রাগ গৌড় মালহার উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী রাগ। এটি বর্ষাকালের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় রাগ। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি দুটি রাগের সংমিশ্রণে তৈরি— ‘গৌড়’ এবং ‘মালহার’। ঐতিহাসিকদের মতে, এই রাগের বর্তমান রূপটি কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ মিয়া তানসেনের হাতে অনেকটা মার্জিত হয়েছে, যদিও এর মূল শেকড় প্রাচীন লোকসুর এবং আঞ্চলিক গৌড় সংগীতে নিহিত।
রাগ গৌড় মালহার বা গৌড় মল্লার বা গৌড়িয়া মালহার
গৌড় মালহার রাগের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর গম্ভীর এবং মন্দ্র প্রকৃতির সুর। এটি শুনলে মেঘলা আকাশ, বৃষ্টির শব্দ এবং প্রকৃতির এক ধরণের প্রশান্তির অনুভূতি জাগে। এই রাগে মালহারের চিরচেনা ‘ম রে প’ এবং গৌড়ের বিশেষ চলন ‘ম গ রে গ ম’ এর এক অপূর্ব মিলন লক্ষ্য করা যায়। এটি একটি জটিল বা ‘সংকীর্ণ’ প্রকৃতির রাগ, যা গাওয়ার জন্য যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
গৌড় মালহারকে মূলত এই নামেই ডাকা হয়, তবে অনেক সময় কেবল ‘গৌড়িয়া মালহার’ বা প্রাচীন গ্রন্থে এর কিছু ভিন্ন আঙ্গিককে ‘গৌড় মল্লার’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে।
রাগের শাস্ত্র
- ঠাটে: বিলাবল।
- জাতি: শাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স, রে ম প, ধ নি সঁ।
- অবরোহ: সঁ নি ধ প, ম গ রে, গ ম রে স।
- বাদী স্বর: মধ্যম (ম)।
- সমবাদী স্বর: ষড়জ (স)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে ‘গান্ধার’ (গ) স্বরটি বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: এই রাগে উভয় ‘নিশাদ’ (শুদ্ধ নি এবং কোমল নি) ব্যবহৃত হয়। অবরোহে মেঘ মালহারের মতো কোমল নি-এর ব্যবহার অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। বাকি স্বরগুলো শুদ্ধ।
- সময়: বর্ষাকাল (যেকোনো সময়)। তবে ঋতু ভিন্ন হলে এটি গাওয়ার আদর্শ সময় হলো মধ্যরাত।
- প্রকৃতি: গম্ভীর এবং করুণ-মধুর। এটি বর্ষার গম্ভীর রূপকে ফুটিয়ে তোলে।
গৌড় মালহার গাওয়ার সময় স্বরক্ষেপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ‘গ’ এবং ‘ম’ স্বরের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সূক্ষ্মতা বজায় রাখতে হয়।
রিলেটেড বা সংশ্লিষ্ট রাগসমূহ
গৌড় মালহার রাগের সাথে সম্পর্কযুক্ত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- মিয়া মালহার: এই রাগের সাথে গৌড় মালহারের অবরোহ এবং কোমল নি-এর ব্যবহারে মিল রয়েছে।
- শুদ্ধ মালহার: গৌড় মালহারের একটি প্রধান ভিত্তি হলো শুদ্ধ মালহারের সরল চলন।
- রাগ গৌড়: গৌড় মালহারের ‘ম গ রে গ ম’ এই বিশেষ অঙ্গটি সরাসরি রাগ গৌড় থেকে নেওয়া।
- মেঘ মালহার: মেঘ মালহারের গম্ভীর মেজাজ এবং কিছু স্বরক্ষেপণ গৌড় মালহারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
- বিলাবল: যেহেতু গৌড় মালহার বিলাবল ঠাটের রাগ, তাই এর শুদ্ধ স্বরগুলোর কাঠামো বিলাবলের সাথে যুক্ত।
রাগ গৌড় মালহার কেবল একটি সংগীতের কাঠামো নয়, এটি প্রকৃতির এক জীবন্ত প্রতিফলন। বর্ষার মেঘভরা আকাশ এবং বৃষ্টির স্নিগ্ধতাকে সুরের জালে বন্দি করার ক্ষেত্রে এই রাগের জুড়ি নেই। এর জটিল চলন এবং ধীর লয় শ্রোতাকে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দান করে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসরে এই রাগের পরিবেশনা সবসময়ই এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সোর্স ও তথ্যসূত্র
১. রাগ বিঞ্জান – পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
২. সংগীত শাস্ত্র – পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।
৩. রাগ পরিচয় – পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
৪. উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস – বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থ।
আরও দেখুন: