রাগ কালাশ্রী । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ কালাশ্রী হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক এবং অত্যন্ত শ্রুতিমধুর মিশ্র রাগ। এটি মূলত দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় রাগ—কলাবতী এবং রাগেশ্রী-এর সংমিশ্রণে তৈরি।

রাগ কালাশ্রী

রাগ কালাশ্রী: পরিচয় ও বিশেষত্ব

রাগ কালাশ্রী (Kalashree) একটি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এবং একই সাথে লালিত্যময় রাগ। এর প্রবর্তক হিসেবে আধুনিক ভারতের প্রখ্যাত সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর-কে গণ্য করা হয়। তিনি কলাবতী রাগের চপলতা এবং রাগেশ্রী রাগের গম্ভীর প্রকৃতিকে মিলিয়ে এই নতুন রাগটির সৃষ্টি করেন।

এই রাগের বিশেষত্ব হলো এর স্বর বিন্যাস। এতে পঞ্চম (প) স্বরটি বর্জিত থাকে, যা একে একটি অনন্য শূন্যতা ও গভীরতা দান করে। এর চলন মূলত ‘রাগেশ্রী’ রাগের মতো হলেও এতে ‘কলাবতী’ রাগের মতো পঞ্চম বর্জিত স্বরসঙ্গতি ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত শৃঙ্গার (রোমান্টিক) এবং ভক্তি রসের একটি অপূর্ব মিশ্রণ। সেতার, সরোদ এবং খেয়াল গায়কীতে এই রাগের প্রয়োগ বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয়।

রাগের শাস্ত্র

রাগ কালাশ্রী-এর শাস্ত্রীয় নিয়ম ও গঠন নিচে দেওয়া হলো:

  • অন্যান্য নাম: কলাশ্রী।
  • ঠাট: খাম্বাজ।
  • জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহে ৫টি এবং অবরোহে ৬টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা গ ম ধ নি সঁ (শুদ্ধ গ, শুদ্ধ ম, শুদ্ধ ধ এবং কোমল নি)।
  • অবরোহ: সঁ নি ধ ম গ রে সা (কোমল নি, বাকি স্বর শুদ্ধ)।
  • বাদী স্বর: মধ্যম (ম) অথবা ষড়জ (সা)।
  • সমবাদী স্বর: ষড়জ (সা) অথবা মধ্যম (ম)। (ঘরানা ভেদে পার্থক্য দেখা যায়)।
  • বর্জিত স্বর: পঞ্চম (প) স্বরটি আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বর্জিত। আরোহে ঋষভ (রে) বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), গান্ধার (গ), মধ্যম (ম) এবং ধৈবত (ধ) হলো শুদ্ধ; নিষাদ (নি) হলো কোমল
  • সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, শান্ত এবং রোমান্টিক।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

কালাশ্রী রাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা সম্পর্কিত রাগগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • রাগ কলাবতী: কালাশ্রী রাগের আরোহের কাঠামো অনেকটা কলাবতীর মতো, তবে কলাবতীতে মধ্যম (ম) বর্জিত থাকে।
  • রাগ রাগেশ্রী: কালাশ্রী রাগের অবরোহ এবং সামগ্রিক চলন রাগেশ্বরীর ছায়া বহন করে, তবে রাগেশ্বরীতে পঞ্চমের ব্যবহার পাওয়া যায়।
  • রাগ বাগেশ্রী : বাঘেশ্রীতে কোমল গান্ধার ব্যবহৃত হয়, কিন্তু কালাশ্রীতে গান্ধার শুদ্ধ—এটিই এদের প্রধান পার্থক্য।
  • রাগ মালগুঞ্জ: এই রাগেও রাগেশ্বরীর প্রভাব থাকে, তবে এতে শুদ্ধ ও কোমল উভয় গান্ধার ব্যবহৃত হয় যা কালাশ্রীতে নেই।

রাগ কালাশ্রী আধুনিক সংগীতকারদের সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন। প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে নতুনত্বের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন রসের সৃষ্টি করা যায়, কালাশ্রী তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পঞ্চম বর্জিত হওয়ার কারণে এই রাগের মধ্যে যে বিমূর্ত ভাব তৈরি হয়, তা শ্রোতাকে এক গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়। এটি বর্তমান প্রজন্মের শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি রাগ এবং এর জটিল স্বরবিন্যাস শিল্পীর সৃজনশীল সত্তাকে নতুন মাত্রা দান করে।

তথ্যসূত্র (Sources)

নিবন্ধটির তথ্যসমূহ নিম্নলিখিত প্রামাণ্য উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে:

১. পণ্ডিত রবিশঙ্কর-এর রাগ সংগ্রহ — সংগীত গবেষণা কেন্দ্র।

২. রাগ তত্ত্ব ও রূপায়ন — ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত একাডেমি।

৩. বিংশ শতাব্দীর আধুনিক রাগ সংগ্রহ — ভারতীয় সংগীত শিক্ষা সংসদ।

৪. রাগ পরিচয় (আধুনিক খণ্ড) — বিভিন্ন সংগীত বিশারদদের সংকলন।

আরও দেখুন: