অক্সিজেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বা ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’—এগুলো ছিল একেকটা জাতিসত্তার প্রস্ততির হুঙ্কার। এমনকি বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’র মতো গানগুলো যে গণজোয়ার তৈরি করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ওপার বাংলায়ও একই চিত্র ছিল। তেভাগা আন্দোলনের সময় সলিল চৌধুরী বা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানগুলো শোষিত কৃষকের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল।

সত্তরের নকশাল আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত আমরা দেখেছি গান কীভাবে শাসকের গদি কাঁপিয়ে দিত। কবীর সুমন যখন গাইতেন ‘তোমাকে চাই’ বা নচিকেতা যখন ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলতেন, তখন তরুণ প্রজন্মের রক্ত গরম হতো। কিন্তু আপনার পর্যবেক্ষণ একদম সঠিক—বিগত প্রায় এক যুগে এই ‘দ্রোহের গান’ বা ‘প্রতিবাদের ভাষা’ অনেকটা মিউজিয়ামে চলে গেছে।

এখনকার গানে ‘আমি’ আর ‘তুমি’র সস্তা প্রেম যতটা জায়গা পেয়েছে, ‘আমরা’র সংকট বা দেশের কথা ততটাই দুরে চলে গেছে। বাজারমুখী সঙ্গীত এবং করপোরেট সংস্কৃতির চাপে প্রতিবাদের তীক্ষ্ণতা আজ ভোঁতা। গায়ক এখন আর ‘শোষিতের কণ্ঠস্বর’ হতে চায় না, বরং গ্ল্যামার আর ভিউয়ের পেছনে দৌড়াচ্ছে বেশি। ফলে যে রাজনীতি আর সংস্কৃতি একসময় অনড় থাকার শক্তি জোগাত, আজ সেখানে অনেকটা স্থবিরতা। বাংলাদেশের সমসাময়িক কিছু ব্যান্ড বা র‍্যাপ গানে মাঝে মাঝে ক্ষোভের ছটা দেখা গেলেও, তা আগের সেই কালজয়ী গণসংগীতের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারছে না। রাজনীতি এখন ড্রয়িংরুমের বিতর্কে আটকা, আর গান আটকে গেছে স্টুডিওর চার দেয়ালে।

আরও দেখুন: