রাগ গৌড় । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ গৌড় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অতি প্রাচীন এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। এটি মূলত ‘গৌড়’ অঙ্গের প্রধান রাগ এবং এর চলন অত্যন্ত বক্র (Zig-zag)।

রাগ গৌড়

রাগ গৌড়: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ গৌড় (Gaud) একটি অত্যন্ত প্রাচীন রাগ, যার উল্লেখ মধ্যযুগীয় বিভিন্ন সংগীত গ্রন্থে পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন ‘গৌড়’ দেশের (বর্তমান বাংলা ও বিহারের অংশবিশেষ) নামানুসারে এই রাগের নামকরণ হয়েছে। এই রাগটি গাওয়ার সময় একটি বিশেষ গাম্ভীর্য এবং রাজকীয় আভিজাত্য প্রকাশ পায়।

গৌড় রাগের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর বক্র চলন। এতে স্বরগুলো সোজাভাবে ব্যবহৃত না হয়ে পেঁচিয়ে বা বক্রভাবে ব্যবহৃত হয়, যার ফলে এটি গাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এর স্বরবিন্যাসে ‘সা-রে-গা-মা-রে-সা’—এই অংশটি গৌড় অঙ্গের পরিচয় বহন করে। এটি মূলত ভক্তি এবং বীর রসের সংমিশ্রণে গঠিত একটি রাগ।

রাগের শাস্ত্র

রাগ গৌড়-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • অন্যান্য নাম: শুদ্ধ গৌড়, প্রাচীন গৌড়।
  • ঠাট: বিলাবল।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহ এবং অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা, রে গ ম, রে প, ম প ধ নি সঁ।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ প, ম গ, ম রে, প ম গ রে সা।
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়, তবে চলন বক্র হওয়ার কারণে স্বরগুলোর ব্যবহার সরাসরি হয় না।
  • ব্যবহৃত স্বর: এই রাগে ব্যবহৃত সাতটি স্বরই (সা, রে, গ, ম, প, ধ, নি) শুদ্ধ
  • সময়: দিনের দ্বিতীয় প্রহর (সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং বক্র।

 

 

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

গৌড় রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ গৌড় সারং: গৌড় রাগের সাথে সারং-এর মিশ্রণে এই রাগটি তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে গৌড় রাগের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
  • রাগ গৌড় মল্লার: গৌড় অঙ্গের সাথে মল্লার অঙ্গের সংমিশ্রণে এটি গঠিত এবং এটি বর্ষাকালের রাগ।
  • রাগ বিলাবল: গৌড় রাগের ঠাট বিলাবল হওয়ার কারণে স্বরগত মিল থাকলেও বিলাবলের চলন সরল, কিন্তু গৌড়ের চলন বক্র।
  • রাগ মালশ্রী: কিছু ঘরানায় গৌড় রাগের চলনের সাথে মালশ্রী রাগের মিল লক্ষ্য করা যায়।

রাগ গৌড় তার প্রাচীন ঐতিহ্য এবং জটিল বক্র চলনের জন্য সংগীত সাধকদের কাছে এক পরম শ্রদ্ধার বিষয়। এটি এমন একটি রাগ যা কোনো চটুল অলংকারের ধার ধারে না, বরং স্বরের সঠিক স্থায়িত্ব এবং বক্র গতির মাধ্যমেই এর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। যদিও বর্তমান সময়ে এককভাবে ‘গৌড়’ রাগের পরিবেশনা কিছুটা বিরল হয়ে পড়েছে (কারণ গৌড় সারং বা গৌড় মল্লারের আধিপত্য বেশি), তবুও শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীতের মূল শিকড় বুঝতে গৌড় রাগের জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। এটি গায়কের ধৈর্য এবং স্বর নিয়ন্ত্রণের এক কঠিন পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য শাস্ত্র ও উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. ক্রামিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।

২. রাগ পরিচয় (খণ্ড ৪) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।

৩. সংগীত বিশারদ — বসন্ত।

৪. রাগ তত্ত্ব ও রূপায়ন — বিভিন্ন ঘরানাদার সংগীত পাঠ্যক্রম ও আর্কাইভ।

আরও দেখুন: