“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের চেম্বার মিউজিকের ঘরোয়া ও নিভৃত আবহকে পেছনে ফেলে আমরা এখন পা রাখছি পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ, রাজকীয় এবং মহাকাব্যিক অধ্যায়ে, যার নাম অপেরা (Opera)। লাতিন শব্দ ‘ওপাস’ (Opus) থেকে আসা এই অপেরা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শিল্পকর্ম’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অপেরা হলো সুর ও নাট্যের এক অভূতপূর্ব মহামিলন। এটি এমন এক ধরণের মঞ্চনাটক যেখানে চরিত্ররা সাধারণ সংলাপের বদলে আগাগোড়া গানের মাধ্যমে তাদের আবেগ, দ্বন্দ্ব এবং কাহিনীর প্রতিটি মোড় ফুটিয়ে তোলে। তবে অপেরাকে কেবল গান বা নাটকের ফ্রেমে বাঁধা ভুল হবে; এটি আসলে সঙ্গীত, কবিতা বা নাট্যলিপি, অভিনয়, নৃত্য এবং চোখধাঁধানো দৃশ্যশিল্পের এক জটিল ও সমন্বিত মেলবন্ধন, যা মানুষের ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত করে।

অপেরা: সুর ও নাট্যের মহামিলন
অপেরার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে। তৎকালীন একদল প্রখ্যাত পণ্ডিত, কবি ও সুরকার—যাঁদের একত্রে ‘ফ্লোরেনটাইন ক্যামেরাতা’ বলা হতো—তাঁরা প্রাচীন গ্রিক নাটকের সেই হারানো মহিমাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, যেখানে সংলাপের সাথে সুরের এক নিবিড় সংযোগ ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬০৭ সালে ইতালীয় সুরকার ক্লদিও মোন্তেভের্দির হাত ধরে সৃষ্টি হয় ‘অরফেও’ (L’Orfeo), যা পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সার্থক অপেরা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই কারণে মোন্তেভের্দিকে আধুনিক অপেরার জনক বলা হয়। পরবর্তীতে ধ্রুপদী যুগে ভলফগ্যাং আমাদেউস মোৎসার্ট অপেরার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও সূক্ষ্ম রসবোধের জন্ম দেন। আর উনিশ শতকের রোমান্টিক যুগে এসে রিচার্ড ভাগনার এবং জুসেপ্পে ভের্দির মতো কিংবদন্তিরা একে এক অতিমানবিক, বিশাল এবং চিরন্তন অবয়ব দান করেন।

অপেরার কারিগরি উপাদানসমূহ
একটি অপেরার মূল কাঠামো ও এর ভেতরের রস আস্বাদন করতে গেলে এর বিশেষ কিছু পরিভাষা ও উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। কোনো রকম কৃত্রিম তালিকা ছাড়াই এই উপাদানগুলোর নান্দনিক বিন্যাস নিচে তুলে ধরা হলো:
অপেরার সম্পূর্ণ কাহিনী বা নাট্যলিপিকে বলা হয় লিব্রেত্তো (Libretto), যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ছোট বই’। যিনি এই নাট্যরূপটি লেখেন, তাঁকে বলা হয় লিব্রেত্তিস্ট। পুরো নাটকের সাহিত্যিক মান ও নাটকীয়তা এই লিব্রেত্তোর ওপরই নির্ভর করে। অন্যদিকে, অপেরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আবেগঘন অংশটিকে বলা হয় আরিয়া (Aria)। এটি মূলত নাটকের প্রধান কোনো চরিত্রের একক গান (Solo), যেখানে তিনি তাঁর মনের গভীরতম অনুভূতি ও দ্বন্দ্ব শ্রোতাদের সামনে মেলে ধরেন। আরিয়া সাধারণত অত্যন্ত সুরপ্রধান এবং একজন অপেরা গায়ক বা গায়িকার কণ্ঠের কারিগরি দক্ষতার চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরিয়ার বাইরে কাহিনীর দ্রুত অগ্রগতি কিংবা চরিত্রদের মধ্যকার সাধারণ কথোপকথনের জন্য যে বিশেষ গায়কী ব্যবহৃত হয়, তাকে বলা হয় রেসিটেটিভ (Recitative)। এটি গানের এমন এক ধরণ যা সুরের চেয়ে কথা বলার স্বাভাবিক ছন্দের কাছাকাছি থাকে। পুরো অপেরাটি আনুষ্ঠানিকভাবে মঞ্চে শুরু হওয়ার ঠিক আগে, অর্কেস্ট্রা দল যে বিশেষ বাদ্যযন্ত্রীয় সুরটি এককভাবে বাজায়, তাকে বলে উভার্চার (Overture)। এই উভার্চার মূলত পুরো অপেরার প্রধান সুরগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত শ্রোতাদের কাহিনীর আসন্ন মেজাজ বা মুড সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়। এছাড়া অপেরার বিশালত্ব ফুটিয়ে তুলতে মঞ্চে একদল সমবেত গায়ক থাকেন, যাঁদের কয়ার (Chorus) বলা হয়; তাঁরা সাধারণত সাধারণ নাগরিক, সৈন্যদল কিংবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন।
কণ্ঠস্বরের বৈচিত্র্য ও প্রধান ধারা
অপেরাতে মাইক্রোফোন ছাড়া খালি গলায় বিশাল হলরুম কাঁপিয়ে গাইতে হয় বলে শিল্পীদের কণ্ঠের রেঞ্জ বা স্বরগ্রামের ওপর ভিত্তি করে কঠোরভাবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। নারী কণ্ঠের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে থাকা স্বরকে বলা হয় সোপরানো (Soprano), মধ্যম স্বরকে মেজো-সোপরানো এবং সবচেয়ে গম্ভীর ও নিচু স্বরকে বলা হয় কন্ট্রাল্টো (Contralto)। একইভাবে পুরুষ কণ্ঠের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বরগ্রামকে তেনোর (Tenor), মধ্যম স্বরকে ব্যারিটোন (Baritone) এবং সবচেয়ে ভারী ও গম্ভীর স্বরকে বাস (Bass) বলা হয়। কাহিনীর চরিত্রের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী সুরকারেরা এই কণ্ঠের বৈচিত্র্য নির্ধারণ করেন।
ঐতিহাসিকভাবে অপেরা মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিকশিত হয়েছিল। প্রথমটি হলো অপেরা সিরিয়া (Opera Seria), যা মূলত গম্ভীর, উচ্চাঙ্গের এবং রাজকীয় কাহিনী যেমন—দেবদেবী, প্রাচীন উপকথা কিংবা রাজা-বাদশাহদের বীরত্ব ও ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত হতো। এর ঠিক বিপরীত ধারাটি হলো অপেরা বুফা (Opera Buffa), যা মূলত দৈনন্দিন জীবনের হাস্যকৌতুক, সাধারণ মানুষের বুদ্ধিদীপ্ত জয় এবং সামাজিক ব্যঙ্গচিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। মোৎসার্টের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো’ এই ধারার একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
অপেরা অনন্য হওয়ার কারণ হলো, এর অর্কেস্ট্রা দল মঞ্চের ওপরে থাকে না, বরং তারা থাকে মঞ্চের ঠিক নিচে একটি গর্তের মতো জায়গায়, যাকে বলা হয় ‘পিট’ (Pit)। আর সুরকার রিচার্ড ভাগনার অপেরাকে বলতেন ‘গেসামতকুন্সতভার্ক’ (Gesamtkunstwerk) বা সম্পূর্ণ শিল্পকর্ম—যেখানে সুর, লিরিক, অভিনয় ও আলোকরশ্মি আলাদা কোনো সত্তা নয়, বরং সব শিল্প মিলে একটি একক মহাজাগতিক লক্ষ্য অর্জন করে। পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি ও অকৃত্রিম রস আস্বাদনের জন্য শ্রোতাদের শোনার তালিকায় মোৎসার্টের ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’, জর্জে বিজে-র তীব্র আবেগ ও ট্র্যাজেডির গল্প ‘কারমেন’, জুসেপ্পে ভের্দির করুণ প্রেমের উপাখ্যান ‘লা ট্রাভিয়াটা’ এবং জিয়াকোমো পুচ্চিনির সাধারণ মানুষের জীবন ও বিরহগাথা ‘লা বোহেম’ অবশ্যই রাখা উচিত।
উৎস (Sources) : এই আর্টিকেলের ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ অক্সফোর্ড মিউজিক অনলাইন (গ্রোভ মিউজিক ডিকশনারি), দ্য মেট্রোপলিটন অপেরা আর্কাইভস, ইতালির ফ্লোরেন্টাইন ক্যামেরাতার ঐতিহাসিক নথিপত্র।
আরও দেখুন:
