কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের একটি সমৃদ্ধ এবং ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম হলো মোহননগর। গড়াই নদীর অববাহিকা সংলগ্ন এই গ্রামটি তার কৃষি বৈচিত্র্য এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অত্র অঞ্চলে সুপরিচিত। বিভিন্ন প্রশাসনিক ডাটাবেইস ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে মোহননগর গ্রামের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রশাসনিক পরিচয় ও অবস্থান
মোহননগর গ্রামটি প্রশাসনিকভাবে ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ভৌগোলিক বিচারে গ্রামটি ইউনিয়নের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এর উত্তর দিকে বরইচারা গ্রাম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে নাভদিয়া ও চাঁদপুর (সদর) এবং পূর্বে পান্টি ইউনিয়নের সীমানা। গ্রামের সরকারি মৌজা নাম মোহননগর। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং অনুযায়ী, গ্রামটির বসতি এলাকা অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং কৃষি জমিগুলো মূলত নদী বিধৌত পলিমাটি দ্বারা গঠিত।
জনমিতি ও জনসংখ্যা বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ জনশুমারি এবং ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, মোহননগর গ্রামের মোট জনসংখ্যা ২,২৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১,০৭৬ জন এবং নারীর সংখ্যা ১,২০৩ জন। জনতাত্ত্বিক বিন্যাসে দেখা যায়, এখানে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গ্রামে মোট পরিবারের (Household) সংখ্যা প্রায় ৫০০টি। ভোটার সংখ্যা আনুমানিক ১,৬০০ জন। আবাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গ্রামটিতে প্রায় ২৫% বাড়ি পাকা ও আধা-পাকা এবং ৭৫% বাড়ি মজবুত টিনশেড ঘর।
শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক চিত্র
যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং ব্যানবেইস (BANBEIS)-এর তথ্যমতে, মোহননগর গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৬৩%। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মোহননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা চাঁদপুর ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পার্শ্ববর্তী পান্টি এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে গ্রামে ৩টি মক্তব ও ১টি হাফেজিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ এবং দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত।
কৃষি ও ভূমি ব্যবহার
মোহননগর গ্রামের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেইস অনুযায়ী, গ্রামের জমি অত্যন্ত উর্বর এবং মূলত তিন-ফসলী জমি। এখানকার প্রধান কৃষি পণ্য হলো ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ এবং তামাক। গড়াই নদী সংলগ্ন হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পলি জমে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে এখানে পিঁয়াজ ও পাটের ফলন উপজেলা পর্যায়ে বিশেষভাবে প্রশংসিত। গ্রামে কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩২০টি। কৃষিকাজের পাশাপাশি পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদন এখানকার অনেক পরিবারের আয়ের উৎস।
অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের রোড নেটওয়ার্ক ডাটাবেইস অনুযায়ী, মোহননগর গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। গ্রামটি চাঁদপুর-পান্টি প্রধান সংযোগ সড়কের সাথে পাকা রাস্তার মাধ্যমে যুক্ত। গ্রামে পাকা (বিসি) রাস্তার পরিমাণ প্রায় ৪ কিলোমিটার এবং সলিং ও কাঁচা রাস্তা রয়েছে প্রায় ৫ কিলোমিটার। পানি নিষ্কাশন ও যাতায়াতের জন্য গ্রামে ৪টি পাকা কালভার্ট রয়েছে। হাট-বাজারের জন্য গ্রামবাসী প্রধানত চাঁদপুর বাজার ও ধলনগর বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা
মোহননগর গ্রাম ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ ও ১টি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। মসজিদের স্থাপত্য ও ধর্মীয় পাঠদান ব্যবস্থা গ্রামের মানুষের আধ্যাত্মিক সচেতনতার পরিচয় দেয়। এখানে মুসলিম ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছেন। গ্রামের উত্তর পাশে একটি সামাজিক কবরস্থান সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয় নেতৃত্ব ও জননিরাপত্তা
প্রশাসনিকভাবে ৯ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করেন। বর্তমানে এই ওয়ার্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন মোঃ সেলিম উদ্দিন মোল্লা (মোবাইল: ০১৭১৯০৩০৭৭৮)। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের সাথে সমন্বয় সাধনে ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োজিত গ্রাম পুলিশ সদস্যরা এখানে অত্যন্ত সক্রিয়। বর্তমান দফাদার মীর আব্দুল মালেক (মোবাইল: ০১৭২৪৯৭৯৭০১) এই গ্রামেই বসবাস করেন এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিবাদ নিরসনে স্থানীয় মুরুব্বি ও শিক্ষিত যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম্য সালিশি ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা
মোহননগর গ্রামটি অনেক পরিশ্রমী ও কৃতি মানুষের জন্মস্থান। এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীরা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে এই গ্রামের শিক্ষক সমাজ ও প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। গ্রামের প্রধান সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ষাকালে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তা সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কৃষি সমৃদ্ধি এবং সুসংগঠিত সমাজব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে মোহননগর গ্রামটি ৯ নং চাঁদপুর ইউনিয়নের একটি সম্ভাবনাময় ও আদর্শ জনপদ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
আরও দেখুন: